ছায়া থেকে বেরিয়ে এসে গর্তের ভেতর উঁকি দিল পিট। তুমি কি তৈরি?
চরকির মতো আধপাক ঘুরল লিলি, যতটা না চমকে উঠেছে তার চেয়ে বেশি। হতভম্ব। কিসের জন্য তৈরি?
শহরে যাবার জন্য?
এতক্ষণে সচেতন হলে লিলি। লণ্ঠনটা গর্ত থেকে তুলল সে, ধীরে ধীরে সিধে হলো। পিটের চোখে তাকিয়ে থাকল দুই সেকেন্ড। হিসহিস শব্দ করছে কোলম্যান। সময় পেয়ে তার গাঢ় লাল চুল দেখে মনে মনে প্রশংসা করল পিট। মি. ডার্ক পিট, সত্যি তো? দস্তানা খুলে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল লিলি।
পিটও একটা হাতের দস্তানা খুলে, মৃদু চাপ দিয়ে করমর্দন করল। সুন্দরী মেয়েরা আমাকে শুধু ডার্ক বললে খুশি হই।
অপ্রতিভ ছোট্ট খুকির মতো লাগল নিজেকে, মেকআপ করা হয়নি বলে আরও অস্বস্তিবোধ করল লিলি। তারপর লক্ষ করল, কাপড়ে আর হাতে মাটি লেগে রয়েছে। পরিস্থিতি রীতিমত সঙ্গীন হয়ে উঠল চেহারা লালচে হয়ে উঠছে বুঝতে পেরে।
শার্প…লিলি, থেমে থেমে বলল সে। আমার সঙ্গীদের সাথে আলাপ করছিলাম, কাল রাতে যে সাহায্যে তোমার কাছ থেকে পেয়েছি, অন্তত মৌখিক একটা ধন্যবাদ। দিয়ে আসা উচিত। আমরা হয়তো যেতাম, নিজে চলে এসে ভালো করেছ। ডিনারের প্রস্তাবটা ঠাট্টা মনে করেছিলাম। সত্যি যে আসবে ভাবিনি।
শুনতেই পাচ্ছ বাইরে কী ঘটছে, বলল পিট, একটা তুষার ঝড়ও আমাকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি।
তুমি নির্ঘাত একটা উম্মাদ।
না, স্রেফ বোকা বলতে পারো এইজন্য যে ভেবেছিলাম আর্কটিক ঝড় আমার সাথে পাল্লা দিয়ে পারবে না।
দু’জনেই হেসে উঠল একসাথে, সেই সাথে আড়ষ্ট ভাবটা দূর হয়ে গেল। গর্ত থেকে উঠতে গেল লিলি, তার একটা হাত ধরে সাহায্য করল পিট। ব্যথা পেয়ে উফ করে উঠল লিলি, সাথে সাথে তার হাত ছেড়ে দিল পিট। পা এখনও ব্যথা করছে, তাই না? হাঁটাচলা করা উচিত হচ্ছে না।
একটু আড়ষ্ট হয়ে আছে, নীলচে হয়ে আছে কয়েক জায়গায়, তোমাকে দেখানো যাবে না। তবে মরব না এক্ষুনি।
লিলির হাত থেকে লণ্ঠনটা নিয়ে কাঠামোর চারদিকে আলো ফেলে দেখল পিট। কী পেয়েছ এখানে?
এস্কিমোদের একটা গ্রাম, এক থেকে পাঁচশো খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এখানে তারা বাস করত।
নামকরণ হয়েছে?
সাইটের নাম রেখেছি গ্রোনকুইস্ট বে ভিলেজ। ড. হিরাম গ্রোনকুইস্ট, আমাদের দলনেতা। জায়গাটা তিনি পাঁচ বছর আগে আবিষ্কার করেন।
তিনজনের মধ্যে একজন, কাল রাতে যাদের দেখলাম?
প্রকাণ্ড মানুষটা, অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন।
কেমন আছেন তিনি?
মাথায় বড় একটা কালচে দাগ থাকলেও কিরে-কসম খেয়ে বলছেন, কোনো ব্যথা নেই। ঘর থেকে বেরোবার সময় দেখে এসেছি, একটা হাঁস রোস্ট করতে বসেছেন।
হাঁস? হেসে উঠল পিট। তার মানে তোমাদের সাপ্লাই সিস্টেম প্রথম শ্রেণীর।
মিনার্ভা প্লেন, ভার্টিক্যাল লিফট। এক প্রাক্তন ছাত্র ইউনিভার্সিটিকে ধার হিসেবে দিয়েছে। থিউল থেকে দুসপ্তাহ পরপর আসে।
এমন কিছু পেয়েছে, যা পাবার কথা নয়?
ঝট করে মুখ তুলে পিটের দিকে তাকাল লিলি। কেন, এ প্রশ্ন কেন করলে?
কৌতূহল।
মাটি খুঁড়ে আমরা প্রি হিস্টোরিক এস্কিমোদের হাতে তৈরি কয়েকশো শিল্পকর্ম পেয়েছি। লিভিং কোয়ার্টারে আছে সব, ইচ্ছে করলে পরীক্ষা করতে পারো।
হাঁসের রোস্ট খেতে খেতে?
চমৎকার হয়। গ্রোনকুইস্ট দারুণ রাঁধেন।
ভেবেছিলাম তোমাদের সবাইকে জাহাজের গ্যালিতে দাওয়াত দেব, কিন্তু হঠাৎ ঝড় শুরু হওয়ায় আমার প্ল্যান ভেস্তে গেছে।
টেবিলে নতুন মুখ দেখতে পেলে আমরা সবাই ভারি খুশি হই।
অস্বাভাবিক কিছু আবিষ্কার করেছ তোমরা তাই না? হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করল পিট।
সন্দেহে বিস্ফারিত হয়ে উঠল চোখজোড়া। কীভাবে বুঝলে? তীক্ষ্ণকণ্ঠে প্রশ্ন করল লিলি।
গ্রিক নাকি রোমান?
রোমান এমপায়ার, বাইজানটিয়াম।
বাইজানটিয়াম কি? পিটের চঞ্চল দৃষ্টি লিলির মুখে কী যেন খুঁজল। কত পুরনো?
একটা স্বর্ণমুদ্রা, চতুর্থ শতাব্দীর।
পেশিতে ঢিল পড়ল পিটের। বড় করে শ্বাস টানল, ছাড়ল ধীরে ধীরে। লিলি ওর দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, চেহারায় অস্বস্তি।
সে বেসুরো গলায় বলল, কিছু বলতে চাও?
যদি বলি, ধীরে ধীরে শুরু করল পিট, সাগর আর খাড়ির মাঝখানের একটা পথে রোমান আমলের জাহাজ ছড়িয়ে আছে?
জাহাজ! সবিস্ময়ে পুনরাবৃত্তি করল লিলি।
আন্ডারওয়াটার ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও টেপে জারগুলোর ফটো তুলে নিয়েছি আমরা।
গড! ওহ্, ডিয়ার গড! তার মানে এসেছিল! ওরা এসেছিল! লিলি যেন নেশার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। সত্যি ওরা আটলান্টিক পাড়ি দিয়েছিল। ভাইকিংদের আগে রোমানরা পা রেখেছিল গ্রিনল্যান্ডে!
প্রমাণ দেখে তাই তো মনে হচ্ছে, আস্তে করে লিলির কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে দরজার দিকে হাঁটিয়ে নিয়ে চলল পিট। ঝড়ের মধ্যে এখানে আমরাটকা পড়েছি, নাকি রশিটা তোমাদের লিভিং কোয়ার্টারের দিকে গেছে?
মাথা ঝাঁকাল লিলি। গেছে। ঘাড় ফিরিয়ে মেঝের গর্তগুলো আরেকবার দেখল সে। পাইথেয়াস, গ্রিক নেভিগেটর, খ্রিস্টের জন্মের তিনশো পঞ্চাশ বছর আগে একটা মহতি অভিযান শেষ করেন। কিংবদন্তি আছে, তারা উত্তর দিকে জাহাজ চালিয়ে আটলান্টিকে এসেছিলেন, সবশেষে পৌচেছিলেন আইসল্যান্ডে। অথচ আশ্চর্য ব্যাপার, আরও সাতশো বছর পর এত উত্তর আর পশ্চিমে রোমানরা এসেছিল কি না সে সম্পর্কে কোনো রেকর্ড বা কিংবদন্তি নেই।
