লাফ দাও! নির্দেশ দিল পিট।
মাটিতে পা পড়তেই ছুটতে শুরু করল ওরা, হোঁচট খেল, পেছনে গেল, তবে ছিটকে পড়ল না। দু’জনের কারও মধ্যেই কোনো ইতস্তত ভাব নেই, দম ফুরোনোর লক্ষণ নেই, ট্রেনের সাথে পাশাপাশি ছুটছে। সামনে ক্রাশিং মিলের সিঁড়ি, তরতর করে উঠে এল মাথায়, দোরগোড়া টপকে ডাইভ দিয়ে পড়ল মেঝের ওপর।
মুখ তুলতেই প্রথমে পিট, জিওর্দিনোক দেখতে পেল। দরজার পাশ থেকে ওদের দিকে এক পা এগোল জিওর্দিনো, হাতে রয়েছে মেশিন গান।
বার থেকে মাতালদের ঘাড় ধরে বের করে দিতে দেখেছি, বলল জিওর্দিনো। কিন্তু ট্রেন থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে এই প্রথম দেখলাম।
মেঝের ওপর দাঁড়াল পিট। কথা বলে সময় নষ্ট কোরো না। তৈরি হও।
গুলির আওয়াজ। ওদের, না আমাদের?
আমাদের।
সত্যি তাহলে আসছে?
চাকভাঙা মৌমাছির মতো, বলল পিট।
লক্ষ্যস্থির করার সময় সাবধান থাকা উচিত ওদের, তা না হলে নিজেদেরই ক্ষতি-হেলিকপ্টার ভেঙে যেতে পারে।
সুবিধাটা পুরোপুরি কাজে লাগবে আমরা।
গার্ড আর মেকানিক দু’জনকে একসাথে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল ফিনলে, তারপর সিধে হলো। কোথায় চান আপনি ওদের, মি. পিট?
মেঝের যেকোনো জায়গায় থাকতে পারে ওরা, বলে চারিদিকে চোখ বুলালো পিট। মাঝখানে ক্রাশিং মিল নিয়ে ভবনটা বিশাল একটা গুহার মত। অ্যাল, ফিনলেকে সাথে নিয়ে ইকুইপমেন্ট বা ফার্নিচার যা পাও সব টেনে এনে ওর ক্রাশারাকে একটা দুর্গ বানাও। আমি আর রুডি যতক্ষণ পারি ওদেরকে ঠেকাব।
দুর্গের ভেতর আরেকটা দুর্গ? চোখ কপালে তুলল ফিনলে।
ভবনটাকে আমি নিরাপদ মনে করছি না, ব্যাখ্যা করল পিট। হাইজ্যাকাররা প্রথমে সামনের দরজাটা উড়িয়ে দেবে। এলোপাতাড়ি গুলি করতে করতে সবাই একসাথে ভেতরে ঢুকে হেলিকপ্টারটা ফিরে পাবার চেষ্টা করবে ওরা। ওদের বাধা দিতে হলে বিশজন লোক দরকার আমাদের। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে যে কটাকে পারি ফেলব আমরা, তারপর পিছিয়ে গিয়ে পজিশন নেব মিলে।
প্রকাণ্ড মিলটাকে দুর্গে পরিণত করার কাজে লেগে গেল ফিনলে আর জিওর্দিনো। বিল্ডিংয়ের উল্টোদিকের কোণের জানালায় পাহারায় থাকল পিট আর রুডি। পাহাড়ের অপরদিকের চালগুলোয় আলো ফেলতে শুরু করেছে সূর্য। অন্ধকার প্রায় নিঃশেষে মুছে গেছে।
মনে মনে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠছে পিট। ওদের পালানোর পথ বন্ধ করার জন্য সন্ত্রাসবাদীরা সম্ভবত ঘিরে ফেলবে ক্রাশিং মিল। তবু, বন্দুকযুদ্ধে জেতা হয়তো অসম্ভব নয়, কারণ ভালো একটা আড়াল রয়েছে ওদের। কিন্তু বিপদটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে জাহাজের রা স্পেশাল ফোর্সকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারলে। জানা কথা, সবাই তারা হেলিকপ্টারের দিকে ছুটে আসবে। চারজনের ছোট্ট একটা দল আতঙ্কবাদীদের বড় একটা দলের বিরুদ্ধে কতক্ষণ লড়বে?
পাহাড়ের গা বেয়ে এখন উঠে যাচ্ছে ট্রেনটা। রেললাইন থেকে আগুনের ফুলকি উঠছে। ট্রেনের মাথার ওপর সমান্তরাল একটা টানেল তৈরি করেছে সাদা বাস্প। হুইসেলের তীক্ষ্ণ শব্দ নরকে হারিয়ে যাওয়া অতৃপ্ত আত্মার বিলাপ ধ্বনির মতো একঘেয়ে আর ভোঁতা লাগল কানে।
.
৫৭.
গ্লেসিয়ারের সামনের অংশ ভাঙছে না দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়ল সুলেমান আজিজ। ঝট করে ইবনের দিকে ফিরল সে।
কী ব্যাপার, ইবনে? কোথায় ভুল হলো? কঠিন সুরে জিজ্ঞেস করল। পরপর কয়েকটা বিস্ফোরণ হবার কথা ছিল না?
ইবনের মুখ যেন পাথরে খোদাই করা। আপনি আমাকে ভালো করে জানেন, হযরত কাজে আমি ভুল করি না। আয়োজনে কোনো খুঁত ছিল না। গ্লেসিয়ার থেকে যাদেরকে নামতে দেখলাম, নিশ্চয়ই তারা এক্সপ্লোসিভগুলো দেখতে পেয়ে অকেজো করে দিয়েছে।
মুহূর্তের জন্য আকাশের দিকে তাকাল সুলেমান আজিজ, হাত দুটো উপরে তুলে আবার ঝট করে নামিয়ে নিল। ইয়া আল্লাহ, আমাদের জীবন নিয়ে কত রকম নকশাই না তৈরি করো তুমি। ঠোঁট থেকে সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল উজ্জ্বল হাসি। গ্লেসিয়ার এখনো ভাঙা যায়। হেলিকপ্টার নিয়ে আকাশে ওঠার পর, বার কয়েক আসা-যাওয়া করে ফাটলের ভেতর গ্রেনেড় ফেলতে পারি আমরা।
দুকান লম্বা হাসি দিল ইবনে। আল্লাহ আমাদেরকে ত্যাগ করেননি, হযরত। একটা কথা তো ঠিক, তীরে নেমে এসে সম্পূর্ণ নিরাপদে রয়েছি আমরা, আমেরিকানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য রয়ে গেছে দুর্ভাগা মেক্সিকানরা। এ তো আল্লাহরই ইচ্ছা।
তুমি ঠিক বলেছ, ইবনে-আল্লাহর প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ। চোখে ঘৃণা নিয়ে জাহাজটার দিকে তাকাল সুলেমান আজিজ। খানিক পরই আমরা জানতে পারব, মেক্সিকানদের আটেক দেবতা ক্যাপটেন ম্যাকাডোকে রক্ষা করতে পারে কি না।
দেখুন, হয়তো এতক্ষণে ব্যাটা মরে ভূত হয়ে,… হঠাৎ থামল ইবনে, বাতাসে কান পাতল, তারপর ঝট করে তাকাল পাহাড়ি ঢলের দিকে। গুলির আওয়াজ, জনাব। ফিসফিস করে বলল সে। খনির দিকে থেকে আসছে।
কান পাতল সুলেমান আজিজও, তবে অন্য একটা শব্দ শুনল সে। লোকোমোটিভ হুইসেলের বিরতিহীন আওয়াজ। ক্রমশ বাড়ছে। তারপর ধোয়া আর বাষ্পের আভাস চোখে পড়ল। পরমুহূর্তে পাহাড়ের মাথা টপকাল ট্রেন, ঢাল বেয়ে উন্মত্ত হাতির মতো ছুটে এল জেটির দিকে।
গাধার বাচ্চারা করছেটা কী! হাঁপিয়ে উঠল সুলেমান আজিজ, তার চিৎকার প্রায় চাপা পড়ে গেল হুইসেলের তীক্ষ্ণ আওয়াজে।
