তাড়াতাড়ি, মেজর, তাড়াতাড়ি! তাগাদা দিল সে। লোকজনকে শুধু পার করলেই হবে না, আরও কাজ আছে আমাদের। বুঝতে পারছ তো, ওদিকে এখনও বেঁচে আছে কারা যেন, আমাদের যুদ্ধটা লড়তে হচ্ছে তাদের।
খনিটা বোধ হয় সন্ত্রাসবাদীদের এস্কেপ পয়েন্ট ছিল, বললেন ক্যাপটেন কলিন্স। তিনিও কর্নেলের পাশে পায়চারি করছেন।
কৃতিত্বটা আমার। ডার্ক পিট আর তার দল সন্ত্রাসবাদীদের একেবারে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়েছে, গম্ভীর সুরে বলল কর্নেল।
সময়মতো পৌঁছে জিম্মি আর ওদেরকে বাঁচাতে পারবেন কি না, সেটাই হলো প্রশ্ন।
হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল কর্নেল হোলিস। আমি তো কোনো আশা দেখছি না।
.
হঠাৎ ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হওয়ায় কৃতজ্ঞবোধ করল রুডি। ক্রাশিং মিল থেকে বেরিয়ে খালি কয়েকটা ওর-কারের পাশ দিয়ে ক্রল করে এগোচ্ছে সে, ডোরাকাটা কাপড়ের মতো ওকে আড়াল করে রেখেছে বৃষ্টি। খনির নিচের পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নামার সময় আর কোনো আড়াল থাকল না। নিচে নেমে এসে ছুটল সে।
রেললাইনে পৌঁছে গেল রুডি। কোনো শব্দ না করে হাঁটতে লাগল সে। খানিক পর বৃষ্টির ফাঁকে অস্পষ্ট কয়েকটা মূর্তি দেখতে পেরে দাঁড়িয়ে পড়ল। চারজন আছে, দাঁড়িয়ে আছে দু’জন।
দ্বিধায় পড়ে গেল রুডি। তার ধারণা, জিম্মিরা বসে আছেন, তাদের ওপর চোখ রেখে দাঁড়িয়ে আছে গার্ডরা। কিন্ত ধারণাটা ঠিক কি না গুলি করার পর পরীক্ষা করা যায় না। কে বন্ধু আর কে শত্রু জানতে হলে ওদের কাছাকাছি যেতে হবে তাকে। ধোঁকা দেয়ার জন্য ভরসা করতে হবে পিটের দেয়া টেরারিস্টদের কাপড়চোপড়ের ওপর। বিষম একটা অসুবিধা হলো, খুব বেশি হলে তিন কি চারটে আরবি শব্দ জানে সে।
বড় করে শ্বাস টেনে এগোল রুডি। একবার সালাম করল, আস্তে বলা হয়ে গেছে ভেবে গলা একটু চড়িয়ে আরও দুবার উচ্চারণ করল শব্দটা।
ওকে পৌঁছুতে দেখে দাঁড়িয়ে থাকা লোক দু’জন বিশেষ গ্রাহ্য করল না। তাদের হাতে মেশিনগান রয়েছে, সেগুলো ওর দিকে ধরা, তবে ঠিক তাক করা ভঙ্গিতে নয়।
উত্তরে দু’জনের একজন কী যেন বলল, অর্থটা ধরতে পারল না রুডি। আন্দাজ করল, ওর নাম জিজ্ঞেস করা হয়েছে।
মুহাম্মদ, বিড়বিড় করে বলল সে, ভাবছে মহানবীর নাম নিয়ে যদি এই যাত্রা পার পাওয়া যায়। হেকলার অ্যান্ড কোচটা বুকের সাথে চেপে ধরে আছে, মাজলটা আরেক দিকে ঘোরানো।
গার্ড দু’জনকে হাতের অস্ত্র আরেক দিকে ঘুরিয়ে নিতে দেখে স্বস্তি বোধ করল রুডি, একযোগে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকাল তারা।
শান্তভাবে, অলসভঙ্গিতে, ওদের পাশে চলে এল রুডি, এখন গুলি করলে জিম্মিদের গায়ে লাগার ভয় নেই।
রেললাইনের ওপর বসে আছেন জিম্মিরা, তাদের ওপর চোখ রেখে, সন্ত্রাসবাদীদের দিকে সরাসরি না তাকিয়ে, হেকলার অ্যান্ড কোচের ট্রিগার টানল সে।
.
খনির কাছাকাছি পৌঁছাবার আগেই ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেল সুলেমান আজিজ আর তার লোকজন। তুমুল বর্ষণ অত্যাচার হয়ে দেখা দিল ভিজে ভারী হয়ে উঠেছে পরনের কাপড়চোপড়। পুরনে একটা দোচালা দেখতে পেয়ে হুড়হুড় করে ভেতরে ঢুকল সবাই। একসময় এখানে মাইনিং ইকুইপমেন্ট রাখা হতো।
কাঠের একটা বেঞ্চে ধপ করে বসল সুলেমান আজিজ, বুকের ওপর ঝুলে পড়ল মুখ, হাপরের মতো হাঁপাচ্ছে। এক লোককে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকল ইবনে, পায়ের আওয়াজ পেয়ে চোখ তুলল সুলেমান আজিজ। ও ওসমান, বলল ইবনে। বলছে, সশস্ত্র একটা কমান্ডো গ্রুপ ওদের নেতাকে খুন করেছে, তারপর আশ্রয় নিয়েছে ক্রাশিং মিলের ভেতর। ওখানে আমাদের হেলিকপ্টারটা আছে, জনাব।
বেঞ্চ ছেড়ে দাঁড়াল সুলেমান আজিজ, রাগে থরথর করে কাঁপছে। এইজন্য পাঠানো হয়েছিল তোমাদের?
আতঙ্কে নীল হয়ে গেল ওসমান। আমরা… আমরা কোনো ওয়ানিং পাইনি জনাব। পাহাড় বেয়ে কখন নেমে এসেছে ওরা কিছুই আমরা জানতে পারিনি। সেন্ট্রিদের কাবু করে, ট্রেনটা দখল করে, তারপর আমাদের লিভিং কোয়ার্টার লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। আমরা যখন পাল্টা হামলা শুরু করি, ক্রাশিং মিল থেকে জুবাব দেয়া ওরা।
হতাহত? হিসহিস করে জানতে চাইল সুলেমান আজিজ।
বেঁচে আছি আমরা মাত্র সাতজন।
দাঁতে দাঁত চাপল সুলেমান আজিজ। যা ধারণা করেছিল, পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক খারাপ। ওরা?
বিশজন তো হবেই, ত্রিশজনও হতে পারে।
তোমরা সাতজন ওদের ত্রিশজনকে কোণঠাসা করে রেখেছ? খেঁকিয়ে উঠল সুলেমান আজিজ। ঠিক করে বলো। কজন ওরা? মিথ্যে বললে ইবনে তোমাকে জবাই করবে।
ভয়ে সুলেমান আজিজের চোখে তাকাতেই পারল না। চার-পাঁচজন হতে পারে, কমও হতে পারে … জনাব–
চারজন লোক এত কিছু করেছে? বিস্মিত হলো সুলেমান আজিজ। রাগ সামলানোর চেষ্টা করল সে। হেলিকপ্টারের খবর বলো। ওটার কোনো ক্ষতি হয়েছে?
একটু যেন উজ্জ্বল হলো ওসমানের চেহারা। না, জনাব, কোনো ক্ষতি হয়নি। খুব সাবধানে গুলি করেছি আমরা। আমার বাপজানের সম্মানের কসম, একটা গুলিও হেলিকপ্টারে লাগেনি….
কমান্ডোরা ওটার কোনো ক্ষতি করেছে কিনা আল্লাহ মালুম, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল ইবনে।
ওটাকে অক্ষত অবস্থায় না পেলে খুব শিগগিরই সবাই আমরা আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাব, শান্তভাবে বলল সুলেমান আজিজ। কমান্ডোদের কাবু করার একমাত্র উপায়, চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে সোজা ভেতরে ঢুকে পড়া-স্রেফ সংখ্যার জোরে হারাতে হবে ওদেরকে।
