ভেতরের আলোয় একটা মূর্তিকে দেখা গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একটা প্লেট থেকে অভুক্ত খাবার ছুঁড়ে বাইরে ফেলল সে। পিছিয়ে বন্ধ করল দরজা। আরও দুসেকেন্ড পর সিধে হয়ে ক্রাশিং মিলের দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়াল ওরা।
ঘাড় ফিরিয়ে ফিনলের কানে ঠোঁট ঠেকাল পিট। ভেতরে ঢুকব কীভাবে?
কনভেয়র বেল্ট আছে, ভবন থেকে ক্রাশারে আসে ওর, ক্রাশার থেকে পাঠানো হয় ট্রেনে। সমস্যা হলো, সবই আমাদের মাথার অনেকটা ওপরে।
নিচের দরজা?
ইকুইপমেন্ট-স্টোরেজ-এর দরজাটা বড়, বলল ফিনলে, তার গলাও পিটের মতো নিচু। আর আছে সদর দরজা। যতদূর মনে পড়ে, একটা সিঁড়িও আছে পাশের অফিসে যাবার জন্য….
সন্দেহ নেই তালা মারা, বলল জিওর্দিনো।
সামনের দরজা, বলল পিট। ভেতরে যারা আছে তারা সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে আশা করছে না। শান্ত, স্বাভাবিকভাবে যাব আমরা, যেন দলেরই লোক। তিনজন বন্ধু ডাইনিং হল থেকে বেরিয়ে আসব।
বিড়বিড় করে অ্যাল বলল, আমি একশো ডলার বাজি রাখতে পারি, কাঁচ ক্যাচ করবে দরজা।
ক্রাশিং মিলের একটা কোণ ধীর পায়ে ঘুরল ওরা, কোনো বাধা না পেয়ে ভেতরে ঢুকল উঁচু একটা দরজা দিয়ে, কজাগুলো কোনো প্রতিবাদ করল না।
দরজা আওয়াজ না করুক, নির্ঘাত মাথার ওপর ছাদ ভেঙে পড়বে। দুসারি দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিসহিস করে উঠল জিওর্দিনো।
বিল্ডিংয়ের ভেতরটা বিশাল। হওয়ারই কথা। দানবাকৃতি একটা অক্টোপাসের মতো মাঝখানে রয়েছে মেকানিকাল মেশিনটা, সাথে কনভেয়র বেল্ট, ওয়াটার হোস আর ইলেকট্রিকাল ওয়্যারিংগুলো যেন গুড়। ওর-ক্রাশারে রয়েছে বিভিন্ন মাপের ইস্পাতের বলসহ লম্বা সিলিন্ডার।
একদিকের দেয়াল বরাবর বসানো রয়েছে প্রকাণ্ড আকারের ট্যাংকগুলো। মাথার ওপরে ক্যাটওয়াক, ইস্পাতের মই বেয়ে উঠতে হয়। ক্যাটওয়াক রেইলিং থেকে কর্ডের ডগায় ঝুলছে আলোর মালা, বিদ্যুৎ সরবরাহ হয় পোর্টেবল জেনারেটর থেকে, সেটার এগজস্ট এককোণে বেরিয়ে আছে।
আন্দাজ করতে ভুল হয়েছে পিটের। দুটো, এমনকি তিনটে হেলিকপ্টার থাকবে বলে আশা করেছিল ও। রয়েছে মাত্র একটা-বড়সড় ব্রিটিশ ওয়েস্টল্যান্ড কমান্ডো, পুরনো হলেও বিশ্বস্ত বাহন, সাধারণত টুপস ট্রান্সপোর্টের কাজেই ব্যবহার করা হয়। ত্রিশজন বা আরও বেশি লোকের জায়গা হবে ভেতরে। উঁচু মেকানিক স্ট্যান্ডে কমব্যাট ফেটিগ পরা দু’জন তোক দাঁড়িয়ে রয়েছে, ইঞ্জিনের পাশে অ্যাকসেস প্যানেলের ভেতর দিয়ে কী যেন দেখছে তারা। নিজেদের কাজে এতই মগ্ন, ভোর রাতের আগন্তুকদের দিকে তাকালই না।
ধীরে ধীরে, সতর্কতার সাথে, খোলা ক্রাশিং রুমের ভেতর ঢুকল পিট। ওর ডানদিকে ফিনলে, বাঁ দিকটা কাভার দিচ্ছে জিওর্দিনো, পেছনে রয়েছে রুডি। হেলিকপ্টারের ক্রু দু’জন এখনও ঘাড় ফিরিয়ে ওদের দিকে তাকাচ্ছে না। তৃতীয় লোকটাকে হঠাৎ করে দেখতে পেল ওরা, চমকে উঠল যেন ভূত দেখেছে। দরজার দিকে পেছন ফিরে, ওল্টানো একটা বাক্সের ওপর বসে আছে সে, একটা সাপোর্ট বিম এর পেছনে।
ইঙ্গিতে নির্দেশ দিল পিট। ফিনলে আর জিওর্দিনোকে ছায়ার ভেতর দিয়ে হেলিকপ্টার ঘুরে উল্টোদিকে যেতে হবে, ওদিকে আর কোনো আছে কি না দেখার জন্য। ওরা অদৃশ্য হয়ে যেতেই ঘাড় ফিরিয়ে পিটের দিকে তাকাল গার্ড, খোলা দরজা দিয়ে আসা ঠাণ্ডা বাতাস সতর্ক করে দিয়েছে তাকে।
তাড়াহুড়ো করল না পিট, ইতিস্ততও করল না। শান্তভাবে এগোল গার্ডের দিকে। লোকটা কালো কমব্যট ফেটিগ পরে আছে, মাথায় স্কি মাস্ক। দুমিটার দূরে তাকতে মৃদু হাসল পিট, হাতটা সামান্য একটু তুলে নাড়ল।
নিস্পলক তাকিয়ে থেকে আরবিতে কি যেন বলল লোকটা।
হাসিটা আরও বড় হলো পিটের মুখে, কাঁধ ঝাঁকালো। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলল, জেনারেটরের আওয়াজে শুনতে পাওয়া গেল না।
হঠাৎ করেই ওর হাতের থম্পসন মেশিন গানের ওপর চোখ পড়ল গার্ডের। বিস্ময় কাটিয়ে উঠে হাতের আগ্নেয়াস্ত্র পিটের দিকে তাক করতে দুসেকেন্ড দেরি করে ফেলল সে, দিতে হলো কঠিন মূল্য। থম্পসনের বাটটা সবেগে তার মাথায় নামিয়ে আনল পিট।
সাপোর্ট বিমের আড়ালে কাত হয়ে পড়ে গেল গার্ড, তার হাতের অস্ত্রটা মেঝেতে খসে পড়ার আগেই ধরে ফেলল পিট। অজ্ঞান দেহটাকে আগের ভঙ্গিতে বসাল সে, দেখে মনে হবে ঝিমুচ্ছে। হেলিকপ্টারের ফরওয়ার্ড ফিউজিলাজের তলা দিয়ে এগোল ও। মেকানিক দু’জন ইঞ্জিনে কাজ করছে এখনও। মইটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিল ও, মইয়ের মাথায় স্ট্যান্ডে দাঁড়ানো লোক দু’জন শূন্যে ছিটকে পড়ল, এতই চমকে গেছে যে, চিৎকার করতে ভুলে গেল। কঠিন মেঝেতে বস্তার মতো পড়ল তারা, একজন মাথায় আঘাত পেয়ে সাথে সাথে জ্ঞান হারাল, আরেকজন কাত হয়ে পড়ায় তার একটা হাত ভেঙে গেল। ব্যথায় গুঙিয়ে উঠল লোকটা, খুলিতে থম্পসনের বাড়ি খেয়ে থামল।
চমৎকার রিফ্লেক্স, নিস্তব্ধতা ভাঙল ফিনলে। প্রতিটি নড়াচড়ার ছবি বাঁধাই করে রাখার মতো।
ক্যামেরা আনিনি, সেজন্য তুমি আমাদেরকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করাতে পারো, বলে হাসল রুডি।
সবগুলোকে অচল করা গেছে, ঠিক? দ্রুত জিজ্ঞেস করল পিট।
আরে না। হেলিকপ্টারের পেছনে চলুন, দেখতে পাবেন।
সাবধানে হেলিকপ্টারের তলা দিয়ে এগোল ফিনলে, তাকে অনুসরণ করল পিট। পেছন দিকে এসে হেসে ফেলল ও। একটা ফোল্ডিং চেয়ারে বসে রয়েছে জিওর্দিনো, তার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে চারজন বন্দি, প্রত্যেকের মাথায় একটা করে স্লীপিং ব্যাগ গলানো।
