মাথা নেড়ে দ্বিমত পোষণ করলেন সিনেটর পিট। ভেতরে-বাইরে টেমপারেচার একই।
তর্কে সময় নষ্ট করতে চান না, সিটিংরুমের জানালার সামনে চলে এলেন তিনি। কাঁচের গায়ে টোকা দিলেন। ভোতা আওয়াজ শুনে বুঝলেন, যথেষ্ট পুরু। কারও আঙুলে হীরের আংটি আছে? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
রেইনকোটের পকেট থেকে হাত দুটো বের করে চোখের সমনে আঙুলগুলো তুললেন হে’লা কামিল। দুটো আংটি পরে আছেন তিনি, রিংয়ের সাথে পাথরও আছে, তবে সেগুলো দুধসাদা ওপাল আর নীলকান্তমণি। মুসলমান পাণিপ্রার্থীরা মূল্যবান উপহার দিয়ে মেয়েদের লোভী করে তুলতে রাজি নয়।
লালচে আঙুল থেকে নিজের আংটি খুলে নাদাভ হাসান বললেন, এটা তিন ক্যারেট, সিনেটর।
ম্লান আলোয় পাথরটা পরীক্ষা করলেন সিনেটর পিট। এতেই হবে। ধন্যবাদ, নাদাভ।
সাবধানে, যতটা সম্ভব দ্রুত কাজ করে গেলেন তিনি। নিঃশব্দে ছোট্ট একা গর্ত তৈরি করছেন কাঁচের গায়ে, যাতে আঙুল ঢুকতে পারে। হাতে ফুঁ দেয়ার জন্য খানিক পরপর থামতে হলো তাকে। আঙুলগুলো অসাড় হয়ে এলে বগলের নিচে ঢুকিয়ে গরম করে নিলেন।
ধরা পড়লে রা কি করবে তাঁকে নিয়ে? চিন্তাটা মাথায় বারকয়েক এল, ঝেড়ে ফেলে দিলেন সিনেটর পিট। তবু, অসতর্ক মুহূর্তে, নিজের লাশটা তিনি ভাসতে দেখলেন বরফ-জলে।
মাঝখানের ফুটোটার চারধারে একটা বৃত্তাকার রেখা তৈরি করলেন তিনি। রেখাটাকে ধীরে দীরে গভীর করছেন। বিপজ্জনক কাজটা হলো, কাঁচের ভাঙা কোন টুকরোকে নিচে পড়তে না দেয়া। ইস্পাতের খোলে লেগে শব্দ করবে ওটা।
ফুটোয় একটা আঙুল ঢুকিয়ে সেটা বাঁকা করলেন তিনি, ধীরে ধীরে নিজের ওপর নামিয়ে রাখলেন সেটা। ফাঁকটা যথেষ্ট বড় হয়েছে, অনায়াসে এবার মাথাটা বাইরে বের করতে পারবেন।
জানালা থেকে আধ হাত দূরে ফাইবার বোর্ডের আবরণ, জাহাজের মাঝখানে সুপারস্ট্রাকচার পুরোটা ঢেকে রেখেছে। সদ্য তৈরি ফাঁকটা দিয়ে সাবধানে মাথা গলিয়ে দিলেন সিনেটর পিট, একটু অসতর্ক হলেই ধারালো কাঁচের কিনারায় লেগে কান কাটা পড়বে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফাইবার বোর্ড আর ইস্পাতের খাড়া দেয়াল ছাড়া কিছুই দেখতে পেলেন না। মুখ তুললেন ওপর দিকে। আলো দেকে বোঝা গেল ওখানে আকাশ আছে; কিন্তু এত স্নান, যেন কুয়াশা সব শুষে নিয়েছে। নিচে তাকিয়ে সচল পানি দেখতে পাবার কথা, কিন্তু পানির বদলে বিশাল একটা প্লাস্টিকের আবরণ দেখতে পেলেন। জিনিসটার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেন তিনি, ওখানে ওটা কী কাজে লাগছে বুঝতে পারলেন না।
তবে নিজেকে নিরাপদ মনে হলো তাঁর। ডেকে যারা পাহারা দিচ্ছে তাদেরকে যদি তিনি দেখতে না পান, তারাও তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না।
সিটিংরুম থেকে বেডরুমে ফিরে গেলেন সিনেটর পিট, স্যুটকেস খুলে ব্যস্তভাবে হাতড়াতে শুরু করলেন।
কাজে ফিরে যাবার আগে হাত দুটো গরম করে নিলেন। ছুরির লাল হাতলটা শক্ত করে ধরলেন, কাঁচের ফাঁক দিয়ে বের করে দিলেন হাতটা, ফাইবারবোর্ডের গায়ে ছোট ফলাটাকে ড্রিল হিসেবে ব্যবহার করলেন, বড় ফলাটা দিয়ে কাটলেন।
ধৈর্য আর নৈপুণ্যের পরীক্ষা দিচ্ছেন সিনেটর পিট। খুব সাবধানে ছুরির ছোটো ফলাটা ঘোরাতে হচ্ছে, যাতে ফাইবারবোর্ডের ওদিকে ফলাটার ডগা বেরিয়ে না পড়ে। নিচের গার্ডরা ছুরির ডগা দেখে ফেলতে পারে। ফাইবারবোর্ডের একটা করে স্তর চেঁছে তুলতে হচ্ছে।
আঙুলগুলো অসাড় হয়ে গেল, তবু ওগুলো গরম করলেন না। ছোট ছুরিটা তার হাতেরই একটা অংশ হয়ে উঠেছে যেন। অবশেষে খুদে একটা ফুটো তৈরি হলো। জানালার বাইরে মাথা বের করে দিয়ে ফাইবারবোর্ডের গায়ে মুখ ঠেকালেন তিনি, ফুটোয় চোখ রেখে ভালো করে দেখলেন বাইরেটা।
দৃষ্টিপথে কী যেন একটা বাধা হয়ে রয়েছে। ফুটোয় একটা আঙুল ঢুকিয়ে ঘোরালেন, অনুভব করলেন জিনিসটা-স্বচ্ছ প্লাস্টিকের আবরণ। এতক্ষণে তিনি উপলব্ধি করলেন, আক্ষরিত অর্থেই গোটা জাহাজ প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে রাখা হয়েছে।
দুঃখের মধ্যেও হাসি পেল তাঁর। ফাইবারবোর্ড কাটার সময় অতটা সতর্ক না হলেও চলত। প্লাস্টিকের পর্দা থাকায় নিচ থেকে ছুরির ফলা কেউ দেখতে পেত না। সুবিধাটা সাথে সাথে গ্রহণ করলেন তিনি, ফাইবারবোর্ডের গায়ে বড় একটা গর্ত বানালেন। কেটে ফেললেন খানিকটা প্লাস্টিক। তারপর তাকালেন। না সাগর, না তীরচিহ্ন, কিছুই তিনি দেখতে পেলেন না। দেখতে পেলেন বরফের পাঁচিল, এত উঁচু যে শেষ সীমা পর্যন্ত দৃষ্টি পৌঁছাল না। চকচকে পাঁচিলটা এত কাছে, যেন লম্বা করা একটা ছাতা দিয়ে নাগাল পাওয়া যাবে।
তাকিয়ে আছেন, ড্রাম পেটানোর মতো গুরুগম্ভীর ভোঁতা আওয়াজ ঢুকল কানে। সাধারণত ভূমিকম্প হলে এ ধরনের আওয়াজ শোনা যায়।
দ্রুত পিছিয়ে এলেন সিনেটর, চেহারায় হতচকিত ভাব।
তাঁকে আড়ষ্ট হয়ে উঠতে দেখলেন হে’লা কামিল। কী? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন তিনি। কি দেখেছেন আপনি?
হে’লা কামিলের দিকে ফিরলেন সিনেটর পিট, কিছু বলতে গিয়েও পারলেন না, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না। ছুটে এসে তার হাত আঁকড়ে ধরলেন হে’লা কামিল। নাদাভ হাসানও বিছানা থেকে নেমে এলেন। প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জো দাঁড়িয়ে পড়েছেন ডেকে।
প্রকাণ্ড একটা গ্লেসিয়ারের গায়ে নোঙর ফেলেছে ওরা, বিড়বিড় করে বললেন সিনেটর পিট। যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে বরফের পাঁচিল। যদি পড়ে, চিড়ের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাবে জাহাজ।
৫০. মুখোশ পরা সুলেমান
৫০.
