শেষ পর্যন্ত হয়তো জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে হেলিকপ্টার ফেরত চাইতে হবে।
ইবনের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাঁকালো সুলেমান আজিজ। হয়তো। শোনো-কমান্ডোদের সাথে আলোচনা শুরু করব আমি, তুমি হামলার প্রস্তুতি নাও।
সাবধানে, হযরত।
মুখোশ খুলে ফেলতে দেখলেই তুমি হামলা শুরু করবে।
সশস্ত্র লোকদের একপাশে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে নির্দেশ দিতে শুরু করল ইবনে।
একটা জানালার পর্দা টেনে ছিঁড়ে ফেলল সুলেমান আজিজ। এককালে কাপড়টা হলুদ ছিল, রং উঠে সাদা হয়ে গেছে। একটা লাঠির মাথায় কাপড়টা বাঁধল সে। শান্তির পতাকা হাতে বেরিয়ে এল দোচালা থেকে।
মাইনারদের সার সার বাঙ্কহাউসকে পাশ কাটিয়ে এল সে, সতর্ক থাকল ক্রাশিং মিল থেকে তাকে যেন কেউ দেখতে না পায়। তারপর সামনে পড়ল রাস্তা। একটা বিল্ডিংয়ের কোণ থেকে শান্তির পতাকাটা সামনে বাড়িয়ে নাড়ল সুলেমান আজিজ।
কোনো গুলি হলো না, তবে আর কিছুও ঘটল না। ইংরেজিতে চিৎকার করল সুলেমান আজিজ, আমরা কথা বলতে চাই।
কয়েক মুহূর্ত পর একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, নো হাবলো ইংলেস।
মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে এল সুলেমান আজিজ। চিলিয়ান সিকিউরিটি পুলিশ? তার ধারণা ছিল, চিলিয়ান পুলিশ তেমন দক্ষ নয়। ইংরেজি ভালো বলতে পারে সে, কাজ চালাবার মতো ফ্রেঞ্চও জানে কিন্তু স্প্যানিশে দখল নেই।
দ্বিধায় ভুগলে বিপদ শুধু বাড়বে। যেভাবে হোক শত্রুপক্ষের পরিচয় ও শক্তি সম্পর্কে জানতে হবে তাকে। গা বাঁচিয়ে পালানোর পথে ওরাই একমাত্র বাধা। আবার পতাকাটা সামনে বাড়িয়ে ধরল সুলেমান আজিজ। কোণ থেকে বেরিয়ে এল এক লোক, থামল তার কাছ থেকে কয়েক পা রাখলো।
পাজ অর্থ শান্তি, জানে সুলেমান আজিজ। শব্দটা কয়েকবার গলা চড়িয়ে উচ্চারণ করল সে। অবশেষে সদর দরজা খুলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে রাস্তায় রেবিয়ে এল এক লোক, থামল তার কাছ থেকে পা দূরে।
লোকটা লম্বা, গভীর সবুজ চোখ, কোনো দ্বিধা নেই হাবে ভাবে। সোজা সুলেমান আজিজের দিকে চেয়ে আছে। লম্বা চুলগুলো, কালো, ঢেউখেলানো; সূর্যের তাপে পোড়া তামাটে চামড়া। ঘন ভ্রু, ঠোঁটে বিদ্রুপাত্মক হাসি।
গালে সরু একটা কাটা দাগ। এক হাত খালি, দস্তানা পড়া অপর হাত স্কি জ্যাকেটের পেছনে ঝুলছে।
মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে যা বোঝার বুঝে নিল সুলেমান আজিজ, বিপজ্জনক এক লোকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। সতর্ক হবার প্রয়োজন বোধ করল। মনে মনে স্প্যানিশ শব্দ খুঁজল সে। আমরা কথা বলতে পারি? হ্যাঁ, এভাবে শুরু করা যায়। বলল, পোডেমস হাবলার?
উত্তরে প্রতিপক্ষের ঠোঁটের ক্ষীণ হাসিটুকু সামান্য উজ্জ্বল হলো।
ভাঙাচোরা স্প্যানিশ ভাষায় এরপর সুলেমান আজিজ জিজ্ঞেস করল, আমরা হেলিকপ্টারটা ফেরত পেতে পারি কি?
হঠাৎ হেসে উঠল পিট। তোমার স্প্যানিশ আমার চেয়ে খারাপ। ইংরেজিতে বলল ও। উত্তর হলোনা, হেলিকপ্টারটা ফেরত দেয়ার জন্য দখল করা হয়নি।
প্রতিপক্ষ ইংরেজি জানে, তবে বিস্ময়টা তাড়াতাড়ি কাটিয়ে উঠল সুলেমান আজিজ। সাথে সাথে প্রস্তাব দিল সে, আমি আপনাদেরকে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ দিচ্ছি।
প্রস্তাবটা গিলে ফেল।
এরই মধ্যে হিসাব কষতে শুরু করেছে সুলেমান আজিজ। যোদ্ধার পোশাক নয়, প্রতিপক্ষের পরনে দামি স্কি জ্যাকেট। সিআইএ নাকি?
আপনার নাম জানতে পারি?
ডার্ক পিট।
আমি সুলেমান আজিজ ওমর।
তুমি কে বা কী, আমার তাতে কিছুই আসে যায় না, ঠাণ্ডা সুরে বলল পিট।
বেশ, মি. পিট, রাগল না সুলেমান আজিজ। হঠাৎ তার একটা ভ্রু উঁচু হলো। আপনার সাথে সিনেটরের কোনো সম্পর্ক নেই তো?
রাজনৈতিক মহল আমার মিত্র নয়।
কিন্তু নামে মিল আছে। চেহারাও। সে কি আপনার বাবা?
যদি কিছু বলার থাকে, তাড়াতাড়ি করো। বৃষ্টিতে ভিজতে চাই না।
আমার জিনিসটা আমি ফেরত পেতে চাই, মৃদু হাসির সাথে বলল সুলেমান আজিজ। অক্ষত অবস্থায়।
কোনো জিনিস কেউ খুঁজে পেলে বা দখল করতে পারলে সেটা তার হয়ে যায়। তোমার যদি খুব দরকার থাকে, ভেতরে ঢুকে নিয়ে এসো।
হাত দুটো ঘন ঘন মুঠো করল আর খুলল সুলেমান আজিজ। শক্ত লোকের পাল্লায় পড়েছে সে। তীক্ষ্ণ, চাপা গলায় বলল, আমাদের কিছু লোক মারা যাবে, আপনি মারা পড়বেন এবং অবশ্যই আপনার আত্মীয় বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মারা পড়বেন, হেরিকপ্টারটা যদি আমার হাতে তুলে না দেন।
চোখের পাতা একচুল কাপল না, পিট বলল, দু’জন প্রেসিডেন্ট আর হে’লা কামিলের কথা বলছ না। নিজের কথাটাও ভুলে যাওয়া উচিত হয়নি তোমার। ঘাসের সার হিসেবে তুমিও অবদান রাখবে।
লাল হয়ে উঠল সুলেমান আজিজের চেহারা। আপনার গোয়ার্তুমি অসহ্য! রক্তপাত ঘটিয়ে কী লাভ আপনার?
যুদ্ধ চাইলে, ঘোষণা করো তুমি, তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলল পিট। দেখতে পাবে যুদ্ধ কাকে বলে, প্রতিপক্ষ কেমন লড়তে জানে। কিন্তু সে সাহস কি তোমার আছে? মহিলা, অসহায় বৃদ্ধদের যারা জিম্মি রাখে তারা যদি কাপুরুষ না হয়, আর কাকে কাপুরুষ বলা যায়? তবে, সন্ত্রাসের ইতি ঘটেছে ঠিক তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, সেখানে। আমি আমার নিজের আইনে চলি, এক পা সামনে এগিয়ে দেখো, ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। আমাদের একজন মারা গেলে কথা দিচ্ছি, তোমাদের পাঁচজনের লাশ পড়বে।
আপনার সাথে আমি নীতিকথা মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনা করতে আসিনি, রাগ সামলে নিয়ে বলল সুলেমান আজিজ। আমার জানা দরকার, হেলিকপ্টারটা অক্ষত আছে কি না।
