মডেলটার ওপর একটা হাত বুলালো ক্লেইটন ফিনলে। পাথুরে একটা এলাকার কথা কল্পনা করুন, উঁচু অংশগুলোর বরফ ঢাকা, আসল ছবিটা পেয়ে যাবেন।
ধন্যবাদ, মি. ফিনলে, বলল কর্নেল হোলিস। আমরা সবাই আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ।
ঠিক আছে, কাজে নামা যাক। এয়ার-ড্রপ ফোর্সের নেতৃত্ব দেবে। জন ডিলিঞ্জারের ডাইভ টীমের কমান্ডে থাকব আমি। সদস্যদের চেহারায় চোখ বুলানোর জন্য থামল হোলিস। সবাই একহারা গড়নের, মেদ নেই এক ছটাক, লোহার মতো শক্ত পেশি। সবার পরনে কালো পোশাক। ওরা যে ট্রেনিং পেয়েছে, এত কঠিন ট্রেনিং আর কোনো দল পায়নি পৃথিবীর কোথাও। এদের প্রত্যেককে নিয়ে গর্বিত কর্নেল। রাতের অন্ধকারে কীভাবে একটা জাহাজ দখল করতে হয়, সে ট্রেনিং নেয়া আছে আমাদের। তবে, আলোচ্যক্ষেত্রে শত্রুরা অনেক সুবিধা ভোগ করছে। ক্রিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স ইনফরমেশনের অভাব রয়েছে আমাদের, আবহাওয়া অনুকূল নয়, এমন একটা গ্লেসিয়ারের সামনে দাঁড়াতে হবে যেটা যেকোনো মুহূর্তে বসে পড়তে পারে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হামলা শুরু করব আমরা, তার আগে কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলে ভালো হয়। জন ডিলিঞ্জার, শুরু করো।
সাথে সাথে ফিনলের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল জন ডিলিঞ্জার, দ্বীপে লোকবসতি?
খনি বন্ধ ঘোষণার পর একজনও নেই।
আবহাওয়ার অবস্থা?
প্রায় সারাক্ষণ বৃষ্টি পড়ছে। সূর্য দেখতে পাওয়া ভাগ্যের কথা। বছরের এই সময়টায় তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কয়েক ডিগ্রী নিচে। তীব্র বাতাস বইছে প্রতি মুহূর্তে, মাঝেমধ্যে ঝড়কেও হার মানায়।
কর্নেলের দিকে গম্ভীর চেহারা নিয়ে তাকাল জন ডিলিঞ্জার। নির্দিষ্ট জায়গায় রাতের বেলা এয়ার-ড্রপ সম্ভব নয়।
মিনি কপ্টার নিয়ে যাব আমরা, রশি বেয়ে নামব।
আপনারা হেলিকপ্টার নিয়ে এসেছেন? সবিস্ময়ে জানতে চাইল রুডি। কিন্তু স্পিড আর রেঞ্জ কি নাগাল পাবে?
ওগুলোর সামরিক নাম এত বড় যে মুখস্ত করা ভারি কঠিন, বলল কর্নেল আমরা বলি, ক্যারিয়ার পিজিয়ন। ছোট একটা খাঁচা, পাইলট ছাড়া খুব বেশি হলে আরও দু’জনকে বহন করা যায়। সাথে ইনফ্রাবেড় গম্বুজ আছে, আর আছে সাইলেন্সড টেইল রোটরস। খুলে আবার জোড়া লাগাতে মাত্র পনেরো মিনিট লাগে-হ্যাঁ, আমি একটা পোর্টেবল হেলিকপ্টারের কথাই বলছি। আমাদের সি-১৪০ ছটা বইতে পারে।
আপনাদের আরও একটা সমস্যা আছে, বলল পিট।
বলুন।
এয়ারক্রাফট আসছে কি না দেখার জন্য লেডি ফ্ল্যামবোরোর রাডার চালু রাখতে পারে হাইজ্যাকাররা। আপার ক্যারিয়ার পিজিয়ন নিচু দিয়ে উড়তে পারে জানি, তবু স্ক্রিনে ওগুলোকে দেখার পর আন্তরিক অভ্যর্থনা জানাবার জন্য যথেষ্ট সময় পাবে তারা প্রস্তুতির।
হেলিকপ্টার বাদ, হতাশ গলায় বলল জন ডিলিঞ্জার।
খাড়ি থেকে যদি হামলা করি অসুবিধা কী? ফিনলেকে জিজ্ঞেস করল কর্নেল।
অসুবিধা নয়, সুবিধা-ফ্রস্ট স্মোক।
ফ্রস্ট স্মোক?
কুয়াশার মতো মেঘ। গ্লেসিয়ার ওয়ালের কাছে পানি তত ঠাণ্ডা নয়, হিম বাতাস ওই পানির সংস্পর্শে এল জিনিসটা উঠে আসে। দুই থেকে দশ মিটার পর্যন্ত ওঠে। তার সাথে থাকে বৃষ্টি, ফলে আপনার ডাইভ দল রওনা হবার মুহূর্ত থেকে আড়াল পাবে, ডেকে পৌঁছুনো পর্যন্ত।
চিন্তিতভাবে গাল চুলকাল কর্নেল। এযার-ড্রপ ফাঁস হয়ে গেলে মারা পড়বে সবাই। বিস্ময়ের ধাক্কা দিতে না পারলে বিশজন লোকের ডাইভ টিমের পক্ষে কোন রকম ব্যাকআপ ছাড়া চল্লিশজন আতঙ্কবাদীদের সাথে পেরে ওঠা কঠিন হবে।
প্যারাস্যুট নিয়ে জাহাজে নামতে যাওয়া যদি আত্মহত্যা হয়, বলল পিট, আপনারা গ্লেসিয়ারের আরও ওপরে কোথাও নামছেন না কেন? ওখান থেকে কিনারায় চলে আসবেন, তারপর রশি ধরে নামবেন মেইন ডেকে।
চিন্তাটা আমার মাথায় এসেছে, বলল কর্নেল। মি. পিটের প্রস্তাবে কেউ কোনো বাধা দেখতে পাচ্ছেন?
গ্লেসিয়ারটাই আপনাদের সবচেয়ে বড় বিপদ, বলল রুডি। ওটার গায়ে বরফ চাকা অসংখ্য ফাটল বা গর্ত থাকতে পারে, থাকতে পারে নরম তুষার, পা ফেললেই নেমে যাবেন গভীরে। অন্ধকার, কাজেই সাবধানে এগোতে হবে।
আর কেউ কিছু বলবেন? কেউ কিছু বলল না। মেজের ডিলিঞ্জারের দিকে ফিরল কর্নেল। এয়ার-ড্রপের হামলা করতে কতক্ষণ সময় নেবে তোমরা?
বাতাসের তীব্রতা আর কোনো দিকে বইছে জানতে পারলে হিসাবে করতে সুবিধা হতো।
দশ দিনের মধ্যে নয় দিনই দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আসে বাতাস, জবাব দিল ফিনলে। বোজা চোখে রাতের দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করল সে।
গ্লেসিয়ারের পেছনে খাড়া হয়ে থাকা ছোট পাহাড়গুলোর দিকে তাকাল জন ডিলিঞ্জার। আধবোজা চোখে রাতের দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করল সে, আন্দাজ করল বাতাসের তীব্রতা। কর্নেলের দিকে তাকাল সে, বলল, এয়ার-ড্রপের পর চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় নেব হামলা করতে।
ভাববেন না আপনাকে কাজ শেখাচ্ছি, বলল পিট। তবে, সময়টা আপনি খুব কমিয়ে ধরছেন।
আমি একমত, সায় দিল ফিনলে। গ্লেসিয়ারটার ওপর কয়েকবার হেঁটেছি আমি। আইস রিজ থাকায় এগোনো খুব কঠিন।
চোখের পলকে কোমরের খাপ থেকে লম্বা একটা ছুরি বের করল জন ডিলিঞ্জার, ফলাটা বাঁকা, মাথার দিকটা সরু। মডেলের ওপর সেটাকে পয়েন্টার হিসেবে ব্যবহার করল সে। গ্লেসিয়ারের ডানে, পাহাড়ের পেছন দিকে নামব আমরা। তাহলে আমাদের সি-১৪০ জাহাজের রাডারে ধরা পড়বে না। ধরে নিচ্ছি বাতাসের সাধারণ প্যাটার্ন বদলাবে না, প্যারাস্যুট নিয়ে পাহাড় ঘুরে উড়ে যাব সাত কিলোমিটার, গ্লেসিয়ারের সামনের পাঁচিল থেকে খুব বেশি হলে এক কিলোমিটার দূরে নামবো। জাম্প করার পর নিচে নেমে একত্রিত হওয়া পর্যন্ত আঠারো মিনিট ধরেছি আমি। গ্লেসিয়ারের কিনারা পর্যন্ত হাঁটব, আরও বিশ মিনিট। হামলা করার জন্য প্রস্তুতি নিতে আরও ছয় মিনিট। সব মিলিয়ে চুয়াল্লিশ মিনিট।
