সরাসরি জাহাজের দিকে এগোল বোটগুলো। ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছে সবার মনে। দেরিতে হলেও, হামলা চালানোর সুযোগ এখনও আছে তাদের।
কিন্তু জন ডিলিঞ্জার? গ্লেসিয়ারের ওপর দ্বিতীয় দল? কোথায় তারা?
.
মেজর ডিলিঞ্জারও সুখে নেই। পরিস্থিতি সম্পর্কে তার বরং আরও আবছা ধারণা সি ১৪০ ট্রান্সপোর্ট প্লেন থেকে জাম্প করার পরপরই তীব্রগতি বাতাস আকাশময় চরকির মতো ঘোরাতে শুরু করল তাদেরকে।
কার কী অবস্থা দেখার জন্য চোয়াল শক্ত করে ওপর দিকে মুখ তুলল জন ডিলিঞ্জার। প্রত্যেকের কাছে ছোটো একটা নীল আলো আছে, কিন্তু তুষার বৃষ্টি আড়াল থাকায় দৃষ্টি চলে না। প্যারাসুট খোলার পরপরই তাদেরকে হারিয়ে ফেলল সে।
নিচের দিকে হাত বাড়াল মেজর, পায়ের সাথে স্ট্র্যাপ দিয়ে আটকানো ঘোট কালো বাক্সটা নাগালের মধ্যে পেয়ে সুইচে চাপ দিল। কথা বলল খুদে ট্রান্সমিটারে, মেজর ডিলিঞ্জার বলছি। মার্কার বীকন অন করেছি আমি। সাত কিলোমিটার গ্লাইড করে যেতে হবে আমাদের, কাজেই আমার কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করো সবাই, ল্যান্ড করার পর চলে এসো আমার কাছে।
এই জঘন্য অবস্থায় আইল্যান্ডে নামতে পারাটাই সাত পুরুষের ভাগ্য। দলের একজন অসন্তুষ্ট সদস্য বলল।
ইমার্জেন্সি ছাড়া রেডিও সাইলেন্স বহাল থাকবে, হুকুম করল মেজর।
সবচেয়ে বড় ভয়, গ্লেসিয়ারের কিনারা ছাড়িয়ে খাড়িতে গিয়ে পড়তে পারে ওরা। ভাগ্য বিপদে ফেলল উল্টোভাবে, কিনারা থেকে বড় বেশি পেছনে ল্যান্ড করল ওরা, প্রায় এক কিলোমিটার।
অন্ধকারের ভেতর ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো গ্লেসিয়ারটা; জন ডিলিঞ্জার দেখল সরাসরি একটা ফাটলের ভেতর পড়তে যাচ্ছে সে। অসহায়ভাবে শূন্যে হাত-পা ছুড়ল, কিন্তু তাতে কি আর প্যারাস্যুট দিক বদলায় আকস্মিক দমকা বাতাসে খানিকটা কাজ হলো, ফাটলের ভেতর দিকের দেয়ালে বাড়ি খেল মেজর, প্যারাস্যুটে টান পড়ায় ফাটলের ঠোঁট থেকে উঠতে পারল। প্যারাসুট গুটাবার কোনো চেষ্টা না করে মিনিয়েচার রেডিওতে কথা বলল সে, আমি জন ডিলিঞ্জার। নিচে নেমেছি। আমার পজিশনে চলে এসো সবাই।
কোটের পকেট থেকে হুইসেল বের করে দশ সেকেন্ড পর পর একবার করে বাজাল সে, প্রতিবার দিক বদলে। কয়েক মিনিট কেটে গেল, কারো দেখা নেই। সাত মিনিটের মাথায় একজন, আট মিনিটের মাথায় আরেকজন, এভাবে বারো মিনিটের মধ্যে হাজির হলো সবাই। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল ওরা। একজনের গোড়ালি মচকে গেছে, কাঁধের হাড় ভেঙেছে আরেকজনের, সার্জেন্টের ভেঙেছে কবজি। আহতদের দিকে ফিরে মেজর বলল, সবার সাথে তাল মেলাতে পারবে না তোমরা, কাজেই পেছনে থাকো। আলোয় যেন হুড থাকে। সার্জেন্টকে নিজের পাশে দরকার তার। ফস্টার, রশি দাও সবার হাতে। গেট রেডি। আমি সামনে আছি।
এক মিনিটের মধ্যে রওনা হয়ে গেল দলটা।
.
ভাঙাচোরা, উঁচু-নিচু বরফের ওপর দিয়ে এগোনো সহজ নয়, তবু হাঁটা আর দৌড়ের মাঝখানে একটা ভঙ্গি নিয়ে বেশ দ্রুতই যাচ্ছে ওরা। সবা কোমরে রশি জড়ানো আছে, হঠাৎ ফাটলের ভেতর পা গলে গেলে খুব একটা ভয়ের কারণ নেই, বাকি সবাই তাকে টেনে তুলবে। দুবার বিরতি নিল মেজর, বিশ্রাম নেয়ার সাথেসাথে চরপাশে চোখ বুলিয়ে দিক সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া গেল।
সামনে পড়ল একটা আইস রিজ। রিজের পর ভোলা একটা খাদ। এত চওড়া খাদটা, লাফ দিয়ে পেরোনোর প্রশ্নই ওঠে না। ওপারের শক্ত বরফে লোহার একটা আঁকশি আটকাতে সাত মিনিট বেরিয়ে গেল। আটকানো গেলেও, বরফ ভেঙে সেটা খুলে আসতে পারে। সবচেয়ে হালকা লোকটা লাইন ধরে এক ইঞ্চি এক ইঞ্চি করে খাদ পেরোচ্ছে, রুদ্ধশ্বাসে দেখছে সবাই। ওপারে পৌঁছে আঁকশিটা ভালো করে বরফের ভেতর গাঁথল সে। একজন একজন করে খাদ পেরোতে বেরিয়ে গেল আরও দশটা মিনিট।
মন মেজাজের অবস্থা খুবই খারাপ মেজরের। টিমে মাত্র দু’জন লোক অক্ষত, হামলা করার নির্দিষ্ট সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। নুমা সদস্যদের পরামর্শ গ্রহণ করেনি বলে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে তার। বরফে নামার পর থেকে হামলা করার মধ্যবর্তী সময় দ্বিগুণ ধরা উচিত ছিল।
ডাইভ টিমের অবস্থা কী হয়েছে ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠল জন ডিলিঞ্জার। তারা যদি লেডি ফ্ল্যামবোয়রার খোলের পাশে ওদের জন্য অপেক্ষায় থাকে, স্রেফ ঠাণ্ডায় মারা পড়বে সব কজন। বারবার সঙ্কেত পাঠিয়েও কর্নেলের কাছ থেকে কোনো সাড়া পায়নি সে। তার পেছনে ফুটতে শুরু করেছ ভোরের ক্ষীণ আলো, ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে। গ্লেসিয়ারের সারফেস। চারদিকে অদ্ভুত এক নির্জনতা। ভীতিকর নিস্তব্ধতা স্নায়ুর ওপর যেন একটা অত্যাচার। খাড়ির চকচকে ভাবটুকুও দেখতে পেল সে। যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যাবার কারণটা হঠাৎ উপলব্ধি করতে পারল জন ডিলিঞ্জার।
ইনফ্রারেড স্কোপ ছাড়াই এখন জাহাজটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে কর্নেল হোলিস। শ্যেনদৃষ্টি সন্ত্রাসবাদীদের একজন যদি এই মুহূর্তে সরাসরি তাকায়, গাঢ় রঙের পানির গায়ে বোটের ছায়া দেখতে পাবে সে। মাঝখানের দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে, নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে কর্নেল।
আশা নেই জেনেও হাল ছাড়েনি সে, ডিলিঞ্জারের সাথে এখনো যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
হাঙর ডাকছি। বাজপাখি, সাড়া দাও। এবার নিয়ে বোধ হয় একশো পাঁচবার ডাকতে যাচ্ছে সে, এই সময় এয়ারপিস থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে এল ডিলিঞ্জারের গলা।
