ওরা কথা বলছে, দু’জনের কেউই খেয়াল করল না, রাডারস্কোপে একটা জোরাল ব্লিপ উদয় হয়েছে। দ্বীপের মাঝখান দিয়ে উড়ে যাচ্ছে একটা আকাশ যান।
ব্লিপটা দেখে সতর্ক যদি হতোও ওরা, মেজর ডিলিঞ্জারের এয়ার অ্যাসল্ট টিমের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানতে পারত না শত্রুপক্ষ। স্পেশাল অপারেশন ফোর্সের সদস্যরা বিশেষ ধরনের চোরাগুপ্তা প্যারাসুট ব্যবহার করছে, রাডারে তা ধরা পড়বে না। এরই মধ্যে খুলে গিয়ে গ্লেসিয়ারে দিকে ভেসে যাচ্ছে সেগুলো।
.
৫৪.
টিল্ট-রোটর অসপ্রে বিমানে বসে আছে পিট। ওঠানামা করে হেলিকপ্টারের মতো, ঘণ্টায় ছয়শো কিলোমিটার গতিতে ওড়ে বাহনটা। খোলো আনা জেগে আছে ও, অবিশ্বাস্য পাতলা প্যাড লাগানো অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সিটে বসে, কানে ইঞ্জিনের শব্দ নিয়ে শুধু বোধ হয় একটা লাশের পক্ষেই ঘুমানো সম্ভব। শুধু একটা লাশের পক্ষে, তবে অ্যাল জিওর্দিনো বাদে। চুপসে আছে সে, মনুষ্য আকৃতির একটা বেলুন যেন। কয়েক মিনিট পর পর, যেন নির্দেশ দেয়া আছে মগজকে, চোখ না মেলে বা নিঃশ্বাসের ছন্দপতন না ঘটিয়ে পাশ ফিরে শুইছে।
এটা কীভাবে সম্ভব? সবিস্ময়ে জানতে চাইল কেইটন ফিনলে।
ওর জিনে আছে ব্যাপারটা, জবাব দিল পিট।
এর চেয়েও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে ওকে আমি ঘুমাতে দেখেছি, বলল রুডি।
কো-পাইলট ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাল, ঠিক জানেন, উনি জ্ঞান হারাননি?
সবাই ওরা হাসল। তারপর নিস্তব্ধতা নেমে এল অসপ্রের ভেতর, সবারই একটা চিন্তা, বাইরের হিম নরকে বেরোতে না হলে কি ভালোই না হতো। যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে পিট। খানিকটা তুপ্তিও বোধ করছে ও। অ্যাসল্ট টিমে ওকে নেয়া হয়নি বটে, তবে কর্নেল হোলিস আর ডিলিঞ্জারের কাছাকাছি থাকার সুযোগ আদায় করা গেছে। জিম্মি উদ্ধারে ট্রেনিং পাওয়া প্রফেশনালরা দায়িত্ব পালন করুক। ওদের পিছু পিছু সমস্ত অ্যাকশন পর্যবেক্ষণে যাওয়ার অভিপ্রায় ওর।
বাবার ব্যাপারে তেমন কোনো দুশ্চিন্তা নেই ওর। সিনেটর পিট যে বেঁচে আছেন, এ ব্যাপারে মুহূর্তের জন্য ওর মনে কোনো সংশয় জাগেনি। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে পারবে না, এমনকি নিজের কাছেও নয়, তবু কথাটা সত্যি-বাপের উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে ও। বছরের পর বছর ধরে দু’জনের মধ্যে একটা মানসিক যোগাযোগ রয়েছে, অদৃশ্য বন্ধন বলা যেতে পারে, পরস্পরের মন ভোলা বইয়ের মতো পড়তে পারে ওরা।
ছমিনিটের মধ্যে ল্যান্ডিং পয়েন্টে পৌঁছে যাব, ঘোষণা করল পাইলট।
বরফ ঢাকা চূড়াগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে অসপ্রে, তুমুল তুষার বৃষ্টির আড়ালে সেগুলো দেখা যাচ্ছে না, তবু চেহারায় কোনো উদ্বেগ নেই পাইলটের।
আপনি জানছেন কীভাবে আমরা কোথায়? জিজ্ঞেস করল পিট।
অলসভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল পাইলট। সব আমার কবজিতে।
সামনের দিকে ঝুঁকে পাইলটের কাঁধের ওপর দিয়ে তাকাল পিট। কন্ট্রোলে কোনো হাত নেই। হাত দুটো বুকে ভাজ করে রেখেছে পাইলট, ছোট্ট একটা স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। জিনিসটা ভিডিও গেমের মতো দেখতে। গ্রাফিকস ডিসপ্লের নিচের দিকে অসপ্রের নাকটা শুধু দেখা যাচ্ছে। সচল ছবিতে রয়েছে পাহাড়, উপত্যকা-অসপ্রের নিচ দিয়ে পেছন দিকে ছুটে যাচ্ছে সেগুলো। স্ক্রিনের ওপর দিকে, এক কোণে, দূরত্ব আর উচ্চতা লাল ডিজিটাল সংখ্যায় দেখা যাচ্ছে।
সমস্ত কিছুর বিকল্প হয়ে উঠছে কম্পিউটর, মন্তব্য করল পিট।
ভাগ্য ভালো, যে এখনও ওরা এমন কোনো কম্পিউটর বানাতে পারেনি যেটা যৌবনের চাহিদা মেটাতে পারে, বলে হো হো করে হেসে উঠল রুডি।
কীভাবে কাজ করে, বলবেন? পাইলটকে জিজ্ঞেস করল পিট।
ইনফ্রারেড আর রাডার স্ক্যানারে নিচের গ্রাউন্ড স্টাডি করে, ত্রিমাত্রিক ডিসপ্লেতে স্টাডির রেজাল্ট রূপান্তর করে পাঠায় কম্পিউটর।
মাথা ঝাঁকাল পিট।
ছোট্ট এই ইলেকট্রনিক গাইড যদি না থাকতো, বলে চলল পাইলট, পান্টা অ্যারেনাসে এখনও বসে থাকতাম আমরা দিনের আলো আর ভালো আবহাওয়ার অপেক্ষায়। অদ্ভুত একটা শব্দ বেরিয়ে এল ডিসপ্লে স্ক্রিন থেকে, আড়ষ্ট হলো পাইলট। সামনে আমাদের ল্যান্ড করার নির্ধারিত জায়গা। নামার জন্য আপনার লোকদের প্রস্তুতি নিতে বলুন।
আপনাকে ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছেন, কর্নেল হোলিস?
পাহাড় চূড়ার পেছনে মাইনের ওপর দিকে কোথাও আপনাদের নামিয়ে দিতে হবে, জাহাজের রাডারে যাতে অসপ্রে ধরা না পড়ে। বাকি পথ আপনাদেরকে হেঁটে পেরুতে হবে।
ফিনলের দিকে ফিরল পিট। তোমার দিক থেকে কোনো সমস্যা?
হাসল ফিনলে। পাহাড়টা আমার স্ত্রীর পশ্চাৎদেশের মতোই চেনা-ঢাল, খাদ, চড়াই, উতরাই ইত্যাদিসহ। খনির প্রবেশমুখ থেকে চূড়াটা তিন কিলোমিটার দূরে। ঢাল বেয়ে সহজেই নামা যায়। চোখ বুজে নামতে পারব।
আবহাওয়ার যা অবস্থা, ম্লান সুরে বলল পিট, ধরে নাও, ঠিক তাই তোমাকে করতে হবে।
.
অসপ্রে ইঞ্জিনের গর্জন থামল, শুরু হলো তীব্রগতি বাতাসের একটানা আহাজারি। কার্গো হ্যাঁচ গলে বাইরে বেরিয়ে এসে শীতে ঠক ঠক করে কাঁপতে লাগল নুমার সদস্যরা। নষ্ট করার সময় নেই, কোনো কথা হলো না, শুধু হাত নেড়ে বিদায় জানাল ওরা পাইলটদের। এক মিনিটের মধ্যে বাতাসের গায়ে হেলান দিয়ে রওনা হয়ে গেল চারজন লোক, সাথে দুটো ব্যাগ। পাথুরে ঢাল বেয়ে চূড়ার দিকে উঠে যাচ্ছে দলটা।
