মনে রেখো, বলল রুডি, অ্যান্টার্কটিকের আইসবার্গ সাধারণত সমতল হয়। সুপারস্ট্রাকচারের ওপর প্লাস্টিক থাকলেও, জাহাজটা দেখতে হবে গা-ঘেঁষা কয়েকটা ছোট-বড় পিরামিডের সমষ্টি।
ম্যাগনিফাইং গ্লাসের ভেতর মেজর ডিলিঞ্জারের চোখ চারগুণ বড় দেখল। মেঘ না থাকলে ভালো হতো, বিড়বিড় করল সে।
সাউন্ডারের কমিউনিকেশন কমপার্টমেন্টে রয়েছে ওরা, ঘিরে দাঁড়িয়েছে ছোট্ট একটা টেবিলকে, ক্যাসপার থেকে তোলা বিশাল কালার ফটোটা পরীক্ষা করছে সবাই। প্লেনটা ল্যান্ড করার চল্লিশ মিনিট পর সার্ভে জাহাজের লেয়ার রিসিভারের মাধ্যমে এরিয়াল রিকাইসন্স ফিল্ম প্রসেস করে পাঠানো হয়েছে।
বিশদ বিবরণসহ ফটোয় দেখা যাচ্ছে পেনিনসুলার পূর্ণ দিক, লারসেন আইস শেলফ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে আইসবার্গের একটা সাগর। পশ্চিম দিকেও কয়েকমা আইসবার্গ দেখা যাচ্ছে, গ্লেসিয়ারের কাছাকাছি, গ্রাহাম ল্যান্ডের খানিক সামনে।
পিটের ধ্যান অন্যদিকে। একধারে,সবার কাছ থেকে দূরে বসে আছে ও, কোলের ওপর বড় একটা নটিক্যাল চার্ট! মাঝেমধ্যে চোখ তুলে ওদের দিকে তাকাচ্ছে, শুনছে, কিন্তু আলোচনার যোগ দিচ্ছে না।
স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্টের দিকে তাকাল কর্নেল হোলিস, মাইক্রোফোনের সাথে জোড়া লাগানো একটা হেডসেট পরে রিসিভারের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। ক্যাসপারের ইনফ্রারেড ফটো কখন আমরা পেতে পারি?
হাত তুলে চুপ থাকার অনুরোধ জানাল ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট, হেডসেট আরও জোরে চেপে ধরল কানের সাথে, সি.আই.এ. হেডকোয়ার্টার ওয়াশিংটন থেকে ভেসে আসা ভারী একটা কণ্ঠস্বর মনোযোগ দিয়ে শুনতে চেষ্টা করছে। কয়েক সেকেন্ড পর জবাব দিল সে, ল্যাংলি ফটো ল্যাব জানাল, আধ মিনিটের মধ্যে ট্রান্সমিশন শুরু করবে ওরা।
অস্থিরভাবে পায়চারি আরম্ভ করল কর্নেল। পিটের দিকে তাকাল একবার, একজোড়া ডিভাইডার নিয়ে দূরত্ব মাপছে ও।
জাহাজের আর সব লোকের কাছ থেকে গত কয়েক ঘণ্টায় পিটের কথা অনেক কিছু জানতে পেরেছে কর্নেল। লোকজন ওর সম্পর্কে এমন সুরে কথা বলে, ও যেন একটা বিশেষ কিছু।
আসছে, জানাল স্কিপার। হেডসেট খুলে ধৈর্যের সাথে অপেক্ষায় থাকল সে, খবরের কাগজ আকারের একটা ফটো বেরিয়ে এল রিসিভার থেকে।
সাথে সাথে টেবিলে বিছানো হলো সেটা। সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ল, চোখ পেনিনসুলার ওপর দিকে, তীররেখা বরাবর।
কালো শীতলতম আবহাওয়ার প্রতিনিধিত্ব করছে, ব্যাখ্যা করল স্কিপার। গাঢ় নীল, হালকা নীল, সবুজ, হলুদ আর লাল ক্রমশ বেশি উত্তাপের লক্ষণ প্রকাশ করছে। সাদা মানে ওখানে তাপের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
লেডি ফ্ল্যামবোরো থেকে কি রিডিং আশা করতে পারি আমরা? ডিলিঞ্জারের প্রশ্ন।
ওপরের দিকে কোথাও, হলুদ আর লালের মাঝখানে কিছু হবে।
গাঢ় নীলের কাছাকাছি, মৌত ভাঙল পিট।
সবাই ওর দিকে এমনভাবে তাকাল, ও যেন দাবা প্রতিযোগিতার উত্তেজনাকর মুহূর্তে হাঁচি দিয়েছে।
তা যদি হয়, ফটোয় আমরা জাহাজটাকে দেখতেই পাব না, প্রতিবাদের সুরে বলল কর্নেল।
রেডক্লিফ তর্ক করল, ইঞ্জিন আর জেনারেটর থেকে হিট র্যাডিয়েশন ধরা পড়তে বাধ্য, সবুজ মাঠে গলফ বলের মতো পরিষ্কার দেখতে পাবার কথা জাহাজটাকে।
ইঞ্জিন বন্ধ থাকলে?
চেহারায় অবিশ্বাস নিয়ে জন ডিলিঞ্জার জিজ্ঞেস করল, আপনি নিশ্চয়ই একটা মরা-জাহাজ-এর কথা বলছেন না?
নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকাল পিট। সবার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল ও, ওদেরকে ভিজে চাদর দিয়ে ঢেকে দিলেও এমন অস্বস্থি বোধ করত কি না সন্দেহ। তারপর বলল, সন্ত্রাসবাদীদের নেতাকে ছোট করে দেখলে ভুল করব আমরা।
ওরা পাঁচজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, তারপর একযোগে ফিরল পিটের দিকে ব্যাখ্যা পাবার আশায়।
নটিক্যাল চার্ট এক পাশে সরিয়ে রেখে চেয়ার ছাড়ল পিট। হেঁটে চলে এল টেবিলের কাছে, ইনফ্রারেড ফটোটা নিয়ে দুই ভাঁজ করল, এখন সেটায় শুধু চিলির নিচের অংশটা দেখা যাচ্ছে। কেউ লক্ষ করেনি, জিজ্ঞেস করল ও, যখনই জাহাজটা কোর্স বদলেছে বা চেহারা পাল্টেছে, তার মাত্র খানিক আগে কোনো না কোনো একটা স্যাটেলাইট চলে গেছে মাথার ওপর দিয়ে?
এ থেকে বোঝা যায়, সন্ত্রাসবাদীদের প্ল্যানে কোনো ফাঁক নেই, বলল রুডি। সায়েন্টিফিক তথ্য সংগ্রহকারী স্যাটেলাইটগুলোর কক্ষপথ সম্পর্কে অর্ধেক দুনিয়া জানে। ওরাও তথ্যটা জোগাড় করেছে।
বেশ হাইজ্যাকাররা জানল, কখন তাদের দিকে স্যাটেলাইট ক্যামেরা তাক করা হবে, অস্থির গলায় বলল কর্নেল। তাতে কী?
তাতে করে ইনফ্রারেড ফটো তোলার সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে সে, পাওয়ার সাপ্লাই স্থগিত রেখে। প্লাস্টিকের ওপর বরফের স্তর জমেছে, পাওয়ার সাপ্লাই বন্ধ থাকায় তা-ও গলছে না।
পাঁচজনের মধ্যে চারজনের মনে হলো পিটের যুক্তি মেনে নেয়া যায়। মানল না। একা শুধু রুডি। আর কারও আগে তার চোখেই ত্রুটিগুলো ধরা পড়ল। তুমি পেনিনসুলার চারদিকে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রার কথা ভুলে যাচ্ছ, পিট। নো পাওয়ার, নো হিট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জাহাজের সবাই নিরেট বরফে পরিণত হবে। তোমার কথা সত্যি হলে, ধরে নিতে হবে হাইজ্যাকাররা জিম্মিদের খুন করার সাথে সাথে নিজেরাও আত্মহত্যা করছে।
রুডির কথায় যুক্তি আছে, বলল জিওর্দিনো। উপযুক্ত কাপড়-চোপড় আর অন্তত খানিকটা উত্তাপ না পেলে কেউ ওরা বাঁচবে না।
