বিস্ফোরক চার্জ?
গ্লেসিয়ারের মুখের সাথে একই রেখায় লম্বা একটা ফাটল আছে, সবগুলো এক্সপ্লোসিভ খানিক পরপর বসানো হয়েছে। বিস্ফোরণ ঘটলে গোটা সামনের পাঁচিল ধসে পড়বে জাহাজের ওপর।
জাহাজ ছাড়তে কতক্ষণ সময় লাগবে আমাদের?
স্রোত বেশ জোরাল, বৈঠা চালাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে আমাদের লোকেরা। আওয়াজের ভয়ে বোটের মোটর চালু করা যাচ্ছে না। স্যার, জাহাজ ছাড়তে সময় লাগবে আরও পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
দিনের আলো ফোটার আগে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে হবে আমাদের।
সবাই জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করে যাবে, হযরত।
তোমাকে ছাড়া ফেরি অপারেশন চালাতে পারবে ওরা? জানতে চাইল সুলেমান আজিজ
পারবে।
একজন লোককে সাথে নিয়ে হাসানের কেবিনে আমার সাথে দেখা কোরো।
তার মানে কী, হযরত, ওদেরকে খতম করার সময় হয়েছে? চাপা উত্তেজনার সাথে প্রশ্ন করল ইবনে।
না। ওদেরকে আমরা সাথে নিচ্ছি।
রেডিওর সুইচ অফ করে পবিত্র কোরানে পকেটে ভরল সুলেমান আজিজ। তার সাথে বেঈমানি করা হয়েছে, কাজেই প্রতিশোধ নিতে হবে তাকে। ইয়াজিদের এত সাধের প্ল্যানটা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে সে। কাজের বিনিময়ে মূল্য বা পুরস্কার তো দূরের কথা, তার বদলে ম্যাকাডোকে দিয়ে তাকে আর তার হাইজ্যাক পার্টিকে খুন করার মতলব করেছে আখমত ইয়াজিদ। কেউ পিঠে ছুরি মারার চেষ্টা করলে সুলেমান আজিজ তাকে ক্ষমা করে না।
প্রেসিডেন্ট হাসান আর হে’লা কামিলকে বাঁচিয়ে রাখবে সুলেমান আজিজ। হ্যাঁ, বাঁচিয়ে রাখকে প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকেও। অন্তত কিছুদিনের জন্য হলেও। দর কষাকষিতে কাজে লাগবে। টেবিল উল্টে ফেলে দৃশ্যপট বদলে দেবে সে, সমস্ত দায় আর অভিযোগ চাপারে আখমত ইয়াজিদ ও টপিটজিনের ঘাড়ে। দুনিয়ার সামনে খুলে ধরবে তাদের মুখোশ।
নতুন একটা প্ল্যান তৈরি করার জন্য সময় দরকার তার। তবে আগের কাজ আগে।
নিজের লোকদের নিয়ে জাহাজ থেকে সরে যেতে হবে তাকে। মেক্সিকান খুনিরা কিছু টের পাবার আগেই।
.
দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকালেন হে’লা কামিল, সন্ত্রাসবাদীদের নেতাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে ছাৎ করে উঠল বুক। অদ্ভুত মুখোশটার দিকে তাকিয়ে তার শুধু চোখ জোড়া দেখতে পেলেন তিনি, অনায়াস ভঙ্গিতে মেশিনগান ধরে আছে একহাতে। মেয়েলি কৌতূহলবশত তিনি ভাবলেন, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে লোকটা কেমন কে জানে!
কেবিন স্যুইটের ভেতর ঢুকে কঠিন সুরে বলল সুলেমান আজিজ, আপনারা সবাই আসুন আমার সাথে।
খারাপ কথাটাই আগে মনে আসে। এবার বোধ হয় গুলি করা হবে ওদেরকে। ভয়ে কেঁপে উঠলেন হে’লা কামিল, চোখ নামিয়ে ডেকের দিকে তাকালেন, ভয় প্রকাশ করে ফেলায় রেগে উঠলেন নিজের ওপর।
উদ্বেগ বা দ্বিধা কোনোটাই প্রকাশ পেল না, প্রায় লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন সিনেটর পিট। দৃঢ়, দীর্ঘ পদক্ষেপে এগোলেন তিনি, সরাসরি সুলেমান আজিজের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, দুজোড়া জুতোর ডগা ছোয় ছোয় অবস্থা। কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাদের, এবং কেন? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে উত্তর দাবি করলেন তিনি।
ভুলে গেছেন আপনি আমার বন্দি? ঠাণ্ডা স্বরে বলল সুলেমান আজিজ। যদি বলি, গুলি করার জন্য নিয়ে যাচ্ছি, কী করার আছে আপনার? বিদ্রুপের হাসি হাসল সে। আর কখনও জেরা করবেন না আমাকে।
তোমার কথায় এত গর্ব আর ধমক কেন? আরও তীক্ষ্ণ হলো সিনেটরের কণ্ঠস্বর। এভাবে কাউকে বন্দি করা কাপুরুষের কাজ, জানো না? আর বন্দিদের যারা গুলি করতে নিয়ে যায়, তারা নিশ্চয়ই অন্য কারো কেনা গোলাম।
বাজে কথা বলবেন না! সিনেটরকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে কয়েক পা সামনে বাড়লো সুলেমান আজিজ, ম্লান চেহারাগুলোর দিকে এক এক করে তাকাল। বোটে চড়ে সবাই একটু বেড়াবেন আর কী? খানিকক্ষণ ট্রেন ভ্রমণের সুযযোগও পাবেন। আমার লোকেরা কম্বল দেবে একটা করে, সময়টা বেশ ভালোই উপভোগ করবেন।
কেউ কোনো কথা বলল না, শুধু তাকিয়ে থাকল।
অসুস্থ, অসহায় অনুভূতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসানকে দাঁড়াতে সাহায্য করলেন হে’লা কামিল। একটানা কয়েকটা দিন মৃত্যুর হুমকির মধ্যে বাস করে জীবনের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলেছেন ভদ্রমহিলা। তাঁর এখন মনে হচ্ছে কিছুতেই কিছু এসে যায় না। অথচ অন্তরের গভীরে কোথাও আগুনের একটা ফুলকি ছোটোছুটি করছে, ইচ্ছাশক্তি একত্রিত করে বিদ্রোহ করার উৎসাহ দিচ্ছে তাকে। ধীরে ধীরে একজন যোদ্ধা অনুপ্রবেশ করল তার মধ্যে। যে জানে যুদ্ধে যাচ্ছে, জানে মৃত্যু অনিবার্য, সেই সাথে জানে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করবে সে।
.
ভেতরে ঢুকে কমিউনিকেশন রুম খালি দেখল ম্যাকাডো। প্রথমে তার মনে হলো, সুলেমান আজিজের রেডিও অপারেটর সম্ভবত প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গেছে। ব্যাথরুমটা পরীক্ষা করার পর তার ভুল ভাঙল।
রেডিও প্যানেলের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকল ম্যাকাডো। ঘুম না হওয়ায় লাল হয়ে আছে চোখ। চেহারায় সংশয়। ধীর পায়ে ব্রিজে চলে এল সে, রাডার স্কোপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নিজের একজন লোকের দিকে এগোল। রেডিও অপারেটর কোথায়? প্রশ্ন করল সে।
ঘুরে দাঁড়াল রাডার অবজারভার, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, তাকে তো আমি দেখিনি, ক্যাপটেন কমিউনিকেশন নিমে নেই সে?
না, ঘরটা খালি।
ওদের লিডারকে জিজ্ঞেস করে দেখব? ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল ম্যাকাডো, মিসরীয় রেডিও অপারেটরের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে বুঝতে পারছে না। জর্জ দেলগাদোকে ডেকে আনো এখানে। রেডিও বোঝে সে। আরবরা নয়, এখন থেকে কমিউনিকেশন রুমের দায়িত্বে থাকব আমরা।
