মুখোশ পরা সুলেমান আজিজের চোখ দুটোর ওপর দৃষ্টি স্থির রাখলেন ক্যাপটেন কলিন্স। সন্ত্রাসবাদীদের নেতা লোকটার চোখে পশুসুলভ কি যেন একটা আছে। আকৃতিটা মানুষেরই বটে, কিন্তু যার চোখ থেকে অশুভ আভা বেরোয় তার ভেতর মানবিক কোনো গুণ থাকতে পারে না।
আমাকে জানতে হবে, আপনি কখন আমার জাহাজ ছেড়ে যাবেন? তীক্ষ্ণ কণ্ঠে দাবি জানালেন তিনি।
পিরিচ চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল সুলেমান আজিজ, আলতোভাবে ঠোঁটে ন্যাপকিন ছোঁয়াল, তারপর নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকাল ক্যাপটেনের দিকে। আপনাকে চা পান করার পর কথা বলতে পারি?
প্রথমে আমার প্যাসেঞ্জার আর ক্রুদের অফার করতে হবে, শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন কলিন্স। সাদা ইউনিফর্ম পরে আছেন তিনি, শিরদাঁড়া টান টান, প্রচণ্ড শীত বা ঠাণ্ডা হিম বাতাস তাঁকে কাবু করতে পারেনি।
ঠিক একই উত্তরই আমি আপনার কাছ থেকে আশা করেছিলাম। খালি কাপটা উল্টো করে রাখল সুলেমান আজিজ। আপনি একজন দরদি ক্যাপটেন। শুনে খুশি হবেন, কাল সন্ধ্যের দিকে কোনো একসময় আমরা চলে যাব। যদি কথা দেন, আমরা বিদায় নেয়ার আগে আপনারা কোনো রকম বোকামি করবেন না, মানে জাহাজ দখলের চেষ্টা করবেন না বা পালিয়ে কাছাকাছি তীরে যাবেন না, তাহলে আমিও কথা দেব, আপনাদের কারও কোনো ক্ষতি করা হবে।
আমি চাই এই মুহূর্তে জাহাজে হিটিং সিস্টেম চালু করা হোক, খেতে দেয়া হোক সবাইকে। গরম কাপড়ের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে আমার লোকজন। কয়েক দিন ধরে কেউ কিছু খায়নি। পাইপে জমে গেছে পানি। স্যানিটেশনের কথা নাই বা বললাম।
হাসল সুলেমান আজিজ। কষ্ট করলে আত্মা বিশুদ্ধ হয়।
ক্যাপটেনের দৃষ্টিতে আগুন ঝরল। আবর্জনা।
অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল সুলেমান আজিজ। দৃষ্টিভঙ্গির তফাত।
গুড গড, ম্যান, বিনা দোষে নিরীহ মানুষজন মারা যেতে বসেছে এখানে!
আরে, দূর! আপনি বাড়িয়ে বলছেন। দুচার দিন খেতে না পেলে মানুষ বুঝি মারা যায়? তাছাড়া, ঠাণ্ডা দেশের মানুষ আপনারা, শীতে মারা যাবেন, তা কি হয়। আমরা তো চলেই যাব কাল, খুব বেশি হলে আরও ত্রিশ ঘণ্টা একটু কষ্ট করতে হবে আপনাদের।
তার আগে যদি গ্লেসিয়ারটা ভেঙে পড়ে?
ভেঙে পড়বে কেন? দেখে তো নিরেট বলেই মনে হচ্ছে।
বিপদটা বুঝতে চেষ্টা করুন, আবেদনের সুরে বললেন ক্যাপটেন। যেকোনো মুহূর্তে বড় একটা অংশ ধসে পড়তে পারে। দশতলা ভবন একটা গাড়ির ওপর ভেঙে পড়লে যা হয়, লেডি ফ্ল্যামবোরোর সেই অবস্থা হবে। আপনারাও কেউ রক্ষা পাবেন না। প্লিজ-জাহাজটা সরিয়ে নিন।
ঝুঁকি আছে, মানলাম, কিন্তু ঝুঁকিটা এড়াবার কোনো উপায় নেই আমার। জাহাজ সরাতে গেলেই প্লাস্টিকের ওপর জমা বরফের প্রলেপ গলে যাবে, ফাঁস হয়ে যাবে আমাদের লোকেশন-স্যাটেলাইটের ইনফ্রারেড ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে আমাদের বিকিরিত তাপ।
হয় আপনি একটা গর্দভ, নয়তো উন্মাদ। রাগে চেঁচিয়ে উঠলেন কলিন্স। এতগুলো মানুষের প্রাণের ওপর ঝুঁকি নিয়ে কী আপনি অর্জন করতে চান? জিম্মিদের ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে টাকা চান? তাহলে সে-কথা জানাচ্ছে না কেন? স্বদেশি আতঙ্কবাদীদের কোথাও থেকে মুক্ত করতে চান? তা-ও তো বলছেন না। আমাদের ছেড়ে দিয়ে চলে যাবেন, তাহলে লাভটা কী হলো আপনার?
আপনার কৌতূহল ভারি অস্বস্তিকর, ক্যাপটেন। তবে, জাহাজটা হাইজ্যাক করার কারণ একটা অবশ্যই আছে, সময়মতো সেটা আপনি জানতেও পারবেন। ক্যাপটেনের পেছনে দাঁড়ানো গার্ডকে ইঙ্গিত করল সে। ক্যাপটেনকে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখো।
নিজের জায়গা ছেড়ে নড়লেন না কলিন্স! কেন আপনি গরম কফি, স্যুপ, চা। ইত্যাদিদিতে চাইছেন না?
আগেই পেছন ফিরেছে সুলেমান আজিজ, ডাইনিং সেলুন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সে। বিদায়, ক্যাপটেন। আমাদের আর দেখা হবে না।
সরাসরি কমিউনিকেশন রুমে চলে এল সুলেমান আজিজ। যান্ত্রিক গুঞ্জনের সাথে একটা টেলিটাইপ থেকে সর্বশেষ অয়্যার-সার্ভিস নিউজ বেরিয়ে আসছে, পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে ইবনে। সামনে রেডিও নিয়ে বসে রয়েছে অপারেটর, ইনকামিং ট্রান্সমিশন শুনছে, একটা ভয়েস রেকর্ডার কাগজে কপি করছে সেটা। রেডিও আর টেলিটাইপে শক্তি জোগাচ্ছে একটা পোর্টেবল জেনারেটর।
পায়ের আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ফেরাল ইবনে, সুলেমান আজিজকে দেখে শ্ৰদ্ধার সাথে সালাম দিল, টেলিটাইপ থেকে খুলে নিল লম্বা একটা কাগজ।
মিসরের খবর কী?
খুশি হবার মতো কিছু নয়। হাসানের মন্ত্রিসভা এখনও সরকার পরিচালনা করছে। গোঁয়ারের মতো এখনও ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছে তারা। দাঙ্গা থামাবার জন্য রাস্তায় সেনাবাহিনী না নামিয়ে সাংঘাতিক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে তারা। বড় ধরনের রক্তপাত ঘটেছে মাত্র এক জায়গায়। মোল্লারা ভুল করে একটা বাসে বোমা ছোড়ে, চল্লিশজন আলজেরিয়ান মারা গেছে, কায়রোয়। সবাই তারা ফায়ার সার্ভিসের লোক, একটা কনভেনশনে যোগ দিতে এসেছিল। মোল্লারা সন্দেহ করেছিল, বাসে পুলিশ আছে। এই ঘটনার পর কায়রো রেডিও থেকে প্রচার করা হয়েছে, ইয়াজিদের আন্দোলন দেশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে। আমাদের সাধারণ সমর্থকরাও ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারছে না। বিক্ষোভ মিছিলের সংখ্যা কমে যাবার সেটাও একটা কারণ। মন্ত্রিসভা বাতিল করার জন্য জনসাধারণের তরফ থেকে তেমন কোনো চাপ নেই।
