মুসা মোহইদিন পরেছে ট্রাউজার আর স্পোর্টস শার্ট। সে একজন সাংবাদিক ইয়াজিদের প্রধান প্রচারিবদ। খালেদ ফৌজি, জেহাদ আহ্বানকারী কমিটির সামরিক উপদেষ্টা, তার পরনে ব্যাটল ফেটিগ। একা শুধু সুলেমান আজিজের পরনে সাফারি সুট।
আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, কেন আজ আমি হঠাৎ করে জরুরি মিটিং ডেকেছি, টেবিলের মাথায় চেয়ারটা খালি পড়ে ছিল, সেটায় বসল আখমত ইয়াজিদ, তার ইঙ্গিতে বাকি সবাইও আসন গ্রহণ করল। আপনারা তো জানেনই আল্লাহ আমাকে বিশেষ সুনজরে দেখেন। তিনি স্বয়ং আমাকে একটা প্ল্যান দিয়েছেন-একটি মাত্র আঘাতে আমরা অযোগ্য নাদাভ হাসান আর তার দুর্নীতিপরায়ণ মন্ত্রিসভার সদস্যদের উৎখাত করতে পারব। প্লিজ, কফি খেতে শুরু করুন আপনারা।
কেউ কফির কাপে চুমুক দিল, কেউ দিতে যাচ্ছে, এই সময় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল আখমত ইয়াজিদ। তার সম্মানে আবার সবাইকে দাঁড়াতে হলো। শান্ত পায়ে হেঁটে একটা দেয়ালের সামনে চলে এল সে। হাত বাড়িয়ে চাপ দিল বোতামে। বড় একটা রঙিন ম্যাপ সিলিং থেকে মেঝের দিকে নেমে এল। চিনতে পারল সুলেমান আজিজ, দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্র-উরুগুয়ের উপকূল শহর পান্টা ডেল এসটে-কে লাল বৃত্ত এঁকে দেখানো হয়েছে। ম্যাপের বাকি অর্ধেকের নিচে টেপ দিয়ে আটকানো একটা আধুনিক প্রমোদতরীর এনলার্জ করা ফটো।
টেবিলে ফিরে এসে আখমত ইয়াজিদ বসল আবার, দেখাদেখি অন্যান্যরাও। প্রত্যশায় ও উত্তেজনায় মনে মনে সবাই অস্থির হলেও, কেউ নল না বা কথা বলল না। সবাই তাকিয়ে আছে ইয়াজিদের দিকে, আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত তাদের নেতা কী বলে শোনার আশায় উন্মুখ। ইয়াজিদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে কোনো খাদ নেই। শুধু সুলেমান আজিজ তার মনোভাব গোপন রাখল। তার বাস্তব বুদ্ধি এতই প্রখর যে পবিত্র আধ্যাত্মিক শক্তি, আল্লাহর বিশেষ রহমত ইত্যাদি সে একদমই বিশ্বাস করে না।
আজ থেকে ছয় দিন পর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পান্টা ডেল এসটে শহরে, আবার গমগম করে উঠল ইয়াজিদের কণ্ঠস্বর। ঋণগ্রস্ত দেশগুলো একজোট হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মিসর বাদে, সব ধরনের বকেয়া ঋণ পরিশোধ করতে অস্বীকার করবে তারা। সেই সাথে একটা নিষেধাজ্ঞা জারি করে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে দেশ থেকে লভ্যাংশ নিয়ে যেতে বাধা দেবে। ঘোষণা দুটো জারি হলে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকশো ব্যাংক রাতারাতি লালবাতি জ্বালবে।
পশ্চিমা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধি আর উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা রাত দিন চব্বিশ ঘণ্টা বৈঠক করছে আসন্ন সর্বনাশ ঠেকানোর জন্য। তাদেরকে সাহায্য করছে পুঁজিবাদীদের পা-চাটা কয়েকটা কুকুর, তাদের মধ্যে আমাদের প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান একজন। হাসান ঋণগ্রস্ত তৃতীয় বিশ্ব ও মুসলিম দেশগুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করছে, আরে ভাই, পাওনা টাকা শোধ না দিলে আল্লাহ নারাজ হবেন-টাকা শোধ দাও, তারপর আবার চড়া সুদে ঋণ নাও। নাদাভ হাসান একজন অন্তর্ঘাতক, তার ষড়যন্ত্র আমরা সফল হতে দিতে পারি না। মিসর পুঁজিবাদী দুনিয়ার দালালি করবে, এ অসহ্য।
আমি বলি কী, অত্যাচারীকে খুন করে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলা হোক, আক্রোশে কেঁপে গেল খালেদ ফৌজির গলা। তার বয়স কম, কৌশল জ্ঞানের ভারি অভাব। নবিশ বিপ্লবীদের দ্বারা অসময়ে একটা অভ্যুত্থান ঘটাতে গিয়ে এরই মধ্যে সত্তরজনের প্রাণহানি ঘটিয়েছে সে। তার সদা চঞ্চল দৃষ্টি টেবিলের চারদিকে থেকে ঘুরে এল। হাসানের প্লেন উরুগুয়ের পথে আকাশে ওঠার সাথে সাথে একটা গ্রাউন্ড-টু-এয়ার মিসাইল ছুঁড়ে দিই, খেল খতম!
তাতে শুধু প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে ক্ষমতা দখলের সুযোগ করে দেয়া হবে, কারণ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে প্রস্তুতি দরকার তা এখনও শেষ করিনি আমরা, বিরোধিতা করল মুসা মোহাইদিন। সে একজন জনপ্রিয় লেখকও বটে, বয়স পঞ্চান্ন, টেবিলে যারা উপস্থিত তাদের মধ্যে একমাত্র তাকেই শ্রদ্ধা করে সুলেমান আজিজ।
কর্নেল নাগিব বশিরের দিকে তাকাল আখমত ইয়াজিদ। কথাটা কি ঠিক, নাগিব?
মাথা ঝাঁকাল কর্নেল। মুসা ঠিক বলেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হামিদ, জনগণের ম্যান্ডেট গ্রহণের শর্ত দিয়ে আসলে আপনাকে দেরি করিয়ে দিচ্ছে। সে যে উচ্চাভিলাষী তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তার স্বপ্ন, সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হওয়া।
মুসা মোহাইদিন বলল, আমার কাছে তথ্যও আছে। আবু হামিদের ঘনিষ্ঠ একজন অফিসার গোপনে আমাদের আন্দোলনে শরিক হয়েছেন। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, জনসাধারণের সমর্থন পাবার জন্য চমৎকার একটা বুদ্ধি বের করেছে আবু হামিদ। হে’লা কামিলের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগাবে সে।
কীভাবে?
হে’লা কামিলের পাণিপ্রার্থী হয়ে, তাকে বিয়ে করে!
ঠোঁট টিপে হাসল আখমত ইয়াজিদ। প্রতিরক্ষামন্ত্রী বালির দুর্গ গড়তে চাইছে। বিয়ের আসরে হে’লা কামিলকে পাবে না সে।
কথাটা কি নিশ্চয় করে বলা যায়? জিজ্ঞেস করল সুলেমান আজিজ।
হ্যাঁ, যায়, আধবোজা চোখে, মৃদুকণ্ঠে বলল আখমত ইয়াজিদ, তার চেহারায় তৃপ্তির একটা ভাব ফুটে উঠল। আল্লাহ ইচ্ছে করেছেন, কাল সূর্য ওঠার আগেই হে’লা কামিলকে তিনি দুনিয়ার বুক থেকে তুলে নেবেন।
