মদেইরা হতে পারে, হতে পারে ক্যানারি বা কেপ ভার্দ দ্বীপপুঞ্জ।
চিড়ে ভিজছে না, হেসে উঠে বলল পিট। আফ্রিকার ডগা থেকে অর্ধেক দুনিয়া। ঘুরে সেরাপিস গ্রিনল্যান্ডে চলে এল, এর কী ব্যাখ্যা দেবে? তুমি আট হাজার মাইল দূরত্বে কথা বলছ।
মি. পিট ঠিক বলছেন, নিজের ভুল ধরতে পারলেন ড. রেডফার্ন।
তাহলে উত্তরের পথ ধরেছিল ওরা, বলল লিলি। দ্বীপগুলো হতে পারে শেটল্যান্ড বা ফারো। তাই যদি হয়, যে পাহাড়টার কথা বলা হয়েছে সেটা নরওয়ের উপকূলে বা আইসল্যান্ডে কোথাও থাকতে পারে।
আমি তোমাকে চ্যালেঞ্জ করছি না, বলল পিট। এ থেকে হয়তো ওদের গ্রিনল্যান্ডে আটকা পড়ার একটা ব্যাখ্যা বেরিয়ে আসবে।
এরপর কী বলছে রাফিনাস, অসভ্যদের হাত থেকে বাঁচার পর কী ঘটল? চকোলেটের কাপে চুমুক দিলেন ড. রেডফার্ন। পড়ি।
.
খোলা সাগরে পৌঁছলাম আমরা। জাহাজ চালানো কঠিন হয়ে উঠল। নক্ষত্রগুলোকে অচেনা অবস্থানে দেখতে পেলাম আমরা। সূর্যও তার প্রকৃতি বদলেছে। দক্ষিণ দিকে ধেয়ে এল ভীষণ ঝড়। দশ দিনের দিন একজন কু পানির তোড়ে ভেসে গেল। আগের মতোই উত্তর দিকে চলেছি আমরা। একত্রিশ দিন পর আমাদের দেবতা পথ দেখিয়ে নিরাপদ একটা বে-তে নিয়ে এল আমাদের। এখানে আমরা মেরামতের কাজ সারলাম। তীর থেকে যতটুকু যা রসদ পাওয়া যায় ভোলা হলো। জাহাজে আমরা কিছু পাথর তুললাম, অতিরিক্ত ব্যালাস্ট হিসেবে। সৈকত থেকে খানিকটা সামনে খর্বকায় পাইনগাছের বন দেখলাম। লাঠির সামান্য খোঁচা দিতেই বালি থেকে মিষ্টি পানি বেরোল।
ছদিন নির্বিঘ্ন জাহাজ চালাবার পর আবার একটা ঝড় আঘাত হানল। আমাদের পাল ছিঁড়ে গেল। ভেঙে গেল মাস্তুল। ভেসে গেল দাঁড়। নির্দয় বাতাসের ধাক্কায় অনেকগুলো দিন অসহায়ের মতো ভেসে চললাম আমরা। দিনের হিসাব হারিয়ে ফেললাম। ঘুমানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচণ্ড শীত অনুভব করছি, এমন আবহাওয়ার কথা কেউ আমরা কখনও শুনিনি। ডেকের ওপর বরফ জমে যাচ্ছে। জাহাজ স্থির রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ঠাণ্ডায় কাতর ও ক্লান্ত ক্রুদের নির্দেশ দিলাম, পানি আর মদের জারগুলো জাহাজ থেকে ফেলে দাও।
এই জারগুলোই তুমি পেয়েছে সমুদ্রের তলে, রেডফার্ন পিটের উদ্দেশ্যে বললেন। সেই দীর্ঘ বে-তে ঢোকার কিছু সময় পর সৈকতে জাহাজ ভেড়াতে সমর্থ হলাম আমরা, তারপর দুদিন দুরাত মড়ার মতো ঘুমালাম।
দেবতা সেরাপিস নিষ্ঠুর হলেন। শীত এসে গেল, বরফে আটকা পড়ল জাহাজ! সাহসে বুক বেঁধে গ্রীষ্মের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকল না। বে-র ওপারে অসভ্যদের গ্রাম, তারা আমাদের সাথে বিনিময় বাণিজ্যে রাজি হলো। আমরা খাবার সংগ্রহ করলাম। তারা আমাদের স্বর্ণমুদ্রা তুচ্ছ গহনা হিসেবে ব্যবহার করল, ওগুলোর আসল মূল্য সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। তাদের কাছ থেকে শিখলাম দৈত্যাকার কটা মাছের তেল পুড়িয়ে কীভাবে গরম থাকতে হয়। আমাদের সবার পেট ভরা, আশা করি এই বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারব।
সময় পেলেই প্রতিদিন কিছু কিছু লিখছি। আজ আমি স্মরণ করব সেরাপিসের হোল্ড থেকে ভেনাটর কী ধরনের কার্গো তার ক্রীতদাসদের দিয়ে বের করেছিল। গ্যালি থেকে লুকিয়ে সব আমি দেখেছিলাম। জিনিসটা ছিল প্রকাণ্ড, সেটাকে বের করার সাথে সাথে সবাই হাঁটু গেড়ে সম্মান প্রদর্শন করে।
কী বোঝাতে চেয়েছে রাফিনাস? প্রশ্ন করল লিলি।
ধৈর্য ধরুন, বললেন ড. রেডফার্ন। শুনুন।
তিনশো বিশটা তামার টিউব, জিওলজিকাল চার্ট লিখে চিহ্নিত করা। তেষট্টিটা পর্দা। সোনা আর কাঁচ দিয়ে তৈরি কফিনের সাথে ছিল ওগুলো। কফিনটা আলেকজান্ডারের। আমার হাঁটু কাঁপতে লাগল। আমি তার মুখ দেখতে পেলাম…
খতম, আর কিছু লেখেনি রাফিনাস, বিষণ্ণ কণ্ঠে বললেন ড. রেডফার্ন। এমনকি বাক্যটিও শেষ করেনি সে। শেষ মোম ট্যাবলেটে একটা নকশার সাহায্যে দেখানো হয়েছে তীর আর সৈকতের সাধারণ আকৃতি আর নদীর গতিবিধি।
আলেকজান্ডার দি গ্রেটের নিখোঁজ কফিন, ফিসফিস করে বলল লিলি। তাহলে কি আজও তিনি কোনো এক পাহাড়ের ভেতর সুড়ঙ্গে শুয়ে আছেন?
আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরির মাঝখানে? প্রশ্নটা যোগ করলেন ড. রেডফার্ন। আশা করতে দোষ কী!
পিটের প্রতিক্রিয়া অন্য রকম হলো। চেহারায় দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলল, আশা জিনিসটা শুধু দর্শকদের জন্য। আমরা ধারণা, চেষ্টা করলে ত্রিশ দিনের মধ্যে লাইব্রেরিটা খুঁজে বের করা সম্ভব,..না, বিশ দিনের মধ্যেই পারা যাবে।
ড. রেডফার্ন আর লিলির চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। পিট যেন রাজনৈতিক নেতা, নির্বাচনে দাঁড়িয়ে দ্রব্যমূল্য কমাবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ওরা কেউ তার কথা বিশ্বাসই করল না।
পিট বলল, অমন হা করে তাকিয়ে থেকো না এটাকে একটা কাজ হিসেবে দেখলে অসম্ভবের কিছু নেই। দেখি তো নকশাটা।
মোম ট্যাবলেট দেখে নকশাটা বড় করে এঁকেছে লিলি, তার আঁকাটাই পিটের হাতে ধরিয়ে দিলেন ড. রেডফার্ন। তেমন কিছু নেই ওতে, আঁকাবাঁকা কয়েকটা রেখা ছাড়া। এ থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে বলে মনে করি না, বললেন তিনি।
নকশাটা দেখে মুখ তুলল পিট। এই-ই যথেষ্ট, দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে বলল ও। এটাই আমাদের সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
.
ভোর চারটের সময় পিটের ঘুম ভাঙানো হলো।
