আমি আশা করেছিলাম আপনার চেয়ে আরও উঁচু পদের কেউ আসবে।
আপনার শর্ত ছিল কথা বলবেন শুধু একজন লোকের সাথে। স্বভাবতই আমরা ধরে নিই, আপনি চান না আমাদের সাথে কোনো দোভাষী থাকুক। আর, আপনি যেহেতু স্প্যানিশ বা ইংরেজি বলতে রাজি নন, অগত্যা আমাকেই পাঠানো হলো। কর্মকর্তা পর্যায়ে আমিই একমাত্র অফিসার যে প্রাচীন আযটেক ভাষা নাহুয়াটল জানে।
বলতে বেশ ভালোই পারেন।
এসকামপো শহর থেকে আমেরিকায় চলে গিয়েছিলেন আমাদের পরিবার। খুব যখন ছোট আমি, তখন শিখেছি।
এসকামপো আমি চিনি। ছোট্ট একটা গ্রাম, দপূর্ণ ওখানকার লোকেরা। কিন্তু আয়ু কম।
আপনি দাবি করেন, মেক্সিকো থেকে দারিদ্য চিরতরে হটিয়ে দেবেন। আমাদের প্রেসিডেন্ট আপনার প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানতে অত্যন্ত আগ্রহী।
সে কি সেজন্যই আপনাকে পাঠিয়েছে?
মাথা ঝাঁকালেন রিভাস। তিনি যোগাযোগের একটা মাধ্যম খুলতে চান?
গম্ভীর একটুকরো হাসি ফুটে উঠল টপিটজিনের মুখে।
অর্থনৈতিক অবস্থা যেহেতু ভেঙে পড়েছে, কাজেই তিনি জানেন আমার আন্দোলনের তোড়ে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়ে যাবে। আমার ক্ষমতায় আসার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে, তাই আগেভাগে সুসম্পর্কে তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ওদিকে সরকারের সাথেও হাত মেলানো হচ্ছে। মেক্সিকোয় আপনাদের স্বার্থ আছে, সেটা থেকে বঞ্চিত হতে চান না, এই তো?
প্রেসিডেন্টের মনের কথা পড়া আমার সাধ্যের অতীত।
সে খুব তাড়াতাড়িই জানতে পারবে যে মেক্সিকোর নির্যাতিত মানুষ শাসকশ্রেণী আর ধনীদের অনুগ্রহ নিয়ে বেঁচে থাকতে রাজি নয় আর। দুর্নীতি আর রাজিৈনতক ধোঁকাবাজি ধৈর্যের শেষ সীমায় এনে ফেলেছে তাদেরকে। বস্তি এলাকার মানুষের দুর্দশা চোখে দেখা যায় না। গ্রামে সাধারণ মানুষের কোনো কাজ নেই। কিন্তু না, আর তারা সহ্য করবে না। তাদের চুপচাপ বসে থাকার দিন শেষ হয়েছে।
আপনি চান, আযটেক ধুলো থেকে আদর্শ একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করবেন?
আমি বলি, আপনাদের উচিত পূর্বপুরুষদের হাতে দেশ ফিরিয়ে দেয়া।
পুরো আমেরিকায় আযটেকরা ছিল সবচেয়ে বড় কসাই। এ রকম বর্বর একটা সভ্যতার ওপর ভিত্তি করে আপনি আধুনিক দেশ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন… থেমে পড়েন রিভাস। বেশ কষ্টকল্পনা নয় কি?
টপিটজিনের গোলাকার মুখাবয়বে ছায়া ঘনায়। আপনার তো জানা আছে, শয়তান স্পেনীয়রা আযটেকদের উৎখাত করেছিল। ওরা আমাদের পূর্ব পুরুষদের জবাই করেছে।
এ রকম স্পেনীয়রা ও মুরের কথা বলবে।
আপনার প্রেসিডেন্ট কী চায় আমার কাছে?
তিনি শুধু মেক্সিকোর শান্তি আর উন্নতি চান, জবাব দিলেন রিভাস। এবং একটা প্রতিশ্রুতি-আপনি কমিউনিজমের দিকে এগোবেন না।
আমি মার্ক্সিস্ট নই। কমিউনিজমকে সে যতটুকু ঘৃণা করে, আমি তার চেয়ে কম করি না। আমার অনুসারীদের মধ্যে সশস্ত্র গেরিলা একজনও নেই।
শুনে তিনি খুশি হবেন।
আমাদের নতুন আযটেক জাতি গৌরব ও মহত্ত্ব অর্জন করবে কালো টাকার মালিক, দুর্নীতিপরায়ণ অফিসার, বর্তমান মন্ত্রিসভার সদস্য আর সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তাদের বলি দেয়ার পর।
রিভাসের মনে হলো তিনি শুনতে বা বুঝতে ভুল করেছেন। আপনি কি হাজার হাজার মানুষকে খুন করার কথা বলছেন?
খুন? কর্কশ শব্দে হেসে উঠল টপিটজিন। আরে না, মি, গাই রিভাস, না! আমি আমাদের দেবতাদের উদ্দেশ্য বলি দেয়ার কথা বলছি। কোয়েকজালকোটল, হুইটজিলোপোকটলি, টেক্যাটলিপোকা-আপনি তো জানেনই, এ রকম আরও অনেক দেবতা আছে আমাদের। অনেক যুগ পেরিয়ে গেছে, দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি উৎসর্গ করা হয় না। আমার দ্বারা সেই শুভ কাজটা এবার সম্পন্ন হবে, কথা দিচ্ছি।
না! এই একটা শব্দ ছড়া গাই রিভাস আর কিছু বলতে পারলেন না।
আমাদের আটেক রাষ্ট্রের নাম হবে টেনোচটিকলান। আইনের অনুশাসন হবে। ধর্মভিত্তিক। নাহুয়াটল হবে রাষ্ট্রীয় ভাষা। কঠোর ব্যবস্থায় কমিয়ে আনা হবে জনসংখ্যা। বিদেশি পুঁজি বা শিল্প হবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। সীমান্তের ভেতর বাস করতে পারবে শুধু নেটিভরা। বাকি সবাইকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে।
স্তম্ভিত বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে থাকলেন গাই রিভাস। তারা চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।
বিরতি না নিয়ে বলেই চলেছে টপিটজিন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো পণ্য কেন হবে না। আপনাদের কাছে এক ফোঁটা তেলও আমরা বিক্রি করব না। বিশ্বব্যাংকে আমাদের সমুদয় দেনা পরিশোধযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করা হবে। ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো আর আরিজানায় আমাদের যেসব জায়গা আপনারা দখল করে রেখেছেন, সেগুলো ফেরত চাওয়া হবে। ফেরত পাবার স্বার্থে লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে সীমান্ত পেরোবার জন্য লং মার্চ করব আমরা।
যদি ঠাট্টা না হয়, বিভাস বললেন, তাহলে বলব নেহাতই পাগলামি। এ ধরনের উদ্ভট দাবির কথা শুনতে চাইবেন না আমাদের প্রেসিডেন্ট।
ধীরে ধীরে পাঁচিল থেকে নেমে দাঁড়াল টপিটুজিন, নত হয়ে আছে অলকৃত মাথা, চোখ নিস্পলক, বেসুরো গলায় বিড়বিড় করে বলল, তাহলে তো তাকে একটা মেসেজ পাঠাতে হয়, যাতে বিশ্বাস করে?
সে তার মাথার ওর তুলল হাত দুটো, গোটা বাহু গঢ়ি আকাশের দিকে খাড়া হলো। যেন সঙ্কেত পেয়ে পাথুরে মূর্তিগুলোর গভীর ছায়া থেকে বেরিয়ে এল চারজন মানুষ, মাথায় পট্টি ছাড়া গায়ে কোনো আবরণ নেই। চারদিক থেকে এগিয়ে এসে গাই রিভাসকে ঘিরে ফেলল, ভয় আর অবিশ্বাসে আড়ষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকলেন তিনি। চারজন মিলে ধরল তাকে, নিজেদের মধ্যে ধরাধরি করে নামিয়ে আনল পাথরে বেদিতে, যেখানে মানুষের খুলি আর হাড় খোদাই করা রয়েছে পাঁচিলের গায়ে। বেদির ওপর শোয়ানো হলো তাকে। হাত আর পা ধরে থাকল চারজন।
