ড. গ্রোনকুইস্ট পিটের কাঁধের ওপর হুমড়ি খেলেন। চেনার মতো স্পষ্ট নয় এখনও। আপনার কী মনে হচ্ছে?
পাহাড়ের মাথা থেকে অনেক জিনিস পড়েছে নিচে, সবগুলো বরফে প্রায় ঢাকা, বলল পিট। এটারও তাই, তবে যে অংশটুকু বেরিয়ে আছে, আমার মনে হচ্ছে…ওটা একটা কাঠের তৈরি জাহাজ। ভালো করে দেখুন, চারকোণা একটা আকৃতি বেরিয়ে আছে, স্টার্নপোস্ট হতে পারে।
পিটের আরেক কাঁধের ওপর হুমড়ি খেয়ে রয়েছে লিলি। চেঁচিয়ে উঠল সে, হ্যাঁ, ঠিক তাই! গড! ওহ্ গড! ওগুলো চতুর্থ শতাব্দীর বাণিজ্য জাহাজে দেখা যেত!
উত্তেজিত হবেন না, সাবধান করে দিলেন কমান্ডার বায়রন নাইট। অত পুরনো আমলের নাও হতে পারে!
ড. গ্রোনকুইস্ট পরামর্শ দিলেন, আমরা একটা ক্যামেরা নামিয়ে স্পষ্ট ছবি পাবার চেষ্টা করতে পারি।
অ্যাল জিওর্দিনো সন্দেহ প্রকাশ করল, বরফের ভেতর লুকানো অংশটার ছবি আপনি ক্যামেরা থেকে পাবেন না।
পুরুষ কর্মীর অভাব নেই আপনাদের, বলল লিলি। নিচের বরফ ভাঙা কোনো সমস্যা নয়।
ব্রিজের ইলেকট্রনিক কমপার্টমেন্টে চলে গেলেন ড. গ্রোনকুইস্ট ফিরলেন আধ মিনিট পর। ধ্বংসাবশেষের ওপর জমাট বরফ তিন মিটার পুরু, বললেন তিনি। ভাঙতে কম করেও দুদিন লাগবে।
আমাদের ছাড়াই আপনাদের খননকাজ চালাতে হবে, বললেন কমান্ডার নাইট, ঠিক ১৮০০ ঘণ্টার আগে আমাকে চলে যেতে বলা হয়েছে। এত দীর্ঘমেয়াদি কোনো কাজে লাগা সম্ভব হবে না।
চমকে গেছেন গ্রোনকুইস্ট। সে তো মাত্র পাঁচ ঘণ্টা পর!
কিছু করার নেই, অর্ডার, অসহায়ের মতো বললেন কমান্ডার।
রেকর্ডিং পেপারে কালো ছায়াটা মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করল পিট, এরপর বায়রন নাইটের দিকে ফিরে বলল, যদি আমি প্রমাণ করতে পারি, নিচে ওটা ফোর্থ সেঞ্চুরির রোমান জাহাজ, কর্তৃপক্ষের কাছে আরো দুই-এক দিন সময় চাইতে পারবেন আপনি?
চোখ সরু করে তাকালেন নাইট, কী বলতে চাও?
আগে বলুন, সময় চাইবেন কি না? পিট নাছোড়বান্দা।
অবশ্যই। কিন্তু আগে নিঃসন্দেহভাবে প্রমাণ করো, ওটা হাজার বছর আগের জাহাজের ধ্বংসাবশেষ।
ঠিক তো?
কীভাবে কী করবে?
খুব সহজ, আমুদে কন্ঠে পিট জানায়, বরফের নিচে ডুব দিয়ে দেখে আসব।
.
চেইন লাগানো করাত দিয়ে প্রথমে নিরেট আইসপ্যাকের বুকে এক মিটার গভীর একটা গর্ত করা হলো। তারপর ধীরে ধীরে বাড়ানো হলো গর্তের পরিধি। অবশেষে স্লেজহ্যামারের আঘাতে গর্তের নিচের বরফ ভাঙা হলো, টুকরোগুলো ভোলা হলো গ্যাপলিং হুকের সাহায্যে। এবার নিরাপদে ডুব দিতে পারবে পিট।
কাজ শেষ করে ক্যানভাস ঢাকা একটা তাবুতে ঢুকল কর্ক সিমোন। ভেতরে হিটিং সিস্টেম কাজ করছে। একপাশে ডাইভিং ইকুইপমেন্ট দেখা গেল। সঙ্গী আর্কিওলজিস্টদের সাথে আলোচনা করছে লিলি। ফোল্ডিং চেয়ারে বসে আছে তারা। কাগজে ড্রইং আঁকছে পিট। আঁকার দায়িত্ব নিজে নিয়ে পিটকে ডাইভের জন্য তৈরি হবার তাগাদা দিল লিলি।
ভেতরে ঢুকে সিমোন বলল, গর্ত আপনার জন্য তৈরি, মি. পিট।
আর পাঁচ মিনিট, বলল অ্যাল জিওর্দিনো। মার্ক ওয়ান-এর নেভি ডাইভার মাস্কের ভালভ আর রেগুলেটর পরীক্ষা করছে সে।
স্পেশাল ড্রাই স্যুটটা পরে নিল পিট। মাথায় পরল হুড, কোমরে জড়াল কুইক রিলিজ ওয়েট বেল্ট। সেই সাথে প্রাচীন জাহাজের কাঠামো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত জ্ঞানার্জন করছে ড. গ্রোনকুইস্টের কাছ থেকে।
খোল-এর জন্য সাধারণত তারা ওক ব্যবহার করত।
কাঠ চিনি, কিন্তু কোনোটা কোনো গাছের বুঝি না।
তাহলে খোলটা পরীক্ষা করবেন। প্রাচীন খোলের বৈশিষ্ট্য হলো…
তাঁর কথার মাঝখানে কথা বলল জিওর্দিনো, রিজার্ভ এয়ার বটল লাগবে তোমার পিট?
ড. গ্রোনকুইস্টের কথায় কান, উত্তরে শুধু মাথা নাড়ল পিট। ওর মাথায় মার্ক ওয়ান মাস্কটা পরিয়ে দিল জিওর্দিনো, ওটার সাথে কমিউনিকেশন লাইন আছে।
নেভির একজন কর্মী এয়ার সাপ্লাই হোস ও কমিউনিকেশন লাইন ঢিলে করছে, পিটের কোমরে একটা ম্যানিলা লাইফলাইন বেঁধে দিল জিওর্দিনো, তারপর হেডসেট মাইক্রোফোনে পিটকে জিজ্ঞেস করল, পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছ?
পরিষ্কার, তবে আস্তে, বলল পিট। আওয়াজ বাড়াও একটু।
অল সেট?
ওকে সংকেত দিল পিট। সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে এসে পিটকে আলিঙ্গন করল লিলি শার্প, মাস্কের ভেতর পিটের চোখে চোখ রেখে বলল, গুড হান্টিং, অ্যান্ড বি কেয়ারফুল।
উত্তরে চোখ মটকাল পিট। বেরিয়ে এল তাবু থেকে। পেছনে লাইনে নেভির দু’জন কর্মী।
তাঁবু থেকে বেরোতে যাচ্ছে জিওর্দিনো, তার হাত চেপে ধরল লিলি। ওর গলা আমরা সবাই শুনতে পাব?
পাবেন। স্পিকারের সাথে ওর যোগাযোগ ঘটিয়ে দিয়েছি, বলল জিওর্দিনো আপনি আর ড. গ্রোনকুইস্ট এখানেই থাকুন, কখন কী বলে পিট, শুনবেন। জরুরি কোনো মেসেজ থাকলে জানাবেন আমাকে, পিটকে পাঠিয়ে দেব আমি।
দ্রুত বরফের গর্তের কাছে পৌঁছে গেল পিট। বাতাসের তাপমাত্রাই শূন্যের নীচে।
কমান্ডার নাইট এসে কাঁধে একটা হাত রাখলো। এক ঘণ্টা তেইশ মিনিট বাকি। বুঝেছো?
কোনো কথা বলে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে পানিতে তলিয়ে গেল পিট।
পানির নিচে দৃষ্টিসীমা নাক বরাবর আশি মিটারের মতো। তিন মিটার লম্বা একটা দাড়িওয়ালা সিল চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে ওর দিকে। তার উদ্দেশ্য একটা হাত লম্বা করে দিয়ে নাড়ল পিট, পালিয়ে গেল সীল।
