বাজপাখি বলছি, পরিস্থিতি জানান।
দেরি করছে তোমরা! শান্তভাবে ফিসফিস করল কর্নেল। আমার ডাকে সাড়া দাওনি কেন?
এইমাত্র নাগালের মধ্যে এলাম। বরফের পাঁচিল আমদের সঙ্কেত ভেদ করতে পারেনি।
তোমরা কি পজিশনে পৌঁছেছ?
নেগেটিভ, ভোঁতা গলায় বলল জন ডিলিঞ্জার। একটা সঙ্কটে পড়েছি, উদ্ধার পেতে সময় লাগবে।
কাকে তুমি সঙ্কট বলো?
গ্লেসিয়াল ফ্রন্টের পেছনে, একটা আইস ফ্যাকচারে অনেক এক্সপ্লোসিভ রাখা হয়েছে, সিগন্যালের সাহায্যে ডিটোনেট করার জন্য তৈরি অবস্থায়।
অকেজো করতে কতক্ষণ?
সবগুলোকে খুঁজে বের করতেই হয়তো এক ঘণ্টা পেরিয়ে যাবে।
সময় আছে মাত্র পাঁচ মিনিট, দ্রুত বলল কর্নেল। তার বেশি দেরি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়, মারা পড়ব।
বিস্ফোরণ ঘটলে মারা আমরা সবাই পড়ব, কারণ বরফের পাঁচিল সরাসরি জাহাজের ওপর ধসে পড়বে।
আমরা ঝুঁকি নেব। হঠাৎ হামলা করে চমকে দেব আতঙ্কবাদীদের, বাধা দেব ডিটোনেট করতে। তাড়াতাড়ি করো। যেকোনো মুহূর্তে আমাদের বোট দেখে ফেবে ওরা।
গ্লেসিয়ারের কিনারা থেকে অস্পষ্টভাবে আপনাদের ছায়া দেখতে পাচ্ছি আমি।
তোমার দল আগে যাবে, নির্দেশ দিল কর্নেল। গাঢ় অন্ধকার না থাকায় খোল বেয়ে উপরে ওঠা আমদের জন্য বিপজ্জনক, তোমরা যদি ওদেরকে ডাইভার্ট করতে পারো খুব ভালো হয়।
সান ডেকে ককটেল পার্টি, ওখানে আমাদের দেখা হচ্ছে, সহাস্যে বলল জন ডিলিঞ্জার।
সব বিল আমি দেব, জবাব দিল কর্নেল হোলিস, হঠাৎ প্রত্যাশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল সে। গুড লাক।
***
ইবনের চোখে ধরা পড়ে গেল ওরা।
জেটিতে দাঁড়িয়ে আছে সে, সুলেমান আজিজের পাশে, ওদের সাথে চারজন জিম্মিসহ বিশজন মিসরীয় ও রয়েছে। চোখে বাইনোকুলার তুলে গ্লেসিয়ারটা দেখছিল সে, কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা কালো পোশাকে ঢাকা মূর্তিগুলো দেখেই চমকে উঠল। রশি বেয়ে নামছে লোকগুলো, প্লাস্টিক আবরণ কেটে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে জাহাজের ভেতর।
জাহাজের খোলের নিচে বাইনোকুলার তাক করল ইবনে। কয়েকটা বোট একজায়গায় জড়ো হয়ে রয়েছে, বোটের লোকজন রশির মাথায় লাগনো হুক ছুঁড়ে দিচ্ছে ঘোট যন্ত্রের সাহায্যে, রশি বেয়ে উঠে যাচ্ছে মেইন ডেক লেভেলে।
ওরা কারা? জিজ্ঞেস করল সুলেমান আজিজ, তার চোখেও বাইনোকুলার।
বলতে পারছি না, জনাব। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে উদ্ধারকারী ফোর্স। আশ্চর্য, কোনো শব্দ তো শুনলাম না। অস্ত্রগুলোয় নির্ঘাত সাইলেন্সর লাগানো আছে। ওদের অ্যাসল্ট অপারেশনে কোনো খুঁত নেই, হযরত।
হুম।
আমার ধারণা, জনাব, ওরা বোধ হয় আমেরিকান স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সের লোক। ভোরের সাপোর্ট দল পৌঁছুনোর আগে আমাদের সরে যাওয়া দরকার, জনাব, তাগাদা দিল ইবনে।
ট্রেনের জন্য সিগন্যাল পাঠিয়েছে?
ট্রেন এল বলে, হযরত। মাইনে পৌঁছুতে পারলে….
কী ব্যাপার? প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো জানতে চাইলেন। কি ঘটছে এখানে? সুলেমান আজিজের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য একটা হাত বাড়িয়ে তার কাঁধ ছুঁতে গেলেন তিনি।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে হাতটা সরিয়ে দিল সুলেমান আজিজ। দেখা যাচ্ছে, ঠিক সময়টিতে জাহাজ ছেড়ে চলে এসেছি আমরা। আল্লাহ হাসছেন। ওদের পরিচয় যাই হোক, জানে না এখানে আমরা আছি।
আর মাত্র ত্রিশ মিনিটের মধ্যে দ্বীপে গিজগিজ করবে আমেরিকান সৈন্য। ধীর লয়ে বললেন সিনেটর পিট। আত্মসমর্পণের প্রস্তাবটা আমিই দিয়ে রাখছি।
চুপ করুন। খেঁকিয়ে উঠল সুলেমান আজিজ।
চোখ কটমট করে তাকাল সে। উদ্ধার পাওয়ার আশা ত্যাগ করুন। যারা উদ্ধার করতে আসছে বলে আপনার বিশ্বাস, তারা পৌঁছে দেখবে উদ্ধার করার মতো অবশিষ্ট নেই কেউ।
অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন হে’লা কামিল, তাহলে জাহাজেই কেন আমাদের তুমি খুন করলে না?
মুখোশের ভেতর হিংস্র হাসির সাথে সুলেমান আজিজের দাঁত দেখা গেল। হে’লা কামিলের দিকে তাকাল সে, কিন্তু জবাব না দিয়ে ইবনের দিকে ফিরল।
চার্জগুলো ডিটোনেট করো।
জো হুকুম, হযরত।
চার্জ কী চার্জ? সুলেমান আজিজের দিকে এক পা সামনে বাড়লেন সিনেটর। কী বলছ তুমি?
ওহ হো? আপনারা তো আবার জানেন না। গ্লেসিয়াল ওয়ালের পেছনে এক্সপ্লোসিভ বসিয়েছি আমরা। ইঙ্গিতে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে দেখল সে। ইবনে।
কোট পকেট থেকে ছোট একটা ট্রান্সমিটার বের করল ইবনে, সামনে বাড়িয়ে ধরল যাতে মুখের দিকটা গ্লেসিয়ারের দিকে থাকে। সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত তার চেহারা।
গর্জে উঠলেন সিনেটর পিট। থামো।
সুলেমান আজিজের দিকে তাকাল, ইবনে ইতস্তত করছে।
জাহাজটায় একশোর ওপর লোক রয়েছে, কেন ওদেরকে তুমি মারতে চাইছ?
কারো কাছে জবাবদিহি করতে আমি বাধ্য নই! ধমকে উঠল সুলেমান আজিজ।
ইয়াজিদ তোমাকে দেখে নেবে, বিড়বিড় করে বললেন হে’লা।
কাজটা সহজ করে দিলেন কথাটা বলে, সুলেমান আজিজ বলে। ইবনে, তোমার কাজ তুমি করো।
ট্রান্সমিটারের সুইচ অন করে দিল ইবনে।
.
৫৬.
গুড়গুড় শব্দে যেন মেঘ ডেকে উঠল কোথাও। গ্লেসিয়ারের সামনের চেহারায় ফাটল দেখা দিল, গুঙিয়ে উঠল বরফের প্রকাণ্ড স্তরগুলো। তারপর আর কিছুই ঘটল না। বরফের পাঁচিল শক্ত আর খাড়াই থেকে গেল।
ফাটলের ভেতর আটটা আলাদা জায়গায় বিস্ফোরণ ঘটার কথা, তবে জন ডিলিঞ্জার আর তার লোকজন জানে না, তল্লাশি বন্ধ করার আগে এটা বাদে সবগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে।
