নিখুঁত প্যাকেট তৈরিতে তোমার জুড়ি মেলা ভার, প্রশংসা করল পিট।
বন্দিদের ওপর চোখ রেখে জিওর্দিনো বলল, আর তোমার স্বভাব হলো, শব্দ করা। এত কিসের আওয়াজ, শুনি?
মেইন্টেন্যান্স স্ট্যান্ড থেকে দু’জন মেকানিক পড়ে গেছে, আমার কী দোষ!
সব মিলিয়ে কজনের উপকার করলাম আমরা? জানতে চাইল জিওর্দিনো।
সাতজনের।
চারজন নিশ্চয়ই ফ্লাইট ক্রুদের অংশবিশেষ।
মেকানিকদের একজনের দিকে ইঙ্গিত করল ফিনলে। একটার জ্ঞান ফিরছে।
থম্পসনটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিল পিট। ফিনলে, মুখে কাপড় খুঁজে হাত-পা বাঁধো ওদের। কপ্টারের ভেতর কাপড় পাবে। জিওর্দিনো, সব কটার ওপর নজর রাখো। রুডিকে নিয়ে বাইরেটা দেখে আসি আমি।
নো প্রবলেম! আশ্বস্ত করল জিওর্দিনো।
সাবধান, সুযোগ পেলেই ওরা তোমাকে খুন করবে।
দু’জন বন্দির কাপড় খুলে নিয়ে পরল ওরা। পিট পড়ল গার্ডের কালো ফেটিগ আর স্কি মাস্ক। দরজার দিকে হেঁটে গেল ওরা, গা ঢাকা দেয়ার কোনো চেষ্টা করল না। রাস্ত রি মাঝখান দিয়ে দৃঢ় পায়ে এগোল, দুপাশের ভবনগুলোর ওপর চোখ বুলালো। ডাইনিং হলের কাছে এসে ছায়ার ভেতর আশ্রয় নিল ওরা, উঁকি দিয়ে একটা জানালার ভেতর তাকাল।
পর্দার ফাঁক দিয়ে রুডিও তাকাল, সব মিলিয়ে বারোজনের মতো মনে হচ্ছে। সবাই সশস্ত্র। যেন চলে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে না?
কর্নেলের নিকুচি করি, ফিসফিস করে বলল পিট। একটা রেডিও দিয়ে গেলে….
এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দেরি হয়ে গেছে মানে?
সময়ের হিসাব রাখছ না? পাঁচটা। সময়মতো হামলা হয়ে থাকলে, কর্নেলের সাপোর্ট ফোর্স আর মেডিকের দল এই মুহূর্তে জাহাজের পথে আকাশে থাকার কথা।
ঠিক ধরেছে রুডি। স্পেশাল ফোর্সের হেলিকপ্টার আকাশে উঠলে আওয়াজ পেত ওরা।
চলো ওর ট্রেনটা খুঁজি, বলল পিট। ওটাকে অচল করে দিতে হবে। খনি আর জাহাজের মাঝখানে কিছুই যেন চলাচল করতে না পারে।
ডাইনিং হলের দেয়াল বরাবর নিঃশব্দে এগোল ওরা। প্রতিটি জানালার সামনে নিচু হলো, বাঁক ঘোরার আগে উঁকি দিয়ে দেখে নিল সামনেটা। ছায়া থেকে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এল স্বাভাবিকভাবে, যেন কোনো কাজে যাচ্ছে। রেইলরোডে পৌঁছুল ওরা, লাইন ধরে ছুটল। বৃষ্টি আর বাতাস থেমেছে, পূর্ব আকাশের তারাগুলো ম্লান হতে শুরু করেছে এরই মধ্যে। থম্পসনটাকে দুহাতে শক্ত করে বুকের কাছে ধরে ছুটছে পিট, অশুভ আশঙ্কায় কুঁকড়ে আছে মন।
নিশ্চয়ই খুব খারাপ কিছু একটা ঘটেছে।
৫৫. কর্নেল হোলিস
৫৫.
কর্নেল হোলিসের মনে হলো, বোট ছাড়ার পর এক জনম পেরিয়ে গেছে। ক্যারিয়ার পিজিয়ন হেলিকপ্টার উপকূল রেখা বরাবর খুব নিচ দিয়ে উড়ে খাড়ির মুখে খুদে একটা দ্বীপে কোনো রকম বিপদ ছাড়াই পৌঁছে দিয়ে গেছে দলটাকে। বোট পানিতে নামাতে বা বোটে চড়ে রওনা হতেও কোনো সমস্যা হয়নি। তবে খানিক পরই তীব্রগতি জোয়ারের মধ্যে পড়ে তারা, বোট সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। কপাল ফাটার ওই শুরু।
শব্দহীন টো বোট বেশ চলছিল, রওনা হবার দশ মিনিট পর হঠাৎ সেটার মোটর অচল হয়ে পড়ল। অগত্যা বৈঠা মেরে এগোতে হলো দলটাকে, আঙুলের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে শুরু করল মহার্ঘ সময়, ভোরের প্রথম আলো ফোঁটার আগে লেডি ফ্ল্যামবোরোয় পৌঁছানোর আশা ম্লান হয়ে এল।
কী এক রহস্যময় কারণে এরপর অকেজো হয়ে পড়ল কমিউনিকেশন সিস্টেম। হতাশায় মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করল কর্নেলের, জন ডিলিঞ্জার বা গ্রাউন্ড টিমের আর কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারল না সে। জন ডিলিঞ্জার জাহাজে পৌঁছল, নাকি হারিয়ে গেল গ্লেসিয়ারে?
হামলা করার নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে যাচ্ছে, দ্বিতীয় টিমের অবস্থান জানা নেই, এখন আর অপারেশনটা বাতিল করাও সম্ভব নয়, করণ অসময়ে হামলা করার চেয়ে ঝুঁকি তাতে বেশি পাবেন। বাতিল করা হলে জন ডিলিঞ্জার তা জানবে না।
কর্নেলের একমাত্র সুবিধা ফগ স্মোক। ছোট বোটগুলোর চারধারে ঘন ধোঁয়ার মতো ভেসে আছে কুয়াশা, খানিকটা দূর থেকেও কেউ ওদেরকে দেখতে পাবে না।
একে অন্ধকর রাত, তার ওপর কুয়াশা, কয়েক মিটারের বেশি ওরাও কিছু দেখতে পাচ্ছে না। ইনফ্রারেড স্কোপ-এর সাহায্যে খুদে বহর নিয়ে এগোচ্ছে কর্নেল। সবগুলো বোটকে তিন মিটারের মধ্যে রেখেছে সে, কাউকে দিগভ্রান্ত হতে দেখল মিনিয়েচার রেডিওতে নির্দেশ দিয়ে ফিরিয়ে আনছে পথে।
স্কোপটা লেডি ফ্ল্যামবোয়রার দিকে ঘোরাল সে। আন্দাজ করল, এখনও ওটা প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। জাহাজের সুদৃশ্য কিনারাগুলো যেন, শ্বেতপাথরের পাঁচিলের সামনে অ্যান্টিক বাথটাবে ভাসছে।
দেখি যা করার করিয়ে দিয়ে অবশেষে অকস্মাৎ মন্থর হয়ে পড়ল জোয়ারের গতি। কর্নেল লক্ষ করল, তার লোকজন বৈঠা চালিয়ে ক্লান্তির চরমে পৌঁছে গেছে।
আড়াল করে রাখা কুয়াশা পাতরা হতে শুরু করল। শত্রুপক্ষের সহজ নিশানায় পরিণত হতে হবে ভেবে ভয় পেল কর্নেল। মুখ তুলল সে। কুয়াশার ফাঁকগুলো দিয়ে দেখল হালকা নীল হতে শুরু করেছে কালো আকাশ।
তার বোটটা খাড়ির মাঝখানে রয়েছে, তীরের সবচেয়ে কাছাকাছি অংশটুকুতে আড়াল পেতে হলে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে ছাড়িয়ে আরও আধ কিলোমিটার এগোতে হবে।
জোরে বৈঠা চালাও, আরও জোরে! নির্দেশ লি কর্নেল, ইনফ্রারেড স্কোপ ছেড়ে দিয়ে নিজেও একা বৈঠা তুলে নিল হাতে।
