পিটের হাসি দেখে মনে হলো, যেন মোটা টাকার লটারির জিতেছে। রুডির সাথে শতকরা একশো ভাগ একমত আমি।
হেয়ালি আমার একদম পছন্দ নয়, চটে উঠে বলল কর্নেল হোলিস। সহজ ভাষায় কেউ ব্যাখ্যা করবেন, প্লিজ?
এর মধ্যে জটিল কিছু নেই-লেডি ফ্ল্যামবোরা অ্যান্টার্কটিকায় ঢোকেনি।
অ্যান্টার্কটিকায় ঢোকেনি, যন্ত্রচালিতের মতো পুনরাবৃত্তি করল কর্নেল। তথ্য প্রমাণ তত তা-ই বলে। স্যাটেলাইটের শেষ ফটোতে দেখা গেছে, পেনিনসুলার ডগা আর কেপ হর্নের মাঝখানে রয়েছে লেডি ফ্ল্যামবোরো, ছুটছে দক্ষিণ দিকে। আর আপনি বলছেন…
আর কোনো দিকে যাবার জায়গাও তো নেই জাহাজটার, ডিলিঞ্জারের গলাতেও প্রতিবাদের সুর।
ম্যাগেলান প্রণালীর চারদিকে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপগুলোর ওপর একটা আঙুল বুলালো পিট! বাজি ধরতে চান?
ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকল কর্নেল হোলিস, মুহূর্তের জন্য হতভম্ব। তারপর সে উপলব্ধি করল। ওহ, গড! বুঝেছি! ফেরত এসেছে লেডি ফ্ল্যামবোয়রা!
রুডির কথাই ঠিক, স্বীকার করল পিট। হাইজ্যাকাররা আত্মহত্যা করবে না, ইনফ্রারেড ফটোয় ধরা পড়ার ঝুঁকি নিতেও তারা রাজি নয়। আইসপ্যাকে ঢোকার কোনো ইচ্ছেই তাদের ছিল না। তার বদলে তারা উত্তর-পশ্চিম দিকে গেছে, ব্যারেন আইল্যান্ড ঘুরে…
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলে রুডি বলল, টিয়েরা ডেল ফুগোর চারদিকে তাপমাত্রা ভয়াবহ কিছু নয়। উত্তাপের ব্যবস্থা না থাকায় জাহাজের সবাই ভুগবে, তবে কেউ মারা যাবে না।
আইসবার্গ আইসবার্গ খেলাটা তাহলে কী জন্য? জানতে চাইল জিওর্দিনো।
নিজেদেরকে গ্লেসিয়ার থেকে বিচ্ছিন্ন একটা অংশ বলে চালাবার জন্য।
ইনফ্রারেড ফটোর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকল জিওর্দিনো। এত দক্ষিণে গ্লেসিয়ার?
আমরা পাল্টা অ্যারেনাসের যেখানে নোঙর ফেলেছি, সেখান থেকে আটশো কিলোমিটার দূরে কয়েকটা প্রবাহ পাহাড় থেকে নেমে সাগরে পড়েছে, জানাল পিট।
লেডি ফ্ল্যামবোরো কোথায় আছে বলে আপনার ধারণা? জিজ্ঞেস করল কর্নেল।
টেবিল থেকে একটা চার্ট তুলে নিল পিট, টিয়েরা ডেল ফুগোর পশ্চিমে নিঃসঙ্গ কয়েকটা দ্বীপ দেখানো হয়েছে ওটায়। দুটো সম্ভাবনার কথা ভাবছি আমি, বলল ও। স্যাটেলাইট ফটোয় জাহাজটাকে শেষবার কোথায় দেখা গেছে আমরা জানি, তার সাথে পাল-তোলা দূরত্বের হিসাব ধরলে…, চার্টের গায়ে দুটো নামের পাশে ক্রস চিহ্ন আঁকার জন্য থামল ও। …এখান থেকে সরাসরি দক্ষিণে, মাউন্টস ইটালিয়া ও সারমিন্টো গ্লেসিয়ার প্রবাহ।
তার মানে প্রচলিত পানিপথ থেকে দূরে…, বলল কর্নেল, তার কথা শেষ হবার আগেই পিট কথা বলল।
তবে তেল খনিগুলোর কাছাকাছি। কোম্পানির সার্ভে প্লেনগুলো বরফের ছদ্ম আবরণ দেখে ফেললে অবাক হবার কিছু নেই। আমি যদি সন্ত্রাসবাদীদের নেতা হতাম, আরও একশো ষাট কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সরে যেতাম। তাহলে সান্টা ইনেজ দ্বীপে একটা গ্লেসিয়ারের কাছে থাকত ওরা।
চার্টটা টেনে নিল জন ডিলিঞ্জার। দ্বীপটা ছোট, আঁকাবাঁকা তীররেখার ওপর চোখ বুলালো সে। তারপর কালার ফটোটার দিকে তাকাল, চিলির দক্ষিণ প্রান্তের নিচের অংশ ঢাকা পড়ে আছে মেঘে। সেটা সরিয়ে রেখে ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে পরীক্ষা করল ইনফ্রারেড ইমেজের ওপরের অংশটুকু, ইমেজটা ভাঁজ করে তল্লাশি এলাকা আগেই ছোট করে দিয়েছে পিট।
কয়েক সেকেন্ড পর চেহারায় মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে চোখ তুলল সে। প্রকৃতি দেবী যদি চোখা বো আর গোল পাছাসহ আইসবার্গ তৈরি করে না থাকে, তাহলে ধারণা করি, আমরা আমাদের ছলনাময়ী লেডি ফ্ল্যামবোরোকে খুঁজে পেয়েছি।
মেজরের হাত থেকে গ্লাসটা নিল কর্নেল, আয়ত আকৃতিটা পরীক্ষা করল খুঁটিয়ে। নকশাটা যে মিলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর. মি. পিট যেমন বলেছেন, র্যাডিয়েশনের কোনো আভাসও দেখছি না। রিডিংয়ে দেখা যাচ্ছে গ্লেসিয়ারের মতোই ঠাণ্ডা ওটা। একেবারে নিখুঁত কালো না হলেও, অত্যন্ত গাঢ় নীল।
আরও একটু ঝুঁকল রুডি। হ্যাঁ, আমিও দেখতে পাচ্ছি। দুএকটা মাঝারি আকৃতির আইসবার্গ দেখা যাচ্ছে, ভেঙে বেরিয়ে এসেছে গ্লেসিয়ার দেয়াল থেকে। গ্লাসের ভেতর চোখে বিস্ময়ে ফুটে উঠল। আশ্চর্য, লেডি ফ্ল্যামবোরোকে গ্লেসিয়ারের সামনের পাঁচিলের সরাসরি নিচে কেন রেখেছে ওরা?
ছোট হয়ে গেল পিটের চোখ। সরো, দেখতে আমাকে। জন ডিলিঞ্জার, রুডির মাঝখানে ঢুকে পড়ল ও, সামনের দিকে ঝুঁকল, চোখ রাখল গ্লাসে। খানিক পর সিধে হলো, সমস্ত রক্ত যেন এক নিমেষে মুখে উঠে এল।
কী দেখলেন? জানতে চাইল স্কিপার।
সাইকে ওরা মেরে ফেলার বুদ্ধি করেছে।
বাকি সবার দিকে তাকাল স্কিপার, হতভম্ব। উনি জানলেন কীভাবে?
গ্লেসিয়ারের একটা টুকরো ভেঙে যদি জাহাজের ওপর পড়ে, শুকনো গলায় ব্যাখ্যা করল জিওর্দিনো, ওটার চাপে তালিয়ে যাবে লেডি ফ্ল্যামবোরো, তলার সাথে বাড়ি খেয়ে খুঁড়িয়ে যাবে। কোনো দিনই ওটার আর হদিশ পাওয়া যাবে না।
পিটের দিকে কঠিন চোখে তাকাল জন ডিলিঞ্জার। এত দিন সুযোগ পেল, প্যাসেঞ্জার বা ক্রুদের খুন করল না, আর আপনি বলছেন এখন তারা সবাইকে মেরে ফেলবে?
হ্যাঁ, ফেলবে।
তাহলে আগে কেন ফেলেনি?
ওদের পালিয়ে বেড়ানোর একটাই কারণ, সময় নষ্ট করা। হাইজ্যাকিং-এর নির্দেশ যেই দিয়ে থাকুক, প্রেসিডেন্ট দু’জনকে বাঁচিয়ে রাখার দরকার ছিল তার। দরকারটা কী, তা বলতে পারব না….।
