ধীরে ধীরে গতি বাড়ল লেডি ফ্ল্যামবোরোর। খাড়ির মাঝখানে চলে এল জাহাজটা। ডেকে দাঁড়িয়ে দুই জাহাজের লোকজন মহা আনন্দে নাচানাচি শুরু করে দিল। এই সময় দুনিয়া কাঁপানো আওয়াজের সাথে কাত হতে শুরু করল গ্লেসিয়ারের সামনের পাঁচিল। পাহাড়ের গায়ে লেগে ফিরে এল আওয়াজগুলো, শক ওয়েভে থরথর করে কেঁপে উঠল জাহাজ দুটো। ভাঙা পাঁচিলের এক একটা টুকরোর ওজন হবে কয়েকশো, একটা একটা করে খাঁড়ির পানিতে লাফ দিল, ছলকে ওঠা পানি স্তম্ভের আকৃতি নিয়ে সিধে হলো আকাশের দিকে। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকল দর্শকরা, বিশ্বাস করতে পারছে না সত্যি তারা বেঁচে গেছে।
.
৫৮.
প্রথমটায় চিৎকার, ছোটোছুটি আর এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে যেন নরক, নেমে এল। ডাইনিং হল লক্ষ্য করে যারা গুলি ছুঁড়েছে তাদের পরিচয় বা সংখ্যা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই মিসরীয় আতঙ্কবাদীদের। ট্রেন থেকে গুলি করা হলেও, এই মুহূর্তে শত্রুরা কোথায় সে সম্পর্কেও তারা কিছু জানে না। আলো নিভিয়ে দিল তারা, ভোরের গাঢ় ছায়া লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ল। খানিক পর উপলব্ধি করল পাল্টা গুলি হচ্ছে না। তার পরও বেশ কিছুক্ষণ ডাইনিং হল ছেড়ে বেরোল না কেউ।
বেরোল তারা দুটো দরজা দিয়ে; সামনে থেকে দু’জন, পেছন থেকে চারজন। কেউ ডাইভ দিল, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল, আগে থেকে ঠিক করা পজিশনে এসে গা ঢাকা দিল সবাই। আড়াল পাবার পর একটা সঙ্কেতের অপেক্ষায় থাকল তারা, তারপর চারদিকে গুলি ছুঁড়ে একটা বৃত্ত রচনা করল, বাকি সঙ্গীরা যাতে নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে। কালো পাগড়ি পরা এক লোক, ওদের নেতা, হুইসেল বাজিয়ে দিক নির্দেশনা দিল লোকটাকে।
পিটের ভয়টা মিথ্যে নয়, মিসরীয় সন্ত্রাসবাদীরা প্রফেশনাল এবং উন্নতমানের ট্রেনিং পাওয়া যোদ্ধা। বাড়ি বাড়ি ঢুকে লড়াই করতে ওদের জুড়ি নেই, স্ট্রিট ফাইটিংয়েও তারা অভিজ্ঞ ও দক্ষ। মাথায় কালো পাগড়ি জড়ানো নেতাও অত্যন্ত যোগ্য লোক, একাধিক গেরিলাযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে তার।
ধীরে ধীরে এগোল তারা, সার্চ করল প্রতিটি ভবন, অর্ধচন্দ্রের আকৃতিতে ঘিরে ফেলল ক্রাশিং মিলটাকে। অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি নিচ্ছে না কেউ, প্রতি মুহূর্তে আড়ালে থাকছে, ছোট করে আনছে জাল।
আরবি ভাষায় কি যেন বলল নেতা। কোনো সাড়া মিলল না। আরেক পজিশন থেকে অন্য এক আতঙ্কবাদী ডাক দিল। ঠিকই আন্দাজ করতে পারল পিট, ক্রাশিং মিলের ভেতর নিজেদের লোককে ডাকছে ওরা।
একেবারে কাছে চলে এসেছে লোকগুলো, জানালার সামনে কারো থাকা চলে না। টেরোরিস্টদের স্কি মাস্ক আর পোশাক খুলে ফেলল পিট, নিজের স্কি জ্যাজেটের পকেট হাতড়ে ছোটো একটা আয়না বের করল, টেনে লম্বা করা যায় এমন একটা হাতল লাগানো রয়েছে আয়নাটায়। জানালার কার্নিসের ওপর রাখল সেটা, টেনে লম্বা করল হাতল, পেরিস্কোপের মতো ঘোরালো জিনিসিটাকে।
সুবিধামতো একটা টার্গেট দেখতে পেয়ে খুশি হয়ে উঠল পিট, শতকরা নব্বই ভাগ গা ঢাকা দিয়ে আছে, তবে যতটুকু বেরিয়ে আছে কিলিং শট-এর জন্য তা-ও যথেষ্ট।
ফায়ার সিলেক্ট লিভার ফুল অটো, থেকে সিঙ্গল-এ ঘোরাল পিট। তারপর ঝট করে মাথা তুলল, জানালার কার্নিস ছাড়িয়ে গেল চোখ। লক্ষ্যস্থির করল, টেনে দিল ট্রিগার।
গর্জে উঠল পুরনো থম্পসন। দুই কি তিন পা সামনে বাড়াল কালো পাগড়ি, হতভম্ব চেহারা। তারপর হাঁটু ভেঙে গেল মুখ থুবড়ে পড়ে গেল, পাথুরে মাটিতে।
জানালার নিচে মাথা নামাল পিট, অস্ত্রটা টেনে নিল বুকের কাছে, আবার চোখ রাখল আয়নায়। মরচে ধরা মাইনিং ইকুইপেমেন্টের বাতিল অংশ ও ছড়িয়ে থাকা ভবনগুলোর আড়ালে পজিশন নিয়েছে শত্রুরা। নেতা মারা গেলেও, পিট জানে, রণে ভঙ্গ দিয়ে পালানোর লোক ওরা নয়। নিজের দায়িত্ব সম্ভবত এরই মধ্যে বুঝে নিয়েছে। সেকেন্ড ইন কমান্ড।
রাস্তার ওপারে একটা টিন শেড, বন্ধ কাঠের দরজা লক্ষ্য করে একপশলা গুলি করল রুডি। অত্যন্ত ধীরগতিতে খুলে গেল দরজার কবাট, পাক খেতে থাকা একটা রক্তাক্ত শরীরের ধাক্কায় খোলা দরজার বাইরে ধরাশায়ী হলো সে।
তবু পাল্টা কোনো গুলি হলো না। লোকগুলো বোকা নয়, উপলব্ধি করল পিট। মিসরীয় সন্ত্রাসবাদীরা বুঝতে পেরেছে, ক্রাশিং মিলে সংখ্যায় ওরা মাত্র কয়েকজন। সময় নিয়ে নিজেদের এক জায়গায় জড়ো করবে এবার তারা, আলোচনা করবে বিকল্প কী ব্যবস্থা নেয়া যায়। কারণ জানে, ক্রাশিং মিলের ভেতর হেলিকপ্টারও প্রতিপক্ষের দখলে চলে গেছে।
মাথা নিচু করে ছুটে এল পিট, রুডির পাশে থামল। তোমার এদিকে খবর কি?
শান্ত। মাথা ঘামাচ্ছে ওরা। নিজেদের হেলিকপ্টার নষ্ট করতে চায় না।
আমার ধারণা, সামনের দরজায় আসার ভান করবে ওরা, ঢুকবে সাইড অফিস দিয়ে।
মাথা ঝাঁকানো রুডি। সম্ভবত। জানালা ছেড়ে দিয়ে আরও ভালো কাভার পেতে হবে আমাদের। কোথায় আমাকে দেখতে চাও তুমি?
চোখ তুলে উপরের ক্যাটওয়াকের দিকে তাকাল পিট। একসার স্কাইলাইটের দিতে হাত তুলল ও, ছোটো একটা উইষ্ণ টাওয়ারকে ঘিরে আছে। উপরে উঠে নজর রাখো। হামলা করতে যাচ্ছে দেখলে চিৎকার দেবে। সামনের দরজায় এসে গেছে দেখলে ব্রাশ করবে। সাবধান, সময় থাকতে নেমে আসবে। কপ্টারের ওপর দিকে গুলি করতে ভয় পাবে না ওরা।
