দরকার ও তো নেই, বলল পিট। রাজি কি না বলুন।
একটা প্লেন আপনাদেরকে জাহাজ থেকে দশ কিলোমিটারে মধ্যে পৌঁছে দেবে। দশ কিলোমিটারের বেশি নয়, কারণ তাহলে সন্ত্রাসবাদীদের আমরা বিস্ময়ের ধাক্কা দিতে পারব না। ওখান থেকে আপনাদেরকে পায়ে হেঁটে যেতে হবে। ভাগ্য আমাকে সহায়তা করলে, পৌঁছে দেখবেন নাটক শেষ হয়ে গেছে।
রাজি, বলল পিট।
পিছিয়ে গেল কর্নেল, ঝট করে দিকে তাকাল। আমার সেকেন্ড ইন কমান্ডকে মুক্তি দিলে কৃতজ্ঞ বোধ করব। তরপর আবার সে পিটের দিকে ফিরল। আমরা রওনা হচ্ছি, এখনই। জেনে রাখুন, আমাদের সাথে রওনা না হলে, আপনাদের যাওয়া হচ্ছে না। কারণ, আমি কমান্ড এয়ারক্রাফটে চড়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে গোটা অ্যাসল্ট দল আকাশে উঠে যাবে।
আমি আপনার পেছনে থাকছি, অটোমেটিকটা হোলস্টারে রেখে বলল পিট।
আমিও থাকছি মেজরের পেছনে, বলল জিওর্দিনো, ডিলিঞ্জারের পিঠ চাপড়ে দিল সে। বুদ্ধিমান লোক এক রাস্তায় চলে।
তার দিকে অগ্নিদৃষ্টি হানল জন ডিলিঞ্জার। তোমার বুদ্ধি নর্দমায় পচে মরুক!
পনেরো সেকেন্ডের মধ্যে খালি হয়ে গেল কামরাটা। নিজের কেবিনে ফিরে গিয়ে একটা ব্যাগ নিল পিট, ব্রিজে এসে কথা বলল স্কিপারের সাথে। সান্তা ইনেজে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে সাউন্ডারের?
চার্টরুমে ঢুকে দ্রুত একট হিসেবে করল স্কিপার। গ্লেসিয়ারে কাছাকাছি পৌঁছাতে সময় নেব আমরা নয় কী দশ ঘণ্টা।
তাহলে পৌঁছান, নির্দেশ দিল পিট। ভোরের দিকে আমরা আপনাকে খুঁজব।
পিটের সাথে করমর্দন করল স্কিপার। সাবধানে থাকবেন।
রাইট।
ব্রিজ কাউন্টার টপকে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল জাহাজের একজন বিজ্ঞানী। লোকটা কালো, মাঝারি আকৃতি, থমথমে গম্ভীর ভাবটুকু মুখে যেন খোদাই করা। লোকটার নাম ক্লেইটন ফিনলে, কথা বলল স্বভাবসুলভ কর্কশ সুরে, আড়াল থেকে শোনার জন্য দুঃখিত। তবে শুনতে আমি ভুল করিনি, আপনারা সান্তা ইনেজ দ্বীপের কথা বলছিলেন।
হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?
গ্লেসিয়ারের কাছে পুরনো একটা দস্তার খনি আছে। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হওয়ায় চিলি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে খনিটা।
আগ্রহ প্রকাশ করল পিট, দ্বীপটা সম্পর্কে আপনি জানেন?
মাথা ঝাঁকাল ক্লেইটন।
আরিজোনা মাইনিং কোম্পানির চিফ জিওলজিস্ট ছিলাম না আমি। ওরা ভেবেছিল, কম খরচে সারাতে পারলে খনিটা থেকে লাভ করা যায়। দু’জন ইঞ্জিনিয়ারের সাথে সার্ভে করতে পাঠানো হয় আমাকে। নরকটায় তিন মাস ছিলাম। দস্তার মান ভালো নয়। আমরা নিরাশ হয়ে চলে আসার পর খনিটা পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
রাইফেলে হাত কেমন?
শিকারে গিয়ে একেবারে খালি হাতে কখনও ফিরিনি।
তার বাহু চেপে ধরল পিট। ফিনলে, বন্ধু, তোমাকেই আমি খুঁজছিলাম।
.
৫২.
নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করে দেখল কেইটন ফিনলে।
খালি একটা অয়্যার হাউসে অ্যাসল্ট দলকে ব্রিফ করছে হোলিস, আরেক দিকে বাকি তিনজন ফিনলেকে সাহায্য করছে সান্তা ইনেজ দ্বীপের একটা মডেল তৈরি কাজে। এয়ারপোর্ট রানওয়ের পাশের মাছ থেকে কাদা সংগ্রহ করা হয়েছে, রং যোগাড় করেছে কর্নেলের একজন লোক। পুরনো একটা পিং-পিং টেবিলের ওপর তৈরি হলো মডেলটা। পিটের নটিক্যাল চার্ট দেখে দ্বীপটার ভুলে যাওয়া অংশগুলো চিনে নিল ফিনলে।
পোর্টেবল একটা হিটারের সাহায্যে মডেলটা শুকিয়ে শক্ত করে নেয়া হলো, তারপর রং চড়াল ফিনলে-পাথুরে এলাকায় দেয়া হলো বাদামি, গ্লেসিয়ারের বরফ আর তুষার বোঝবার জন্য ব্যবহার করা হলো সাদা। গ্লেসিয়ারের গোড়ায় এমনকি লেডি ফ্ল্যামবোরোও তৈরি করল সে। কাজ শেষ করে এক পা পিছাল, তাকিয়ে থাকল একদৃষ্টে।
দল নিয়ে টেবিলে সামনে চলে এল কর্নেল হোলিস। এক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
দ্বীপটার হাতা-মাথা ঠাওর করা মুশকিল। তীররেখা অসম্ভব উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা চার চোখা। খাড়িগুলো দুর্গম, মুখ ব্যাদান সেগুলো। দ্বীপটা পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা, পশ্চিম দিকে প্রশান্ত মহাসাগর। অনুর্বর, মৃত একটা দ্বীপ। পঁচানব্বই কিলোমিটার লম্বা, চওড়ায় পঁয়ষট্টি কিলোমিটার, মাউন্ট হোয়ার্টন পর্বত এক হাজার তিনশো বিশ মিটার উঁচু।
সৈকত বা সমতল ভূমি নেই বললেই চলে। নিচু পাহাড়গুলো পাথুরে জাহজের মতো দেখতে, খাড়া চালগুলো যেন আহত কুমিরের পিঠ, যন্ত্রণাকাতর অস্থিরতার সাথে ঠাণ্ডা সাগরে নামছে।
দ্বীপটা যেন গোড়া, আর প্রাচীন গ্লেসিয়ারটা যেন ঘোড়ার পিঠে জিন। গরমের দিনে আকাশে মেঘ থাকায় আবহাওয়া ছিল ঠাণ্ডা, বরফ গলেনি, তাই এ রকম দেখাচ্ছে। জমাট বরফের দুদিকে মরিয়া হয়ে মাথাচাড়া দিয়েছে কঠিন পাথর, মাঝখান দিয়ে সাগরের দিকে পথ করে নিয়েছে গ্লেসিয়ার, পানিতে নামার আগে আকৃতি পেয়েছে ফালি করা মাংসের লম্বা টুকরোর মতো।
এমন ভয়াল দর্শন এলাকা খুব কমই আছে পৃথিবীতে। গোটা ম্যাগেলান দ্বীপপুঞ্জে স্থায়ীভাবে কোনো মানুষ বাস করে না। কয়েকশো বছর ধরে বহুজন দ্বীপটায় এসেছে, ফিরে গেছে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে, পেছনে রেখে গেছে নিন্দাসূচক সব নাম-ঘাড় ভাঙা পেনিনসুলা, প্রতারক দ্বীপ, দুর্যোগ বে, জনশূন্য আইল, দুর্ভিক্ষের বন্দর। বরফ আর পাথর ছাড়া কিছুই নেই দ্বীপটায়, সবুজের চিহ্ন বলতে কোনো রকমে টিকে যাওয়া কুৎসিত দর্শন কিছু ঝোঁপ।
