কী ঘটতে যাচ্ছে উপলব্ধি করে আরও কয়েক সেকেন্ড বোবা হয়ে থাকলেন গাই রিভাস। তারপর বাঁচার আকুতিতে চিৎকার করে উঠলেন, ওহ্ গড়, নো! নো। নো নো!
আতঙ্কিত আমেরিকানকে গ্রাহ্যই করল না টপিটজিন, বেদির একপ্রান্তে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল সে। খানিক পর একবার শুধু মাথা ঝাঁকাল।
লোকগুলো রিভাসের কোট আর শার্ট খুলে নিল। বেরিয়ে পড়ল নগ্ন বুক।
টপিটজিনের হাতে হঠাৎ করে উদয় হলো লম্বা একটা ছোর। মাথার ওপর উঁচু করে ধরল সেটা। চাঁদের আলোয় চকচক করে উঠল কালো ফলা। এগিয়ে এল সে।
আর্তনাদ করে উঠলেন গাই রিভাস, সেটাই তার শেষ চিৎকার।
পরমুহূর্তে ছোরার ফলাটা গেঁথে গেল বুকে।
সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা উঁচু মূর্তিগুলো নির্লিপ্ত। হাজার বছর ধরে এ ধরনের অমানুষিক নিষ্ঠুরতা বহুবার দেখেছে তারা নির্লিপ্ত চোখে।
তখনও লাফাচ্ছে গাই রিভাসের হৃৎপিণ্ড, বুকের ভেতর থেকে সেটাকে যখন বের করা হলো।
.
১৩.
চারপাশে লোকজন ও ব্যস্ততা থাকলেও হিম উত্তরের গভীর নিস্তব্ধতা পিটের গোটা অস্তিত্বে যেন চেপে বসেছে। আর্কটিকের ঠাণ্ডা ওকে বিবশ করে ফেলছে একদম। এত শান্ত সুনসান নীরবতা- সমস্ত আওয়াজ শুষে নিচ্ছে যেন। পিটের মনে হতে লাগল ও বুঝি কোনো রেফ্রিজারেটরের মধ্যে রয়েছে।
অবশেষে দিনের আলো ফুটল, ধূসর রঙের অদ্ভুত কুয়াশা ভেদ করে এত স্নান যে সে আলোয় ছায়া পড়ে না। আরও একটু বেলা হতে কোমল কমলা-সাদা রং নিল আকাশ, হিম কুয়াশা পোড়াতে শুরু করেছে সূর্য। খাড়ির ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা পাথুরে চূড়াগুলোকে তুষারের সাদা বোরখা ঢাকা নারীমূর্তি মনে হলো।
অকুস্থলের চারদিকে এখন অন্য রকম চেহারা। প্রথমে পৌঁছেছে পাঁচটা এয়ারফোর্স হেলিকপ্টার, সাথে করে এনেছে আর্মি স্পেশাল সার্ভিস ফোর্স। লোকগুলো সশস্ত্র, থমথমে কঠিন চেহারা, গোটা এলাকা তারা নিশ্চিদ্রভাবে ঘিরে ফেলল। এক ঘন্টার পর পৌঁছুল ফেডারেল এভিয়েশন ইনভেস্টিগেটররা, বিধ্বস্ত প্লেনের বিচ্ছিন্ন অংশ কী কী সংগ্রহ করা হবে সব চিহ্নিত করে ফেলল তারা। তাদের পিছু পিছু এল প্যাথোলজিস্টদের একটা দল, লাশগুলো হেলিকপ্টারে তুলে নিয়ে চলে গেল এয়ারফোর্স বেস থিউল-এর মর্গে।
নেভির পক্ষ থেকে রইলেন কমান্ডার বায়রন নাইট, পোলার এক্সপ্লোরার পৌঁছেছে অকুস্থলে। ওটার ভেঁপুর গুরুগম্ভীর আওয়াজে সচকিত হলো সবাই।
সাইরেন বাজিয়ে ধীরে ধীরে খাড়ির মুখে ঢুকল পোলার এক্সপ্লোরার। গথিক দুর্গের মতো লাগল জাহাজটাকে। আইসপ্যাক ভেঙে অনায়াসে পথ করে নিল সেটা, অকুস্থল থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে থামল। কমান্ডার বায়রন নাইট ইঞ্জিন বন্ধ করলেন, সিঁড়ি বেয়ে বরফের ওপর নেমে এলেন। নেমেই তিনি উপস্থিত উদ্ধারকর্মীদের প্রয়োজনে জাহাজের সুবিধাদি ব্যবহার করার অনুরোধ জানালেন। কৃতজ্ঞচিত্তে তার প্রস্তাব গ্রহণ করল সবাই। কাজে বিরতি দিয়ে ছুটল তারা জাহাজের দিকে।
সিকিউরিটির অবস্থা দেখে পিট মুগ্ধ। কোনো খবর এখনো চাউড় হয়নি। কেবল কেনেডি।
আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট জানে জাতিসংঘের ফ্লাইট বিলম্ব করছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে অবশ্য সমস্ত খবর জানাজানি হয়ে যাবে।
মনে হচ্ছে, চোখের মণি জমে যাবে হে, বিষণ্ণ চিত্তে জিওর্দিনো বলে। নুমার হেলিকপ্টারের পাইলটের সিটে বসে এক কাপ কফি খাওয়ার চেষ্টা করছে সে।
তুমি তো সারা দিন-রাত ককপিটেই বসে আছো, পিট কটাক্ষ হানে।
আরে, বাইরের অবস্থা দেখে এখানে বসেই আমরা ফ্রস্টবাইট হয়ে যাচ্ছে, জিওর্দিনো সিরিয়াস চোখে জানায়।
বাইরে তাকিয়ে কমান্ডার বায়রন নাইটকে বরফের ওপর দিয়ে হেঁটে আসতে দেখল পিট। ঝুঁকে, দরজাটা খুলে মেলে ধরল সে। ঠাণ্ডায় আরো এক দপা গুঙিয়ে উঠল জিওর্দিনো।
শুভেচ্ছা জানিয়ে পারকার পকেট থেকে একটা কনিয়াকের বোতল বের করলেন নাইট।
চুরি করে এনেছি বোতলটা। ভাবলাম, তোমাদের প্রয়োজন হতে পারে।
বোতলটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে পিট বলল, আপনি এইমাত্র অ্যালকে স্বর্গে পাঠিয়ে দিলেন।
বোতলটা নিয়ে ঠাণ্ডায় হি হি করতে করতে জিওর্দিনো বলল, তারচেয়ে আমি নরক পছন্দ করব। ছিপি খুলে কয়েক ঢোক ব্র্যান্ডি খেল সে। বোতলটা পিটকে ফিরিয়ে দিল।
জাহাজে ওঁরা কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করল পিট।
মিস কামিল বিশ্রাম নিচ্ছেন। অবিশ্বাস্য ব্যাপার, আমাকে দুবার ডেকে তিনি দেখা করতে চেয়েছেন তোমাদের সাথে। নিউ ইয়র্কে ডিনার না কী যেন একটা ব্যাপারে।
ডিনার? পিটের চেহারায় কৌতুক।
মজার ব্যাপার, ফ্লাইট অ্যাটেনড্যান্টের হাঁটুর চামড়ায় ওষুধ লাগানোর পর সে নাকি বলেছে, তোমার সাথে তারও একটা ডিনার ডেট ঠিক হয়ে আছে।
ধোয়া তুলসী পাতার চেহারা নিয়ে পিট বলল, আমার ধারণা, ওদের নিশ্চয়ই খুব খিদে পেয়েছে।
পিটের হাত থেকে বোতলটা ছো দিয়ে কেড়ে নিল জিওর্দিনো, বলল, কেন যেন মনে হচ্ছে, এ গান আগেও আমি শুনেছি!
আর চিফ স্টুয়ার্ড?
তার অবস্থা বেশ খারাপই বলব, পিটের প্রশ্নের জবাব দিলেন নাইট। তবে ডাক্তার বলছেন, সেরে উঠবে। তার নাম রুবিন। ওষুধের প্রভাবে ঘুমিয়ে পড়ার সময় বিড়বিড় করে কি বলল, ভুল বকছে কিনা বুঝলাম না-ফাস্ট আর সেকেন্ড অফিসারকে খুন করেছে পাইলট, তারপর উড়ন্ত প্লেন থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে…
