বোধ হয় ভুল বকছে না, বলল পিট। পাইলটের লাশ এখনও পাইনি আমরা। নাইটের দিকে তাকাল ও রাশিয়ান সাবমেরিন নিয়ে কী করা হবে?
আপাতত এটা নিয়ে আমরা কোনো খবর জানাচ্ছি না। ভাগ্যই বলতে হয়, এই প্লেন ক্রাশ আমাদের কাজের দিক থেকে সবার চোখ সরিয়ে দিয়েছে। তবে কতক্ষণ চাপা থাকবে সংবাদটা, তাই চিন্তার বিষয়।
বেশি খুশি না হওয়াই ভালো, অ্যাল জিওর্দিনো বলে। রাশিয়ানরা এত গাধা নয়। কখন দেখবেন সব বুঝে গেছে, তারপর দুনিয়ার জাহাজ আর উদ্ধারকারী বার্জ নিয়ে চলে এসেছে অকুস্থলে। ওরা দারুণ চতুর। জাহাজের পেছনে বেঁধে সোজা রাশিয়ায় নিয়ে থামবে সাবমেরিনটা।
যদি ধ্বংস করে দেয়? পিট জানতে চায়।
সোভিয়েতদের ভালো উদ্ধারকারী টেকনোলজি নেই। ওরা বরঞ্চ এতেই খুশি, কেউ যেন ওদের সাবমেরিন পরীক্ষা করে দেখতে না পারে।
কনিয়াকের বোতল পিটের হাতে ধরিয়ে দেয় জিওর্দিনো। এখানে বসে তর্ক না করে, চলো গিয়ে জাহাজের গরম হাওয়া খাই?
হ্যাঁ, কমান্ডার নাইট সায় দিলেন। তোমরা যথেষ্ট করেছে এখানে।
পারকা গায়ে দিয়ে নেয় পিট। আমার অবশ্য একটু স্কি করার শখ জেগেছে মনে।
তার মানে এখন জাহাজে আসছে না?
এই আর কী। ওই আর্কিওলজির দলটাকে একটু দেখে আসি।
অযথা। ডাক্তার তার কয়েকজন সাঙ্গ-পাঙ্গ পাঠিয়েছে ওখানে। ওরা ভালোই আছে।
তাহলে ওরা কী খুঁড়ে বের করল, তাই না হয় দেখি, পিট নাছোরবান্দা।
হ্যাঁ, যাও, গ্রিক দেবী-টেবিও পেয়ে যেতে পারো।
অসম্ভব কী! হাসল পিট।
কিন্তু প্লেন আর আরোহীদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কী বলবে ওদেরকে?
আমরা এখানে একটা জিওলজিক্যাল সার্ভে প্রজেক্টে কাজ করছি, বলল পিট। আরোহীরা ফিউজিলাজে আটকা পড়ে, হাইপথারমিয়ায় মারা গেছে।
আমার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, বলে রওনা হলো পিট।
তাজ্জব ব্যাপার! অ্যান্টিকস সম্পর্কে ওর আগ্রহ দেখে আমি আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি। জানতাম না, এই বিষয়েও ওর আগ্রহ আছে। নাইট বললেন।
আরে, ও-ই কি ছাই জানত নাকি! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে অ্যাল।
.
বরফের মাঠ শক্ত আর সমতল, খাড়ির ওপর দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পিট। উত্তর পশ্চিম দিকে কালো মেঘ, সেদিকে একটা চোখ রেখে এগোচ্ছে ও। রোদে ঝলমলে প্রকৃতি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে চেহারা পাল্টে রুদ্রমূর্তি ধরতে পারে, শুরু হয়ে যেতে পারে ঝড়-ঝঞ্ঝার তাণ্ডব নৃত্য, জানা আছে ওর। অন্ধকার হয়ে এলে দিক চেনার কোনো উপায় থাকে না, সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বরফের রাজ্যে পথ হারালে মৃত্যু অনিবার্য হয়ে দেখা দেবে।
দক্ষিণ দিকে যাচ্ছে পিট। তীররেখা পেরিয়ে এল। ধোয়ার একটা ক্ষীণ রেখা পথ দেখাচ্ছে ওকে। সন্দেহ নেই, আর্কিওলজিস্টদের আশ্রয় থেকে উঠছে ধোঁয়াটা।
আশ্রয় যখন আর মাত্র দশ মিনিটের পথ, এই সময় ঝড়ের কবলে পড়ল পিট। বিশ মিটার দূরে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিল, এখন পাঁচ মিটার দূরের বরফও পরিষ্কার নয়। জগিং করার ভঙ্গিতে ছুটল ও, ব্যাকুলতার সাথে আশা করছে সরল একটা রেখা ধরেই সামনে এগোচ্ছে সে। কোনোকোনি ছুটে এসে বাম কাঁধে আঘাত করছে তুষারকণা আর বাতাস, বাতাসের গায়ে সামান্য হেলান দিয়ে ছুটল ও।
বাতাসের গতিবেগ বাড়ল। হেলান দিয়ে থাকা সত্ত্বেও ঠেলে ফেলে দিতে চাইছে। ওকে। সামনে এখন প্রায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও। মাথা নিচু করে পায়ের দিকে চোখ রেখেছে, প্রতিটি পদক্ষেপ গুনছে, হাত দুটো মাথার দুপাশে ভাঁজ করা। জানে, কিছু দেখতে না পেয়ে হাঁটা মানে বৃত্তাকারে ঘোরা। হয়তো আর্কিওলজিস্টদের আশ্রয়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে, টেরও পাবে না। সবশেষে, ক্লান্ত শরীর নেতিয়ে পড়বে বরফের ওপর।
বাতাস যতই তীব্রগতি আর ঠাণ্ডা হোক, ভারী কাপড়গুলো গরম রাখছে শরীরটাকে। হার্টবিটের শব্দ শুনে বুঝতে পারছে, এখনও সে মাত্রাতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েনি।
আশ্রয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে মনে হতে দাঁড়িয়ে পড়ল পিট। এবার সাবধানে এগোল। ত্রিশ পা এগিয়ে থামল আবার। ডান দিকে ঘুরল, এগোল তিন মিটারের মতো। উল্টোদিক থেকে ধেয়ে আসা তুষার ঝড়ের ভেতর ফেলে আসা পায়ের চিহ্ন অস্পষ্টভাবে চিনতে পারল ও। ঘুরল, ফেলে আসা পথের সমান্তরাল রেখা ধরে এগোল এবার, এভাবে ত্রিশ মিটার পরপর দিক বদলে, একটা নকশা তৈরি করে গোটা এলাকা চষে ফেলার উদ্দেশ্য।
পাঁচবারে পাঁচটা রেখা তৈরি করল ও। আশ্রয়ের কোনো সন্ধান পেল না। তৈরি করা রেখাগুলো ধরে ফিরে এল মাঝখানে, অর্থাৎ তিন নম্বর রেখায়। এবার আড়াআড়িভাবে হাঁটা ধরল ও। তিনটে নতুন রেখা তৈরি শেষ করতে যাচ্ছে, এই সময় তুষারপে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার উপক্রম করল, হাতে ঠেকল একটা ধাতব দেয়াল।
দেয়াল ধরে দুবার দুটো কোণ ঘুরল পিট, হাতে চলে এল একটা রশি, রশিটা পৌঁছে দিল একটা দরজায়। ঠেলা দিতেই খুলে গেল সেটা। উপলব্ধিটুকু উপভোগ করল ও, তার প্রাণ সংশয় দেখা দিয়েছিল, তবে নিজেকে উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছে। সে। ভেতরে ঢুকতে হতাশ বোধ করল পিট।
এখানে কেউ বসবাস করে না। মেঝেতে স্তূপ হয়ে আছে পাথর আর মাটি, চারদিকে গর্ত। হিমাংকের খুব একটা ওপরে হবে না তাপমাত্রা। তবে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচা গেছে, কৃতজ্ঞচিত্তে ভাবল ও।
আলো আসছে শুধু একটা কোলম্যান লণ্ঠন থেকে। প্রথমে ভাবল, কাঠামোটার ভেতর কেউ নেই। তারপর গর্ত থেকে ধীরে ধীরে উঁচু হলো একজোড়া কাঁধ আর একটা মাথা। শরীরটা ঝুঁকে আছে, পিটের দিকে পেছন ফিরে, গর্তের ভেতর একদৃষ্টে তাকিয়ে কী যেন গভীর মনোযোগের সাথে পরীক্ষা করছে।
