.
৫৩.
আর কত দেরি? জানতে চাইল ম্যাকাডো, গা ছেড়ে দিয়ে ক্যাপটেন কলিন্সের সোফায় বসে রয়েছে।
পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ থাকায় ক্যাপটেনের কেবিনের টর্চলাইট জ্বালানো হয়েছে। সিলিংয়ের চারটে কোণ থেকে ঝুলছে সেগুলো।
কোরআন পড়ছে সুলেমান আজিজ, মুখ না তুলে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল। কমিউনিকেশন রুমে আমার চেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন আপনি, আপনিই বলুন।
পোয়াতি হাঁসের মতো অপেক্ষা করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। আসুন, সবাইকে গুলি করে এই নরক থেকে কেটে পড়ি।
হত্যা ষড়যন্ত্রের দোসর ম্যাকাডোর দিকে তাকাল সুলেমান আজিজ। মেক্সিকান লোকটা নোংরা। তার চুল তেল-চিটচিটে ময়লা, নখের ভেতর ধুলোবালি। দুহাত দূর থেকে নাক টানলে দুর্গন্ধে ভূতও পালাবে। বিপজ্জনক হুমকি হিসেবে ম্যাকাডোকে শ্রদ্ধা করে সুলেমান আজিজ, তার বাকি সব কিছু ঘৃণার উদ্রেক করে।
সোফা ছেড়ে পায়চারি শুরু করল ম্যাকাডো, মনটাকে শান্ত করতে না পেরে একটা চেয়ারে বসল। চব্বিশ ঘণ্টা আগেই নির্দেশ আসা উচিত ছিল, বলল সে। টপিটজিন দ্বিধায় ডোগার মানুষ নন।
আখমত ইয়াজিদও নন, পবিত্র পুস্তকে চোখ রেখে বলল সুলেমান আজিজ। তার আর পরম করুণাময় আল্লাহর ওপর আমার অগাধ বিশ্বাস আছে। তারা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ঠিকই করবেন।
কী ব্যবস্থা করবেন? প্রায় চেঁচিয়ে উঠে জানতে চাইল ম্যাকাডো। হেলিকপ্টার, জাহাজ, নাকি সাবমেরিন? আমাদের পরিচয় ফাস হবার আগে, না পরে? আপনি জবাবটা জানেন, মিসরীয় বন্ধু, তবু নিষ্প্রাণ মূর্তির ভূমিকা নিয়ে আছেন।
চোখ না তুলে একটা পাতা ওল্টাল সুলেমান আজিজ। কাল এই সময় আপনি আর আপনার দল নিরাপদে পৌঁছে যাবে মেক্সিকোয়।
আদর্শের জন্য, বৃহত্তর স্বার্থে, আমাদেরকে বলি দেয়া হবে না, সে নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারেন?
আমরা ধরা পড়া মানে আখমত ইয়াজিদ ও টপিটজিনের বিপদ, বলল সুলেমান আজিজ। কারণ শারীরিক নির্যাতন করা হলে আমরা মুখ খুলতে পারি। হাইজ্যাকিংয়ের সাথে তারা জড়িত, এ কথা আমরা যদি ফাঁস করে দিই, তাদের সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাবে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখুন, আমাদের পালানোর ব্যবস্থা করা হবে। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন।
কী ব্যবস্থা?
প্ল্যানের ওই অংশটুকু আপনাকে জানো হবে জিম্মিদের সম্পর্কে নির্দেশ আসার পর।
অতিরঞ্জিত গল্পে ফাঁক-ফোকর দেখা দিতে শুরু করেছে। যেকোনো মুহূর্তে সত্যের আভাস পেয়ে যাবে ম্যাকাডো। যতক্ষণ সুলেমান আজিজের নিজস্ব লোক জাহাজের কমিউনিকেশন, নেটওয়ার্ক অপারেট করবে, রেডিও সেট ভুল ফ্রিকোয়েন্সিতে থাকায় কোনো সঙ্কেত রিসিভ করা যাবে না। আখমত ইয়াজিদ এবং সম্ভবত টপিটজিন, নির্ঘাত ঘেমে সারা হচ্ছে, যদি তারা ভেবে থাকে তাদের নির্দেশ অমান্য করে জিম্মিদেরকে খুন করে ফেলেছে সে। প্রচারণার স্বার্থে জিম্মিদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে ওরা।
নির্দেশের অপেক্ষায় থাকার দরকার কী। সবাইকে নিচে নিয়ে গিয়ে জাহাজটা ডুবিয়ে দিলেই তো হয়!
কাজটা নেহাৎই বোকামি হয়ে যাবে। ক্রুরা বেশির ভাগ ব্রিটিশ, সিনেটের একজন কর্মকর্তাও রয়েছেন। রয়েছে মিসরীয় ও মেক্সিকান নাগরিকরা। এতগুলো মানুষকে খুন করলে পরিণতি কী ঘটতে পারে ভেবে দেখেছেন? আমাদের খোঁজে সারা দুনিয়া চষে ফেলা হবে।
তাছাড়া উপায়ই বা কী! সাক্ষী রেখে খুন করার মধ্যে আমি নেই।
খাঁটি কথা, ভাবল সুলেমান আজিজ, আমিও নেই।
হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলল দরজা। নির্দেশ তাড়াতাড়ি এলে ভালো, প্রায় হুমকির সুরে বলল ম্যাকাডো। তা না হলে, আগেই বলে রাখছি, আমার লোকদের সামলে রাখা কঠিন হবে। এরই মধ্যে তারা মিশনের দায়িত্ব আমাকে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করেছে।
তাকে সমর্থন দিয়ে হাসল সুলেমান আজিজ। দুপুরের মধ্যে… আমাদের নেতারা যদি দুপুরের মধ্যে কোনো নির্দেশ না পাঠান, মিশনের কমান্ড আমি আপনার হাতে তুলে দেব।
সবেগে ঘুরে দাঁড়লো ম্যাকাডো। সন্দেহ আর অবিশ্বাসে বিস্ফারিত হয়ে উঠল তার চোখ। আমাকে কর্তৃত্ব দিয়ে আপনি সরে দাঁড়াবেন?
অসুবিধা কি? যে কাজে পাঠানো হয়েছে তা আমি শেষ করেছি। বাকি আছে শুধু ছোট্ট একটা কাজ-প্রেসিডেন্ট হাসান আর হে’লা কামিলের ব্যবস্থা করা। সর্বশেষ ঝামেলাটা খুশি মনে আপনার কাঁধে তুলে দিতে পারি আমি।
হঠাৎ করে খোদ শয়তানের হাসিতে কদাকার হয়ে উঠল ম্যাকাডোর চেহারা। এই প্রতিশ্রুতি আপনাকে আমি রক্ষা করতে বাধ্য করব, মিসরীর বন্ধু। তখন সম্ভবত মুখোশের আড়ালে মুখটা দেখার সুযোগ হবে আমার।
কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল সে।
দরজাটা ক্লিক শব্দে বন্ধ হবার সাথে সাথে কোটের ভেতর থেকে মিনিয়েচর রেডিওটা বের করল সুলেমান আজিজ। সুইচ অন করে বলল, ইবনে?
ইয়েস, সুলেমান আজিজ, হযরত।
তোমার লোকেশন?
জাহাজের পেছন দিকে আছি, জনাব।
তীরে কজন?
পুরনো খনির জেটিতে ছজনকে পাঠিয়েছি। জাহাজে আছি পনেরোজন, আপনাকে নিয়ে, হযরত। যেতে সময় লাগছে। বোটে একেক বারে তিনজন যেতে পারে। আটজনের রাবারের নৌকাটা এমনভাবে চেরা হয়েছে, মেরামত করা যাবে না।
স্যাবোটাজ?
অবশই, হযরত ম্যাকাডো বাহিনীর কাজ।
আরো কোনো সমস্যা?
এখনও দেখছি না। ঠাণ্ডার ভয়ে বাইরের ডেকে ওরা কেউ বেরোচ্ছে না। বেশির ভাগ লাউঞ্জে বসে হুইস্কি খাচ্ছে। বাকিরা ঘুমিয়ে। বন্ধু হতে বলে কাজের কাজ করেছেন, জনাব। শৃঙ্খলা বলতে কিছুই নেই ওদের মধ্যে।
