খাড়ির তলায় পা ঠেকল পিটের। মুখ তুলে ওপর দিকে তাকাল। বরফের গর্ত স্নান আভার মতো লাগল। কম্পাস চেক করল ও। ঝামেলা হবে ভেবে ডেপথ গজ আনেনি সাথে। কথা বলো আমার সাথে, যান্ত্রিক গলা পেল।
তলায় পৌঁছে গেছি, বরর পিট। সবগুলো সিস্টেম চমৎকার কাজ করছে। সবুজ পানির ভেতর দিয়ে তাকালও। জিনিসটা আমার উত্তরে দশ মিটার দূরে। যাচ্ছি ওদিকে। লাইন ঢিঠ দাও।
ধ্বংসাবশেষের পেছনটা ধীরে ধীরে ওর চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। পুরু শেওলায় ঢাকা পড়ে রয়েছে পাশগুলো। গ্লাভস পরা হাত দিয়ে খানিকটা শেওলা সরাল, সবুজ মেঘ তৈরি হলো সামনে। পানি আবার স্বচ্ছ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো ওকে। প্রায় এক মিনিট পর বলল, লিলি আর ড. গ্রোনকুইস্টকে জানাও, স্টার্ন রাডার ছাড়াই একটা ভোলা দেখতে পাচ্ছি আমি, তবে স্টিয়ারিং-এর জন্য কোনো দাঁড় নেই।
জানাচ্ছি।
একটা ছুরি বের করে খোলের নিচে, কিল-এর কাছে খোঁচা মারল পিট। বেরিয়ে পড়ল নরম ধাতু। খোলের তলাটা সিসা দিয়ে মোড়া, ঘোষণার সুরে বলল ও।
লক্ষণ নাকি খুব ভালো, জবাবে বলল জিওর্দিনো। ড. গ্রোনকুইস্ট জানতে চাইছেন স্টার্নপোস্টে কোনো খোদাই করা লেখা আছে কি না।
হোল্ড অন। খানিক পর আবার বলল পিট, স্টার্নপোস্টে ঢোকানো রয়েছে শক্ত কাঠের ফলকের মতো কী যেন একটা। অক্ষরগুলো পড়তে পারছি না। একটা মুখও দেখছি।
মুখ?
মাথায় কোঁকড়ানো চুল, প্রচুর দাঁড়ি।
পড়ার চেষ্টা করো।
কী আশ্চর্য, গ্রিক আমি পড়ব কীভাবে?
গ্রিক, ল্যাটিন নয়? তীক্ষ্ণকণ্ঠে জিজ্ঞেস করল জিওর্দিনো।
ল্যাটিন নয়, গ্রিক।
ঠিক জানো?
আরে ভাই, গ্রিক এক মেয়ের সাথে বেশ কিছুদিন সম্পর্ক ছিল আমার!
রাগ কোরো না, রাগ কোরো না! আর্কিওলজিস্টদের মাথা খারাপ করে দিয়েছ তুমি! দুমিনিট পর আবার গলা শুনতে পেল পিট, ড. গ্রোনকুইস্ট বলছেন, তোমার মতিভ্রম ঘটেছে। তবে মাইক গ্রাহাম বলছেন, কলেজে তিনি ক্লাসিকাল গ্রিক পড়েছেন, জানতে চাইছেন তুমি অক্ষরগুলোর বর্ণনা দিতে পারবে কি না।
প্রথম অক্ষরটা ইংরেজি এস-এর মতে, যেন আকাশের বিদ্যুৎ আঘাত হানতে যাচ্ছে। তারপর একটা এ, তবে সেটার ডান পা নেই। এরপর পি-সামান্য লেজ আছে। পি-র পর পঙ্গু আরেকটা এ, তারপর উল্টানো এল বা ফাঁসিকাঠ। এবার আই, এবং শেষ অক্ষর আরেকটা বিদ্যুৎ আকৃতি এস।
তাঁবুতে বসে স্পিকারের মাধ্যমে পিটের গলা শুনছে মাইক গ্রাহাম, লিখে নিচ্ছে কাগজে। অক্ষরগুলো পাশাপাশি সাজানোর পর দাঁড়াল :
লেখাটার দিকে কয়েক মুহূর্ত ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকল মাইক। কী যেন একটা ঠিক মিলছে না। স্মৃতির পাতা ওল্টাতে শুরু করল সে। তারপর মনে পড়ল। অক্ষরগুলো ক্লাসিকাল, তবে ঈস্টার্ন গ্রিক। চিন্তিত ভাব বদলে গিয়ে তার চেহারায় অবিশ্বাস ফুটে উঠল। কাগজের ওপর খস খস করে কিছু লিখল সে, একটানে ছিঁড়ে লিলির দিকে সিধে করে ধরল। আধুনিক ইংরেজি অক্ষরে লেখা শব্দটা হলো : SARACIL
চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল লিলি। এর কি বিশেষ কোনো অর্থ আছে?
উত্তর দিলেন ড. গ্রোনকুইস্ট, আমার ধারণা, ওটা এক গ্রিক ঈজিপশিয়ান দেবতার নাম।
ভূমধ্যসাগরের আশপাশে অত্যন্ত জনপ্রিয় দেবতা উনি, একমত হলো হসকিন্স। আধুনিক বানানো সাধারণত লেখা হয় এস-এর পর ই দিয়ে।
তাহলে আমাদের জাহাজ সেরাপিস, বিড়বিড় করে উঠল লিলি।
আমাদের বিদ্যালয় কুলোবে না, ড. গ্রোনকুইস্ট বললেন। একজন মেরিন আর্কিওলজিস্ট বলতে পারবেন, বিশেষ করে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় জাহাজ সম্পর্কে যদি তার জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা থাকে।
বরফের নিচে জাহাজটাকে ঘিরে সাঁতার কাটল পিট। এক জায়গায় বরফ ভেতর দিকে দেবে থাকতে দেখে পায়ের ফিন দিয়ে বারকয়েক আঘাত করল ও। বরফের আবরণ আরও ভেতর দিকে দেবে গেল। একটা হাত গলাল ও। কী যেন ঠেকল হাতে। সম্ভবত খোলের একটা তক্তা। সেটা ধরে নিজের দিকে টানতে শুরু করল ও।
অনেক্ষণ চেষ্টার পর তক্তাটা বাঁকা হলো, কিন্তু ভাঙল না। হাল ছেড়ে দেবে কি না ভাবছে পিট, এই সময় তক্তাটাই পরাজয় স্বীকার করল, ভাঙা অংশটা নিয়ে পেছন দিকে আছাড় খেল ও আদর্শ একজন আর্কিওলজিস্ট উপস্থিত থাকলে পিটের চির শত্রুতে পরিণত হতেন। এ ধরনের প্রাচীন শিল্পকর্ম ভাঙা আর সাতটা খুন করা প্রায় একই কথা।
পাথরে ধাক্কা খাওয়ায় কাঁধটা ব্যথা করছে পিটের। ঠাণ্ডাও অসহ্য মনে হচ্ছে। নিচে আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না। খোলের একটা জায়গা ভাঙতে পেরেছি, হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ও। একটা ক্যামেরা পাঠাও।
উঠে এসো, দেয়া যাবে, বলল জিওর্দিনো।
গর্তের মুখে উঠে এল পিট। দেখল, ক্যামেরা নিয়ে গর্তের কিনারায় শুয়ে রয়েছে জিওর্দিনো। আন্ডারওয়াটার ভিডিও ক্যামেরা/রেকর্ডারটা ওর হাতে ধরিয়ে দিল সে। তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফিরে এসো। যথেষ্ট কৃতিত্ব দেখিয়েছ।
কমান্ডার নাইট কী বলেন?
একটু দাঁড়াও। ওকে দিচ্ছি লাইনে।
ইয়ারফোনে ভেসে এল নাইটের গলা, ডার্ক?
বলুন, বায়রন।
তুমি কি নিশ্চিত, এক হাজার বছর পুরনো একটা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ পেয়েছি আমরা?
বেশ শক্ত প্রমাণ আছে তো।
কিন্তু কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে হলে বেশ অকাট্য প্রমাণ লাগবে। নিদেনপক্ষে একটা দুটো প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
