খনির পুরনো লোকোমোটিভ-এর ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করছে দু’জন, সতর্কতার সাথে তাদের দিকে রুডিকে নিয়ে এগোচ্ছে পিট, এই সময় বিস্ফোরণের ভোঁতা আওয়াজটা শুনতে পেল ওরা।
স্থির হয়ে গেল সন্ত্রাসবাদীদের দুজোড়া হাত, পরস্পরের দিকে তাকাল তারা, আরবিতে বাক্য বিনিময় করল। কী কথায় কে জানে হেসে উঠল দু’জনেই, তারপর আবার মন দিল নিজেদের কাজে।
বিস্ফোরণের কারণ যা-ই হোক, বলল রুডি, ব্যাটারা অবাক হয়নি। যেন শুনতে পাবে বলে আশা করছিল।
গ্লেসিয়ার ভেঙে পড়ছে না, জনান্তিকে বলল পিট। পায়ের তলায় মাটি কাঁপত।
ন্যারোগেজ লোকোমোটিভটার দিকে তাকিয়ে আছে পিট। একটা কোল চেম্বারের সাথে পাঁচটা ওর-কার জোড়া হয়েছে। এ ধরনের ট্রেন আজকাল শুধু চাষাবাদ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্লান্ট আর মাইনিং অপারেশনে ব্যবহার করা হয়। ধোঁয়া বেরোনোর জন্য স্কুল চেহারার একটা চিমনি রয়েছে, ক্যাবে রয়েছে গোল আকৃতির জানালা। ইঞ্জিনের চারদিক থেকে বাষ্প আর ধোঁয়া বেরোচ্ছে অনর্গণ। ভোতা, কঠিন, জবড়জং চেহারার একটা ট্রেন।
চলো, নিচু গলায় প্রস্তাব করল পিট, প্রকৌশলী আর তার ফায়ারম্যানকে উষ্ণ বিদায়-সম্বর্ধনা দিয়ে আসি। করার মতো আর কিছু আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
অবাক বিস্ময়ে পিটের দিকে তাকাল রুডি, কিন্তু কিছু বলার আগেই দেখল মাথা নিচু করে ট্রেনের লেজ লক্ষ্য করে ছুটছে পিট। অগত্যা পিছু নিতে হলো তাকে। ট্রেনের পেছনে পৌঁছে আলাদা হয়ে গেল দু’জন দুই পাশ ধরে এগোল ওরা, ওর-কারগুলোকে ব্যবহার করল আড়াল হিসেবে। ভোলা ফায়ারবক্সের আলোয় আলোকিত হয়ে রয়েছে ক্যাব। একটা হাত তুলে ইঙ্গিত দিল পিট, রুডিকে অপেক্ষা করতে বলছে।
আরবদের একজন ইঞ্জিনিয়ারের ভূমিকা নিয়েছে। ভালব ঘোরাতে ব্যস্ত সে, স্টিম প্রেশার গজের ওপর স্থির হয়ে আছে চোখ। অপর লোকটা টেন্ডার থেকে কয়লা নিয়ে আগুনে ফেলছে। কাজ শেষ করে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে কপালের ঘাম মুছল সে, বেলচা দিয়ে বন্ধ করল ফায়ারবক্সের দরজা, সাথে সাথে প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল ক্যাবের ভেতরটা।
প্রথমে রুডির দিকে, তারপর ইঞ্জিনিয়ারের দিকে আঙুল তাক করল পিট। মাথা ঝাঁকিয়ে সঙ্কেত দিল রুডি, ঠিক আছে। হাতলটা ধরে লাফ দিয়ে ক্যাবের ভেতর উঠে পড়ল সে।
প্রথমে পৌঁছাল পিট। সরাসরি ফায়ারম্যানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল, বলল, দিনটা আজ তোমার জন্য শুভ নয়।
লোকটা সিধা হবারও সময় পেল না, তার হাত থেকে বেলচাটা কেড়ে নিল পিট, সেটা দিয়েই মাথায় একটা বাড়ি মারল।
প্রকৌশলী তাকাতে যাচ্ছিল, হেকলার অ্যান্ড কোচের মাজলে লাগানো সাইলেন্সর দিয়ে তার চোয়ালের নিচে গুতো মারল রুডি, বস্তা ভর্তি সিমেন্টের মতো পড়ে গেল লোকটা।
নতুন কেউ আছে কি না দেখার জন্য পাহারায় থাকল রুডি, অজ্ঞান দেহ দুটোকে টেনে ক্যাবের দরজার ওপর দিনে এল পিট। দুটো শরীরই বাইরের দিকে অর্ধেক ঝুলছে। সিধা হয়ে গাদা গাদা পাইপ, লীভার আর ভালভের দিকে তাকাল ও।
ভুলে যাও, মাথা নেড়ে বলল রুডি। এ কাজ আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়।
কেন, মাথা নেড়ে বলল পিট। আগে আমি ট্রেন চালিয়েছি।
তুমি ট্রেন চালিয়েছ?
একটা অ্যান্টিক অটোমোবাইল। ফায়ারবক্সের দরজাটা খোলা। গজ পড়ার জন্য আলো দরকার আমার।
দরজা খুলে গরম করার জন্য আগুনের দিকে হাত দুটো বাড়াল রুডি। যা করার তাড়াতাড়ি করো। আলোটা হাজার মাইল দূর থেকে দেখা যাচ্ছে।
একটা লিভার টেনে নামালো পিট, ছোট্ট ইঞ্জিনটা এক সেন্টিমিটারের মতো এগোল। বোঝা গেল, এটা ব্রেক। কোনো হ্যাঁন্ডেলের কী কাজ, বোধ হয় বুঝতে পারছি। শোনো, ক্রাশিং মিল পেরিয়ে যাচ্ছি দেখলে লাফ দিয়ে নেমে পড়বে, কেমন?
লাফ দিয়ে নেমে পড়ব? কেন? ট্রেনের কী হবে?
বিরতিহীন ট্রেন, চালকবিহীন।
ভয়ে ভয়ে হাতল আর লিভারগুলো নাড়াচাড়া করল পিট। ট্রেন যদি পেছন দিকে ছুটতে শুরু করে তাহলেই সেরেছে। ঝুঁকিটা স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিল শরীরে, সামনে এগোতে শুরু করেছে ওরা। থ্রটলটা শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দিল ও।
ডাইনিং হলের সামনে দিয়ে ছুটলো ট্রেন, প্রতি মুহূর্তে গতি বাড়ছে। ডাইনিং হলের দরজা খুলে বাইরের দিকে ঝুঁকল একজন, হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে, হঠাৎ ক্যাব থেকে দুটো দেহকে ঝুলতে দেখে ঝট করে হাতটা নামিয়ে নিল সে। দরজার সামনে থেকে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল লোকটা, যেন কেউ তাকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে সরিয়ে নিল। তার তীক্ষ্ণ আর্তচিৎকার শুনতে পেল ওরা।
ডাইনিং হলের দরজা লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটা গুলি করল রুডি। ট্রেন ক্রাশিং মিলের দিকে ছুটে চলেছে। নিচে, মাটির দিকে তাকাল পিট, ট্রেনের গতি আন্দাজ করল পনেরো থেকে বিশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়।
হুইসেলের লিভারটা টানল পিট, স্কি জ্যাকেটের পকেট থেকে খানিকটা নাইলন কর্ড বের করে বাঁধল সেটা। বাষ্প উদ্গিরণের সাথে কান ফাটানো আওয়াজ ছাড়ছে বাঁশি।
লাফ দেয়ার জন্য তৈরি হও. হুইসেলের আওয়াজকে ছাপিয়ে উঠল পিটের চিৎকার।
রুডি জবাব দিল না, কাঁকর ছড়ানো মাটির দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে সে। তার মনে হলো হাজার মিটার নিচে রকেটের বেগে পেছন দিকে ছুটে যাচ্ছে পাথুরে জমি।
