হ্যাঁ… ভাব দেখাচ্ছেন আমাকে যেন চেনেন না!
দরজা ভাঙার জন্য দুঃখিত। আমি কর্নেল হোলিস, স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স।
মাই গড! ঘরের কোণ থেকে লাফ দিয়ে এগিয়ে এল মাইকেল ফিনি, ফাস্ট অফিসার। আমরা উদ্ধার পেয়েছি।
মাফ করবেন, কর্নেল, কলিন্স বললেন। আপনারা এসেছেন, ধন্যবাদ।
সব মিলিয়ে কতজন আতঙ্কবাদী? দ্রুত জানতে চাইল কর্নেল।
মেক্সিকানরা জাহাজে আসার পর প্রায় চল্লিশজন।
আমরা মাত্র বিশজনকে পেয়েছি।
ক্যাপটেনের মুখ থেকে সমস্ত রক্ত নেমে গেল। বিশজনের ভাগ্যে কী ঘটেছে আন্দাজ করতে পারলেন তিনি। তাঁর মুখ ঝুলে পড়লেও, দাঁড়িয়ে থাকলেন ঋজু ভঙ্গিতেই। প্রেসিডেন্ট হাসান, প্রেসিডেন্ট লরেঞ্জো, মহাসচিব হে’লা কামিল আর সিনেটর পিটকে উদ্ধার করেছেন তো?
মাথা নাড়ল কর্নেল। দুঃখিত, ওদেরকে এখনো আমরা পাইনি।
বলেন কী! কর্নেলকে পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে ছুটলেন কলিন্স। সবাই ওঁরা মাস্টার স্যুইটে আছেন।
তাকে অনুসরণ করতে গিয়েও থমকে গেল কর্নেল। কেউ নেই ওখানে, বলল সে। এই ডেকের সবগুলো স্যুইট দেখেছি আমরা।
মাই গড! হাইজ্যাকাররা ওদের নিয়ে গেছে!
মাইক্রোফোনে ডিলিঞ্জারের সাথে কথা বলল কর্নেল। মেজর ডিলিঞ্জার।
পাঁচ সেকেন্ড পর সাড়া দিল মেজর। গো অ্যাহেড, কর্নেল।
শত্রুদের দেখা পেলে?
না।
কমপক্ষে বিশজন হাইজাকার আর ভি.আই.পি প্যাসেঞ্জারদের হিসাব মিলছে না।
আমিও কারো কোনো হদিস পাচ্ছি না।
ঠিক আছে, ক্রুদের বলো খাড়ি থেকে জাহাজ বের করে নিয়ে যাক।
সম্ভব নয়, জবাব দিল জের রক।
সমস্যা?
ইঞ্জিনরুমে কিছু আস্ত রাখেনি সন্ত্রাসবাদীরা। জাহাজ আবার চালু করতে এক সপ্তাহ লেগে যাবে।
কোন পাওয়ার নেই?
দুঃখিত, কর্নেল। এমনকি জেনারেটর পর্যন্ত ভেঙে দিয়ে গেছে বাস্টার্ডরা… দুঃখিত।
তাহলে?
গ্লেসিয়ারের নিচে আটকা পড়েছি আমরা, স্যার। প্রকৌশলীরা কোথাও আমাদের নিয়ে যেতে পারবে না।
কঠিন সুরে বলল কর্নেল। লাইফবোটে করে ক্রু আর প্যাসেঞ্জারদের পার করব। ম্যানুয়াল উষ্ণ ব্যবহার করতে অসুবিধা কী?
আবার দুঃখ প্রকাশ করে মেজর বলল, আমরা সত্যিকার বেজন্মাদের পাল্লায় পড়েছি, স্যার। লাইফবোটের তলা ফুটো করে দিয়েছে।
ভরাট, গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে এল গ্লেসিয়ার থেকে। জাহাজ কাঁপল না, তবে শব্দটা শুনে বুকে কেঁপে উঠল সবার। একটানা প্রায় এক মিনিটের মতো শোনা গেল গর্জনটা। তারপর ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে থেমে গেল।
কর্নেল ও মেজর দু’জনেই সাহসী মানুষ, তাদের চোখেও আতঙ্ক ফুটে উঠল।
গ্লেসিয়ার ভেঙে পড়ার সময় হয়েছে, গম্ভীর সুরে বললেন কলিন্স। আমাদের একমাত্র আশা, স্রোতে যদি খাড়ি থেকে বের করে নিয়ে যায় জাহাজাটাকে। নোঙরের চেইন কেটে দিয়ে অপেক্ষা করা যাক।
আগামী আট ঘণ্টার মধ্যে টান দেবে না ভাটা, বলল কর্নেল। আমি জানি।
তাহলে বিকল্প একটা ব্যবস্থা করুন। লেডি ফ্ল্যামবোহোর কত লোক আছে জানেন? এক্ষুনি সবাইকে সরানো দরকার।
চলে যেতে বললে গ্লেসিয়ারটা যাবে? উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে শান্তভাবে ব্যাখ্যা করল কর্নেল, আমাদের বোটে অল্প কিছু লোকের জায়গা হবে। হেলিকপ্টার আনিয়ে বাকিদের সরানো যেতে পারে। তাতেও সময় লাগবে এক ঘণ্টার কম নয়।
তাহলে তাই করুন….
একটা হাত তুলে ক্যাপটেনকে থামিয়ে দিল কর্নেল হোলিস। তার চেহারায় নগ্ন বিস্ময় ফুটে উঠল, ইয়ারফোনে অচেনা একটা গলা পাচ্ছে সে।
কর্নেল হোলিস, আমি কি আপনার ফ্রিকোয়েন্সিতে? ওভার।
জানতে পারি কোত্থেকে কে আপনি কথা বলছেন? ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করল কর্নেল।
নুমার জাহাজ সাউন্ডার থেকে, আমি ক্যাপটেন ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট, অ্যাট ইওর সার্ভিস। কোথাও আপনাকে লিফট দিতে পারি, কর্নেল?
ফ্রাঙ্ক! বিস্ফারিত হলে কর্নেল। কোথায় আপনি, ক্যাপটেন?
সুপারস্ট্রাকচারের প্রাস্টিক সরিয়ে তাকান, পোর্ট সাইডে আধ কিলোমিটার দূরে দেখতে পাবেন আমাকে, আপনার দিকেই ছুটে আসছি।
স্বস্তির বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে ক্যাপটেন কলিঙ্গের দিকে তাকাল কর্নেল। একটা জাহাজ আসছে। আপনার কোনো পরামর্শ আছে?
অবিশ্বাসে তাকিয়ে থাকলেন কলিন্স। এক সেকেন্ড পর তোতলাতে শুরু করলেন তিনি, গ-গুড গড ম্যান ইয়েস, ম্যা-ম্যান। ওদের বলুন আমাদের টেনে নিয়ে যাক।
.
সাউন্ডারের যা ওজন, তার দ্বিগুণ ওজন লেডি ফ্ল্যামবোরোর। লোহার মোটা চেইন দিয়ে বেঁধে দুটো জাহাজকে জোড়া লাগানো হলো। প্রতি মুহূর্তে বিপদটা ঝুলে থাকল মাথার ওপর, যেকোনো মুহূর্তে ধসে পড়তে পারে গ্লেসিয়ারের সামনের পাঁচিল। বিপদকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ক্রু, প্যাসেঞ্জার ও স্পেশাল ফোর্সের লোকজন খোলা ডেকে বেরিয়ে এসেছে, আগেই সরিয়ে ফেলা হয়েছে প্লাস্টিকের আবরণ। সাক্ষাৎ মৃত্যুর দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে সবাই। দুই জাহাজের মাঝখানের চেইনগুলো টান টান হলো। ফুল অ্যাহেড, নির্দেশ দিল ক্যাপটেন ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট, তার একটা চোখ ফ্ল্যামবোরোর ওপর, আরেকটা গ্লেসিয়ারের গায়ে।
টান পড়লেও বরফে আটকে থাকা লেডি ফ্ল্যামবোয়রা প্রথমে নড়ল না। তারপর বোমা ফাটাল মতো আওয়াজের সাথে প্রচণ্ড ঝাঁকি খেল জাহাজটা, গ্লেসিয়ারের ছায়া থেকে বেরোতে শুরু করল। রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে সবাই। আকাশ ছুঁয়ে থাকা বরফের পাঁচিল এখনও কাত হচ্ছে না।
