আমাদের হামলা শুরু হয়ে গেছে, জনাব। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড বেঁচে আছে ওরা।
আমি যদি মারাত্যাই … আখমত ইয়াজিদকে তুমি খুন কোরো।
আপনি মারা যাবে না।
কথা বলার আগে আবার কিছুক্ষণ কাশল সুলেমান আজিজ। যাই ঘটুক না কেন, শত্রুরা হেলিকপ্টারটা নষ্ট করবে। কিন্তু দ্বীপ থেকে পালাতেই হবে তোমাকে। চেষ্টা কোরো, পথ একটা পেয়ে যাবে। যাও, আমাকে রেখে চলে যাও। তোমার প্রতি এটা আমার নির্দেশ, ইবনে। আমার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার জন্য তোমার বেঁচে থাকা একান্ত দরকার।
নিঃশব্দে, নির্দেশের উত্তরে কিছুই না বলে, সুলেমান আজিজতে দুহাতের ওপর তুলে নিয়ে সিধে হলো ইবনে। ধীরে ধীরে রণক্ষেত্র থেকে সরে যাচ্ছে সে।
নিরাপদ দূরত্বে সরে এসে শান্ত সুরে বলল ইবনে, মনটা শক্ত করুন, জনাব। আমাকে কড়া ধমক দিন। দু’জন আমরা একসাথে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছুব।
লাফ দিয়ে দরজা দিয়ে মাত্র ভেতরে ঢুকল পিট, ক্ষিপ্র হাতে কোর্টের পেছন থেকে বুলেটপ্রুফ ভেস্ট জোড়া খুলল, একটা ধরিয়ে দিল হাতে, দ্বিতীয়টা নিজের বুকে আটকাল। অ্যালকে কিছু বলার আর সময় পাওয়া গেল না, শুরু হয়ে গেল ঝাঁক ঝাঁক বুলেটের বর্ষণ। পাতলা কাঠের দেয়াল ফুটো হয়ে যাচ্ছে।
ডাইভ দিয়ে মেঝেতে পড়ল পিট, জনান্তিকে খেদ প্রকাশ করল, এত দামি জ্যাকেটটাও গেছে।
বুকে গুলি করলে এতক্ষণে তুমি ঠাণ্ডা মাংস হয়ে যেতে, পাশ থেকে বলল জিওর্দিনো। বুঝলে কীভাবে, তুমি পেছন ফিরলে গুলি করবে?
ঢুলঢুলু চোখ দেখে। ব্যাটা ফ্যানাটিক, এবং কাপুরুষ।
হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে একটা করে জানালার নিচে থামছে ফিনলে, পিন খুলে বাইরে ছুঁড়ে দিচ্ছে গ্রেনেডগুলো।
ওরা এসে গেছে। চিৎকার করল সে।
কাঠের মেঝের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেল জিওর্দিনো, ওর ভর্তি একটা চাকা লাগানো ঐলির পেছন থেকে এক পশলা গুলি চালালো। একেবারে শেষ মুহূর্তে থম্পসনের মাজল ঘুরিয়ে দু’জন আতঙ্কবাদীকে থামালো পিট, ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে কীভাবে যেন বিধ্বস্ত সাইড অফিসে উঠে এসেছে তারা। পাক খেতে খেতে পড়ে গেল। দু’জনেই।
ক্রাশিং মিলটাকে চারদিকে থেকে আক্রমণ করল সুলেমান আজিজের লোকেরা। গুলিবর্ষণে কোনো ছেদ পড়ল না, বিশ পঁচিশজন একনাগাড়ে গুলি করছে তারা। সবার হাতে স্মল-ক্যালিবারে এ-কে সেভেনটি ফোর।
ক্রাশিং মিলের মেঝেতে অনবরত গড়াগড়ি খেয়ে পিট আর ফিনলেকে কাভার দিল জিওর্দিনো, একসময় তিনজনই ওরা অস্থায়ী আশ্রয় মিকি মাউজ দুর্গে পৌঁছে গেল। তুমুল আক্রমণের মুখেও মাথার ওপর হাত তুলে ক্রাশিং মিল থেকে কেউ বেরিয়ে এল না দেখে মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে পড়ল সন্ত্রাসবাদীরা।
আক্রমণের প্রথম ঢেউটাকে ঠেকিয়েছে ওরা, তবে সন্ত্রাসবাদীরা অসম্ভব একরোখা, অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতেও তাদের জুড়ি নেই। দ্বিতীয় আক্রমণ শুরু করল তারা এবার। একটানা গুলিবর্ষণের সাথে যোগ হলো গ্রেনেডের বিস্ফোরণ। ছোট দুটো দল গুলি করতে করতে ভেতরে ঢুকল, পিটের থম্পসন আর ফিনলের শটগান তাদেরকে ফেলে দিতেই লাশগুলোকে কাভার হিসেবে ব্যবহার করল পেছনের দুটো ছোট দল। ভীতিকর, বীভৎস একটা দৃশ্যের অবতারণা হলো। ক্রাশিং মিলের ভেতরে দশ-বারোটা আগ্নেয়াস্ত্র গর্জন করছে, একের পর এক গ্রেনেড ফাটছে, একাধিক ভাষায় চিৎকার করছে লোকজন। থরথর করে কাঁপছে গোটা ক্রাশিং মিল। শ্ৰাপনেল আর বুলেট বিশাল মেকানিকালে মিলের গায়ে লেগে পিছলে যাচ্ছে দিগ্বিদিক। বাতাসে ধোয়া আর গানপাউডারের গন্ধ।
আট-দশ জায়গায় আগুন ধরে গেল, কিন্তু সেদিকে খেয়াল দেয়ার সময় নেই কারও। একটা গ্রেনেডে ছুঁড়ে হেলিকপ্টারের টেইল রোটর উড়িয়ে দিল জিওর্দিনো। পালানোর শেষ সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেছে দেখে দ্বিগুণ আক্রোশে আক্রমণের মাত্রা বাড়িয়ে দিল সন্ত্রাসবাদীরা।
হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল পিটের হাতে পুরনো থম্পসনটা। পঞ্চাশ রাউন্ডের রোটারি ড্রাম ইজেক্ট করে আরেকটা ঢোকাল ও, এটাই শেষ। তিনজনের কেউই ওরা মৃত্যুকে ভয় পায় না, জানে পিছিয়ে যাবার সুযোগ অনেক আগেই হাতছাড়া হয়ে গেছে। কারও মধ্যে বিন্দুমাত্র ভাবাবেগ বা দ্বিধা দেখা গেল না, গভীর নিঠার সাথে লড়ে যাচেচ্ছ। বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে।
তিনবার পিছিয়ে গেল সন্ত্রাসবাদীরা, প্রতিবার ভেতর আনার চেষ্টা করল তারা। জানে, এটাই তাদের শেষ আক্রমণ হতে যাচ্ছে। সবাইকে বলে দেয়া হলো, এটা হবে সুইসাইড মিশন। ক্রাশিং মিলের চারদিকে বৃত্তটাকে এবার তারা ধীরে ধীরে ছোট করে আনল।
ধোঁয়া লেগে পিটের দুচোখ থেকে পানি গড়াচ্ছে। ওর আস্তিন ফুটো হয়েছে চার জায়গায়, দুচায়গায় মাংস পুড়ে গেছে, চামড়া ছড়েছে এক জায়গায়। দম ফেলার অবসর নেই ওদের কারও, কারণ বৃত্ত ছোট করে এসে আবার ক্রাশিং মিলের ভেতর ঢুকে পড়েছে সন্ত্রাসবাদীরা, এবার তারা খানিকটা এগিয়ে পেরিয়ে এসেছে জিওর্দিনো আর ফিনলের তৈরি ব্যারিকেডটা। গুলিবর্ষণ প্রতিযোগিতা দ্রুত রূপান্তরিত হলো ধস্তাধস্তিতে।
একপশলা গুলির একটা পেটে নিয়ে মেঝেতে নিচু হলো ফিনলে, হাঁটু গেড়ে খাড়া থাকার চেষ্টা করল সে, হাতের খালি শটগানটা মন্থরগতিতে ঘোরাচ্ছে।
জিওর্দিনো আহত হয়েছে পাঁচ জায়গায়। ট্রলি থেকে একটা ওর পাথর তুলে নিল সে ডান হাতে, বাঁ হাতটা শরীরের পাশে মরা সাপের মতো ঝুলছে, কাঁধের ক্ষতটা থেকে নেমে আসছে রক্তের একটা ধারা।
