নিঃশব্দে সবার সামনে চলে গেল ফিনলে। আকাশে থাকতে যেমন দেখেছে ওরা, নিচে নামার পরও তাই দেখছে, তুষার বৃষ্টিতে খুব বেশি দূর দৃষ্টি চলে। ফিনলের হাতের টর্চটা প্রায় কোনো কাজেই আসছে না। টর্চের আলোয় বৃষ্টির ফোঁটা চেনা যায়, এক কি দুমিটার সামনের এবড়োখেবড়ো পাথুরে জমি দেখা যায় কি যায় না।
একটা অ্যাসল্ট টিমের সাথে ওদের কোনো মিল নেই। দৃশ্যত কোনো অস্ত্র নেই। ঠাণ্ডা থেকে বাঁচার জন্য চারজনের কাপড় চার রকম। পিট পরেছে ধূসর স্কি টগসটা গাঢ় নীল। রুডি পরেছে কমলা রঙের সারভাইভাল স্যুট, মাপ দুই সাইজ বড়। ফিনলের পরনে গলা-ঢাকা ওভারকোট, মাথায় কান-ঢাকা ক্যাপ। শুধু একটা জিনিস চারজনই ব্যবহার করছে, হলুদ লেন্স লাগানো স্কি গগলস।
বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় বিশ কিলোমিটার। ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে পাথর। পা হড়কে পিছলে গেল ওরা, আছাড় খেল। তবে কারো কোনো অভিযোগ নেই। না চাইলে কেউ কাউকে সাহায্যও করছে না।
মাঝেমধ্যে গগলস থেকে তুষার পরিষ্কার করতে হলো। খানিক পর সামনে থেকে ওরা দেখতে পেল ঠিক যেন তুষার মানব, অথচ পেছন দিকটা রীতিমতো শুকনো।
হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল ফিনলে। টর্চের আলো ফেলে বরফ-মুক্ত বোল্ডারগুলো পরীক্ষা করল সে। বাতাসের গতি বেড়ে গেছে অনুভব করে বুঝতে পারল, চূড়ার কাছাকাছি উঠে এসেছে ওরা। আর বেশি দেরি নেই, বাতাসের গর্জনকে ছাপিয়ে উঠল তার গলা। এরপর শুধুই ঢাল বেয়ে নেমে যাওয়া।
দুর্ভাগ্য এখানে কোনো স্নেজগাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না। ঘোৎ ঘোঁৎ করে উঠল জিওর্দিনো।
দস্তানা সরিয়ে ঢোকা ড্রাইভ ওয়াচের ডায়ালে চোখ রাখল পিট। হামলার সময় নির্ধারিত হয়েছে সকাল পাঁচটা। আর আটাশ মিনিট পর। নাহ্, ওরা অনেক দেরি করে ফেলছে। চলো, তাড়াতাড়ি নামি। অনুষ্ঠানটা মিস করতে চাই না।
পনেরো মিনিট দ্রুত নামল ওরা। পাহাড়ের পা ক্রমশ চালু হয়ে নেমে গেছে। আঁকাবাঁকা একটা পথ খুঁজে পেল ফিনলে, খনির দিকে চলে গেছে। আরও নিচে নামার পর কুৎসিকদর্শন ঝোঁপের সংখ্যা কমে এল, পাথরগুলো এদিকে আগের চেয়ে ছোট, আলগা। পাথুরে মাটিতে কাঁকর বেশি, পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা কম। ভাগ্য ভালোই বলতে হবে, বাতাসের গতিবেগ কমে এল, ধরে এল তুষার বৃষ্টি। মেঘের নিরেট পর্দায় ফাঁক-ফোকর দেখা দিল, উঁকি দিল দুচারটে করে তারা। চোখে গগলস না থাকলেও সামনেটা এখন ওরা দেখতে পাচ্ছে।
অন্ধকারের ভেতর উঁচু হয়ে থাকা আকরিক আবর্জনার একটা সুপ চিনতে পেরে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেল ফিনলের। পটাকে ঘুরে ছোট, ন্যারোগেজ রেলরোড-এর পাশে পৌঁছুল দলটা, অন্ধকারের ভেতর অনুসরণ করল সেটাকে।
ঘাড় ফিরিয়ে আমরা পৌঁছে গেছি বলতে যাবে ফিনলে, কিন্তু বাধা দেয়া হলো তাকে। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে, ঝট করে হাত বাড়িয়ে ফিনলের ওভারকোট খামচে ধরে হ্যাঁচকা টান দিল পিট, অপর হাত দিয়ে চেপে ধরল তার মুখ।
চুপ! চাপা গলায় বলল পিট, ফিনলের মুখ থেকে হাত সরিয়ে টর্চটা ছে দিয়ে কেড়ে নিয়ে বন্ধ করল।
কী… শুরু করল ফিনলে।
চোপ! ফিসফিস করল পিট।
নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল রুডি, কিছু শুনেছ?
না, পরিচিতি একটা গন্ধ।
পরিচিত গন্ধ?
বাচ্চা-ভেড়ার একটা পা, বলল পিট। আগুনে ঝলসানো হচ্ছে।
পেছন দিকে মাথা কাত করে নাকে বাতাস টানল ওরা।
ঈশ্বর, তুমি ঠিক ধরেছ, বিড়বিড় করল জিওর্দিনো। গন্ধটা আমিও পাচ্ছি।
ফিনলেকে এতক্ষণে ছেড়ে দিল পিট। কী হে ফিনলে, তোমার আগেই দেখছি। আরেকজন এসে দখল করে নিয়েছে খনিটা।
নিশ্চয়ই একদল গাধা। যদি ভেবে থাকে খনি থেকে দস্তা তুলতে পারবে…
একবারও ভাবছ না, ওরা দস্তা তুলতে না-ও এসে থাকতে পারে?
একপাশে সরে গেল রুডি। তুমি টর্চ নেভানোর আগে এদিকে কোথাও আমি কী যেন একটা চকচক করতে দেখেছি। ছোট একটা বৃত্ত রচনা করে ঘুরতে শুরু করল সে। বুটে লেগে কী যেন একটা গড়িয়ে গেল। সেটা তুলে আলোয় সামনে ধরল সে। একটা স্কচ হুইস্কির খালি বোতল।
অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে এখানে, বলতেই হবে, বিস্ময় প্রকাশ করল ফিনলে। মাইনাররা এত দামি মদ খায়, আমার জানা ছিল না।
রুডি বলল, হুইস্কি আর ভেড়ার পা, ধরে নেয়া চলে লেডি ফ্ল্যামবোরো থেকে এসেছে।
গ্লেসিয়ার যেখানে খাড়ির সাথে মিশেছে, সেখান থেকে কতটা দূরে আমরা? জানতে চাইল পিট।
গ্লেসিয়ার উত্তর দিকে মাত্র পাঁচশো মিটার গেছে। খাড়ির দিকে মুখ করা পাঁচিলটা পশ্চিম দিকে দুকিলোমিটারের কম।
ওর কীভাবে সরানো হয়?
হাত তুলে খড়ির দিকটা দেখাল ফিনলে। ন্যারোগেজ রেলরোড রয়েছে না! খনির প্রবেশ মুখ থেকে ওর-ক্রাশার পর্যন্ত লম্বা লাইনটা, তারপর গেছে ডক পর্যন্ত, ওখানে জাহাজে ভোলা হয় ওর।
কিন্তু তুমি কোনো ডকের কথা আগে বলেনি।
কেউ জিজ্ঞেস করলে তো বলব, কাঁধ ঝাঁকাল ফিনলে। ছোট একটা লোডিং জেটি।
জাহাজ থেকে আনুমানিক দূরত্ব?
হাতে জোর থাকলে, ডক থেকে একটা বল ছুঁড়ে জাহাজের খোলে লাগানো যায়।
দেখতে পাওয়া উচিত ছিল, তিক্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করল পিট। কেউ আমরা দেখতে পাইনি।
কী বলছেন বুঝতে পারছি না! ফিনলে অবাক।
সন্ত্রাসবাদীদের সাপোর্ট দল, বলল পিট। জাহাজে যারা আছে, পালানোর জন্য ওদের একটা অ্যাডভান্সড বেস দরকার। সাবমেরিনের ব্যবস্থা না থাকলে সাগরে নেমে ধরা পড়ার ঝুঁকি ওরা নেবে কেন? আর সাবমেরিন জোগাড় করতে হলে বৈধ সরকারি সহযোগিতা লাগবে।
