জাহাজগুলোর কার্গো কী জিনিস, কোথা থেকে আনা হয়, পাহাড়ের কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে, এখন আমি সব জানি। এ ধরনের গোপন ব্যাপার মরণশীল মানুষের কাছে গোপন রাখাই শ্রেয় বলে ভেবেছিল ভেনাটর। দেশে ফেরার পথে বিশ্বস্ত কয়েকজন সৈনিক ও একটা জাহাজের কয়েকজন কুকে বাদ দিয়ে ভেনাটর আর সেভেরাস বাকি সবাইকে খুন করবে বলে সন্দেহ করেছিলাম আমি।
আমি আমার মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে উঠি। আমার ক্রুদের সশস্ত্র থাকার নির্দেশ দিই, বলি তারা যেন প্রতিটি মুহূর্তে জাহাজের কাছাকাছি থাকে, যাতে বেঈমানির আভাস পাওয়া মাত্র নোঙর তুলতে পারি। কিন্তু ভেনাটর বেঈমানি করার আগেই অসভ্যরা হামলা করে বসল, কচুকাটা করল ভেনাটরের ক্রীতদাস আর সেভেরাসের সৈনিকদের। আমাদের প্রহরীরাও মারা পড়ল যুদ্ধে, তবে বিপদ ঘটার আগেই দড়িদড়া ছিঁড়ে গভীর পানিতে সেরাপিসকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলাম আমরা। ছুটে এসে পানিতে লাফিয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করল ভেনাটর। উদ্ধার পাবার জন্য তার ব্যাকুলতা আমরা লক্ষ করলাম। কিন্তু আমার মেয়ে ও ক্রুদের প্রাণের ওপর ঝুঁকি নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। জাহাজ ঘুরিয়ে তাকে উদ্ধার করার কোনো চেষ্টাই আমরা করলাম না। স্রোতের বিরুদ্ধে কাজটা করতে গেলে সবাইকে নিয়ে আত্মহত্যা করা হতো।
এই পর্যায়ে এসে একটু বিরতি দিলেন ডক্টর রেডফার্ন। এখানে এসে রাফিনাস আচমকা পেছনের ঘটনা বর্ণনা শুরু করেছে, সেই কার্টাজেনা বন্দর থেকে।
এর পেছন থেকে আমাদের গন্তব্য সেই অদ্ভুত জগতে পৌঁছতে আটান্ন দিন লাগল। পিঠে বাতাসের ধাক্কাসহ আবহাওয়া ছিল অনুকূল। আমাদের ভাগ্যকে এই সহায়তাদানের বিনিময়ে দেবতা সেরাপিস উৎসর্গ দাবি করলেন। অচেনা রোগে মারা গেল আমাদের দু’জন ক্রু।
নির্ঘাত স্কার্ভি, বলল লিলি।
স্পেনীয়দের দীর্ঘ যাত্রার আগে স্কার্ভির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়নি। অন্য যেকোনো রোগ হওয়া বিচিত্র না, জানাল পিট।
বাধা দেওয়ার জন্য দুঃখিত। প্লিজ, পড়ে যান, লিলি ক্ষমা প্রার্থনা করে।
প্রথমে আমরা বড় একটা দ্বীপে পা ফেললাম, সেখানকার অসভ্যরা সেদিয়ানদের মতো দেখতে, তবে গায়ের রং আরও অনেক কালো। তারা আমাদের সাথে বন্ধুর মতো ব্যবহার করল, সাহায্য করল জাহাজ মেরামতের কাজে, রসদ সংগ্রহেও সহযোগিতা কর।
আরও দ্বীপ দেখলাম আমরা। তবে ফ্ল্যাগশিপ থামল না। একমাত্র ভেনাটর জানে জাহাজগুলো কোথায় যাচ্ছে। অবশেষে আমরা নমানবশূন্য একটা সৈকত দেখতে পেলাম, জাহাজ নিয়ে পৌঁছলাম একটা নদীর চওড়া মুখে। আমাদের অনুকূলে বাতাস বইবে, এই অপেক্ষায় পাঁচ দিন পাঁচ রাত অপেক্ষা করলাম আমরা। তারপর পাল তুলে নদী বরাবর এগোলাম, মাঝেমধ্যে বৈঠা চালালাম, যতক্ষণ না পৌঁছলাম রোমের পাহাড়ে।
রোমের পাহাড়! অন্যমনস্কভাবে বিড়বিড় করল লিলি। ধাঁধা মনে হচ্ছে।
আসলে বোধ হয় রোমের পাহাড়ের সাথে তুলনা করেছে রাফিনাস, ধারণা করল পিট।
কঠিন ধাঁধা, স্বীকার করলেন ড. রেডফার্ন।
ওভারশিয়ার ল্যাটিনিয়াস মাসেরের অধীনস্থ ক্রীতদাসরা নদীর ওপর পাহাড়ে সুড়ঙ্গ তৈরি করল। আটমাস পর জাহাজগুলো থেকে লুকানোর জায়গায় বয়ে নিয়ে যাওয়া হলো কার্গো।
লুকানোর জায়গার বর্ণনা দিয়েছে? জিজ্ঞেস করল পিট।
একটা কপি তুলে নিয়ে মোম ট্যাবলেটের লেখার সাথে মেলালেন ড. রেডফার্ন। একজোড়া শব্দ অস্পষ্ট। আন্দাজ করে নিয়ে পড়তে হবে।
এভাবে গোপন জিনিসের গোপনীয়তা ক্রীতদাসদের তৈরি করা সুড়ঙ্গের ভেতর সুরক্ষিত করা হলো। বেড়া থাকায় জায়গাটা দেখতে পাওয়া যায় না। কার্গোর প্রতিটি জিনিস পাহাড়ের ভেতর ঢোকানোর পর অসভ্য হামলাকারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। সময়মতো সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল কি না আমি বলতে পারব না। সৈকত থেকে ঠেলে আমার জাহাজটাকে পানিতে নামানোর কাজে ব্যস্ত ছিলাম আমরা।
দূরত্ব জানাতে ব্যর্থ হয়েছে রাফিনাস, বলল পিট। দিকনির্দেশও দেয়নি। কে জানে অসভ্যরা পাহাড় খুঁড়ে সংগ্রহগুলো নষ্ট করেছে কি না।
এত হতাশ হয়ো না তো! ধমকের সুরে বলল লিলি। ভেনাটর নিশ্চয়ই সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ করেছিলেন। এই বিপুল সংগ্রহ এমনভাবে হারিয়ে যেতে পারে না যেন সেগুলোর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। অন্তত কিছু কিছু নিশ্চয়ই উদ্ধার করা যাবে।
জায়গাটা কোথায়, নির্ভর করছে তার ওপর, বলল পিট। সেরাপিস টাইপের জাহাজ, আটান্ন দিনে চার হাজার নটিক্যাল মাইল পাড়ি দিতে পারে।
যদি সোজা একটা রেখা ধরে এগোয়, বললেন ড. রেডফার্ন। কিন্তু রাফিনাস জানায়নি তারা তীর ঘেঁষে গিয়েছিল কি না। শুধু লিখেছে আটান্ন দিন পর প্রথ একটা দ্বীপে পা ফেলে। তবে আমার ধারণা, সম্ভাব্য একটা জায়গা হতে পারে পশ্চিম আফ্রিকার দক্ষিণ উপকূল। ফিফথ সেঞ্চুরি বি. সি-তে একদল ফিনিশিয়ান ক্রু ঘড়ির কাটা ঘোরার আদলে আফ্রিকাকে চক্কর দিয়ে এসেছিল। রাফিনাসের সময়ে এলাকাটার বেশির ভাগই চার্ট করা হয়ে গেছে। স্ট্রেইটস অভ জিব্রালটার পেরোবার পর ভেনাটর তার জাহাজগুলোকে দক্ষিণ দিকে নিয়ে যায়, এটাই যেন যুক্তিসংগত বলে মনে হয়।
কিন্তু রাফিনাস দ্বীপের কথা বলছে, মনে করিয়ে দিল পিট।
