এ ধরনের একটা ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিল না সন্ত্রাসবাদী বা তাদের জিম্মিরা। প্রতি মুহূর্তে কাছে চলে আসছে যান্ত্রিক দানবটা। কী করা উচিত বুঝে উঠতে না পেরে অনড় পাথর হয়ে থাকল সবাই।
আল্লাহ আমাদের রক্ষা করো! আকুল আবেদন জানাল সন্ত্রাসবাদীদের একজন।
নিজের চেষ্টার বচো! ধমক দিল ইবনে। তারই প্রথম সংবিৎ ফিরল, সবাইকে লাইন ছেড়ে সরে যাবার নির্দেশ দিল সে।
শুরু হলো ছুটোছুটি, রেললাইন থেকে কে কার আগে নেমে যেতে পারে তারই প্রতিযোগিতা। ঠিক সেই মুহূর্তে সগর্জনে পৌঁছে গেল ট্রেনটা। নিয়ন্ত্রণহীন ইঞ্জিন পাঁচটা ওর-কার নিয়ে ছুটে গেল ওদের পাশ ঘেঁষে, ওদেরকে ঢেকে দিল বাষ্প আর ধোয়ার ধন মেঘ। খানিক দূর ঘিরে ধরলেও বয়লার বিস্ফোরিত হলো না। হিসস আওয়াজের সাথে বাস্পের বিশাল স্তম্ভ খাড়া হলো, খাঁড়ির পানিতে অদৃশ্য হলো ইঞ্জিন, সেটাকে অনুসরণ করে এক এক করে ডুব দিল ওর কারগুলো।
সুলেমান আজিজ আর ইবনে ছুটে গিয়ে দাঁড়াল জেটির কিনারায়। অসহায় দৃষ্টিতে বুদ্বুদ আর বাস্পের দিতে তাকিয়ে তারা।
ক্যাব থেকে কয়েকজন লোক ঝুলছিল, বলল সুলেমান আজিজ। দেখছে তুমি, ইবনে?
দেখেছি, জনাব।
ওরা আমাদের লোক?
আমাদের।
খানিক আগে গুলির আওয়াজ শুনেছ তুমি? রাগে কেঁপে উঠল সুলেমান আজিজ। খনিতে আমাদের লোকের ওপর হামলা করা হয়েছে।
হেলিকপ্টার! আঁতকে উঠল ইবনে।
এখনও হয়তো সময় আছে, তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে পারলে অক্ষত পাওয়া যাবে ওটা।
নিজের লোকদের উদ্দেশে চিৎকার করে নির্দেশ দিল সে। বন্দিদের এক লাইনে দাঁড় করাতে হবে, লাইনের পেছনে আর সামনে একজন করে গার্ড থাকবে।
কথা শেষ করেই রেললাইন দলে ছুটল সুলেমান আজিজ, সবাই তাকে অনুসরণ করল।
ভয়ে বুক শুকিয়ে গেছে সুলেমান আজিজের। হেলিকপ্টার নষ্ট হলে পালানোর কোনো উপায় থাকবে না। খালি দ্বীপটায় লুকানোরও কোনো জায়গা নেই। আমেরিকান স্পেশাল ফোর্স তাদেরকে একজন একজন করে খুঁজে বের করবে। তারও দরকার হবে, স্রেফ ওদেরকে ফেলে চলে গেলেই না খেতে পেয়ে বা ঠাণ্ডায় মারা পড়বে সবাই।
ভয় পেলেও, বাঁচার আশা ছাড়তে রাজি নয় সুলেমান আজিজ। প্রাণের ওপর মায়া, সেটা কারণ নয়। প্রতিশোধ নিতে হবে তাকে। প্রথমে সে দেখে নেবে যারা তার এত কষ্টের প্ল্যানটা বরবাদ করেছে তাদেরকে। তারপর মূল কাজে হাত দেবে সে। জানে, আখমত ইয়াজিদকে খুন করা সহজ হবে না, তবে নিজের ওপর তার আস্থা আছে। কেউ যদি পারে তো সেই পারবে বেঈমানটাকে খুন করতে।
পাহাড় থেকে গোলাগুলির আওয়াজ ভেসে আছে। ঢাল বেয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। সুলেমান আজিজের। এরই মধ্যে ঘেমে নেয়ে উঠেছে সে।
.
লেডি ফ্ল্যামবোরোর হুইলহাউসে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাপটেন ম্যাকাডো, বিস্কোরণের আওয়াজটা ঠিক শুনল না, বলা চলে অনুভব করল সে। কাঁধ আর ঘাড় আড়ষ্ট হয়ে গেল, সজাগ হলো কান, কিন্তু আর কিছু শুনতে পেল না।
হঠাৎ ছুটে কমিউনিকেশন রুমে চলে এল ম্যাকাডো, দেখল একটা টেলিটাইপের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে তার একজন লোক।
ক্যাপটেন, আমি যেন বিস্ফোরণের শব্দ শুনলাম?
পেটের ভেতরটা শিরশির করে উঠল ম্যাকাডোর। রেডিও অপারেটর বা মিসরীয় নেতাকে দেখেছ?
না, কাউকে দেখিনি।
কাউকে দেখোনি মানে?
এক ঘন্টার ওপর হবে আরবদের একজনেরও ছায়া দেখছি না, রাডার অপারেটর থামল, কী যেন চিন্তা করল, তারপর মুখ তুলল। ডাইনিং সেলুন থেকে বেরিয়ে এখানে এসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওদের কাউকে দেখিনি আমি। বাইরের ডেকগুলোয় টহল দেয়ার কথা ওদের, তাই না, ক্যাপটেন? কাজটা ওরা যেচে পড়ে নিয়েছিল।
রেডিওর সামনে খালি চেয়ারটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ম্যাকাডো বিড়বিড় করে বলল, ওদেরকে বোকা ভেবে আমি বোধহয় ভুলই করেছি।
হেলমের সামনে কাউন্টারের দিকে এগোল ম্যাকাডো। ব্রিজ উইন্ডোর সরাসরি সামনে প্লাস্টিক শিট কয়েক জায়গায় ছোট করে কাটা হয়েছে বাইরেটা দেখার জন্য, জাহাজের সামনের অংশ পরিষ্কার দেখতে পাবার মতো যথেষ্ট আলো ফুটেছে ইতিমধ্যে।
ম্যাকাডো দেখল, বেশ কয়েক জায়গায় চওড়া করে কাটা হয়েছে প্লাস্টিক। দেরিতে হলেও, চোখে পড়ল গ্লেসিয়ারের মাথা থেকে নেমে এসে ফাঁকগুলো দিয়ে ভেতরে ঢুকেছে কয়েকটা রশি। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তার। অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এই মুহূর্তে সবাইকে সাবধান করা দরকার। কমিউনিকেশন সিস্টেমের দিকে ঠট করে ঘুরল, সেই সাথে পাথর হয়ে গেল।
দোরগোড়ায় একজন লোক।
লোকটা যে শুধু কালো পোশাক পরে আছে তাই নয়, হাত আর স্কি মাস্কের বাইরে মুখের সামান্য যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাও কালো রং করা। গলা থেকে ঝুলছে নাইটভিশন গগলস। বুকে পরেছে বুলেট প্রুফ চেস্ট পিস, তাতে অনেকগুলো পকেট আর ক্লিপ, ভেতরে গ্রেনেড ও তিনটে ছুরি ছাড়াও আরও মারাত্মক সব অস্ত্র রয়েছে।
চোখ কুঁচকে গেল ম্যাকাডোর। কে তুমি? কঠিন সুরে প্রশ্ন করল সে, ভালো করেই জানে, তাকিয়ে রয়েছে মৃত্যুর দিকে। কথা বলার সময়ই বিদ্যুৎবেগে নাইন মিলিমিটার অটোমেটিক পিস্তলটায় ছোঁ দিল সে, শোল্ডার হোলস্টার থেকে বের করে গুলিও করল একটা।
ম্যাকাডোর হাত সত্যি ভালো। ওয়েস্টার্ন যুগের নামকরা পিস্তলবাজরা থাকলে তার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিত। গুলিটা সরাসরি আগন্তুকের বুকের ঠিক মাঝখানে গিয়ে ঢুকল।
