পুরনো দিনের বুলেটপ্রুফ ভেস্ট হলে সেটাকে ভেদ করে যেত বুলেটটা, একটা পাঁজর ভাঙত বা থামিয়ে দিত হৃৎপিণ্ডটাকে। স্পেশাল ফোর্সের লোকটা পরে আছে আধুনিক একটা আবিষ্কার, ভেস্টটা এমনকি ন্যাটোর একটা ৩০৮ রাউন্ডকেও ঠেকিয়ে দিতে পারে, বুলেটের ধাক্কা সমানভাবে ছড়িয়ে যায় চারদিকে, ফলে চামড়ায় সামান্য দাগ ছাড়া আর কোনো ক্ষতি হয় না।
মৃদু ঝাঁকি খেল জন ডিলিঞ্জার, এক পা পিছিয়ে গিয়ে হেকলার অ্যান্ড কোচের ট্রিগার টেনে দিল, সবই বিরতিহীন সাবলীলতার সাথে।
ভেস্ট একটা পরে আছে ম্যাকাডোও, তবে পুরনো মডেলের। ডিলিঞ্জারের বুলেটগুলো তার বুকের শক্ত আবরণটাকে তুবড়ে দিল, তারপর ভেদ করে গুঁড়িয়ে দিল পাঁজর। ধনুকের মতো বাঁকা হলো তার পিঠ, হোঁচট খেল পেছন দিকে, ক্যাপটেনের চেয়ারের ঘষা খেয়ে পড়ে গেল ডেকে।
মাথার ওপর হাত তুলে চিৎকার করল মেক্সিকান গার্ড, থামুন! গুলি করবেন না। আমি নিরস্ত্র…।
ডিলিঞ্জারের সংক্ষিপ্ত বিস্ফোরণ ছিন্নভিন্ন করে দিল তার গলা, ছিটকে গিয়ে জাহাজের কম্পাস রাখার বাক্সের ওপর পড়ল সে, ঝুলে থাকল তোবড়ানো পুতুলের মতো।
মেজর ডিলিঞ্জারকে পাশ কাটিয়ে এগোল সার্জেন্ট ফস্টার, পরীক্ষা করল লোকটাকে। মারা গেছে, স্যার।
ওকে আমি সাবধান করেছিলাম, নির্লিপ্ত সুরে বলল জন ডিলিঞ্জার, হেকলার অ্যান্ড কোচে নতুন ক্লিপ ভরল।
পা দিয়ে লাশটা উল্টাল ফস্টার, কলারের নিচের খাপ থেকে ডেকে খসে পড়ল লম্বা একটা বেয়নেট। বুঝলেন কীভাবে, মেজর? অবাক হয়ে জানতে চাইল সার্জেন্ট।
বুঝিনি, তবে নিরস্ত্র বলে বিশ্বাসও করিনি….।
হঠাৎ থেকে গিয়ে কান পাতল মেজর। শব্দটা দু’জনেই শুনতে পেল ওরা। পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। আরে, কী ওটা? বিস্ময় প্রকাশ করল মেজর।
আমার জন্মের ত্রিশ বছর আগেকার জিনিস, বলল সার্জেন্ট। তবে আওয়াজটা চিনি।
মানে?
পুরনো একটা স্টিম লোকেমোটিভ।
শব্দ শুনে মনে হচ্ছে খনি থেকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে।
কিন্তু আমি তো জানি খনিটা পরিত্যক্ত।
আমরা জাহাজ দখল না করা পর্যন্ত নুমার লোকজন ওখানে অপেক্ষা করার কথা।
হঠাৎ কী কারণে তারা একটা পুরনো লোকেমোটিভ চালু করতে যাবে?
কী জানি। চিন্তিতভাবে মাথা নাড়ল জন ডিলিঞ্জার। হতে পারে ওরা বোধ হয় আমাদের কিছু বলতে চাইছে।
.
গ্লেসিয়ারে বিস্ফোরণ ঘটার সময় কর্নেল হোলিস আর তার দল লেডি ফ্ল্যামবোরোর ডাইনিং রুমে।
প্লাস্টিক কেটে নিরাপদেই জাহাজে উঠেছিল ডাইভ দল। ভুয়া কার্গো কন্টেইনারের মাঝখান দিয়ে পথ করে নিল ওরা, একটা দরজা দিয়ে লাউঞ্জে টুকে কাউকে দেখতে পেল না। চারদিকে পিলার আর ফার্নিচার, ছড়িয়ে পড়ে আড়াল নিল সবাই। দু’জনকে পাঠানো হলো সিঁড়ির গোড়ায়, দু’জনকে এলিভেটরের সামনে, বাকি সবাই ডাইনিং হলে ঢুকে চমকে দিল মেক্সিকান আতঙ্কবাদীদের।
বিরতিহীন গুলিবর্ষণে সব কটা আতঙ্কবাদী ধরাশায়ী হলো। তারা এমনকি নিজেদের অস্ত্রে হাত ছোঁয়ানোর সুযোগও পায়নি। দল নিয়ে সামনে অগ্রসর হলো কর্নেল হোলিস, লাশগুলোকে টপকে। এই সময় রক্ত পানি করা আওয়াজ হলো, ফাটল ধরছে বরফের পাঁচিলে।
শব্দটা থামার পর কর্নেল বলল, ডিলিঞ্জারের দল বোধ হয় একটা এক্সপ্লোসিভ অকেজো করতে পারেনি।
এখানে কোনো জিম্মি নেই, স্যার, তার একজন লোক জানাল। সবাই আতঙ্কবাদী।
কয়েকটা লাশের মুখ পরীক্ষা করল কর্নেল। একজনকেও মধ্যপ্রাচ্যের লোক বলে মনে হলো না। এরা সবাই তাহলে জেনারেল ব্রাভোর কু। ডিলিঞ্জারের সাথে যোগাযোগ করল সে।
রেডিওতে মেজর জানাল, চারজন আতঙ্কবাদীকে খতম করেছে তারা। ব্রিজ তাদের দখলে চলে এসেছে। সবগুলো এক্সপ্লোসিভ খুঁজে পায়নি বলে দুঃখ প্রকাশ করল সে।
কর্নেল তাকে জানাল, আরোহীদের উদ্ধার করার জন্য মাস্টার স্টেটরুমে যাচ্ছি আমরা। ইঞ্জিন রুম ক্রুদের অনুরোধ করো যে যার কর্তব্যে ফিরে যাক। প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক সেকেন্ডও বরফ-পাঁচিলের নিচে থাকব না আমরা। ষোলোজন আতঙ্কবাদী মারা পড়েছে। সবাই তারা ল্যাটিন। জাহাজে আরও অন্তত বিশজন আরব আছে।
হতে পারে তারা তীরে চলে গেছে, স্যার।
কেন, এ কথা বলছ কেন?
মিনিট দুই আগে একটা লোকোমোটিভ ইঞ্জিনের আওয়াজ শুনেছি, স্যার। রাডার মাস্টে আমার একজন লোককে তুলেছিলাম। রেললাইন থেকে নেমে এসে ট্রেনটা পানিতে পড়ে গেছে, লাইনের ওপর বিশ-পঁচিশজন আতঙ্কবাদীকেও দেখেছে সে।
প্রথম কাজ জিম্মিদের উদ্ধার করা, বলল কর্নেল। জাহাজটাকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পর তীরে কে কী করছে ভাবা যাবে।
স্টেটরুমগুলোর সামনে কোনো প্রহরীকে না দেখে অবাক হলো কর্নেল। তার লোকেরা লাথি মেরে দরজা খুলল, ভেতরে মিসরীয় ও মেক্সিকান প্রেসিডেন্সিয়াল স্টাফের দেখা মিললেও, দু’জন প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারি জেনারেলকে কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না।
এক পশলা গুলি করে ভাঙা হলো হল ওয়ের শেষ দরজাটা। ভেতরে ঢুকল কর্নেল। জাহাজের ইউনিফর্ম পরা পাঁচজন লোককে দেখতে পেল সে, জড়োসড়ো হয়ে বসে রয়েছে এক কোণে। তাদের একজন উঠে দাঁড়াল, এগিয়ে এসে ঘৃণাভরে তাকাল কর্নেলের দিকে। গুলি না করে তালা ঘোরালেও পারতেন। ভ্রু কুঁচকে উঠল তার।
আপনি নিশ্চয় ক্যাপটেন কলিন্স?
