ওনাকে তাহলে দেখাই? পিটের অনুমতি প্রার্থনা করল জিওর্দিনো।
স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্টের উদ্দেশে ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল পিট।
ঠিক আছে, বয়েজ, ক্রুদের বলল স্কিপার। প্রথমে হালকাভাবে।
ক্রুদের একজন ভালভ ঘোরাল, অপরজন তাক করল হোস পাইপে মুখ। প্লাস্টিকের ওপর ছড়িয়ে পড়ল পানির অনেকগুলো সরু ধারা। প্রথমদিকে বাতাসের ধাক্কায় উড়ে গেল ধারাগুলো। ক্রুরা হোসের মুখ ঘোরাল, এরপর প্লাস্টিকের গায়ে পানির একটা স্তর তৈরি হলো।
এক মিনিটও পেরুল না, প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় শক্ত বরফ হয়ে গেল পানির পাতলা স্তরটা।
ধৈর্য ধরে রূপান্তরটা লক্ষ করল মরটন হলিস। হঠাৎ এগিয়ে এল সে, খপ করে পিটের একটা হাত ধরে হ্যান্ডশেক করল! মুগ্ধ হলাম, মি. পিট। আপনি আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন।
বিস্ময়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকল জন ডিলিঞ্জার। একটা আইসবার্গ, প্রচণ্ড রাগের সাথে, যদিও নিচু গলায়, বিড়বিড় করল সে, বেজন্মা রা লেডি ফ্ল্যামবোরোকে আইসবার্গ বানিয়ে ফেলেছে।
.
৪৯.
ঠাণ্ডায় হি হি করতে করতে ঘুম ভাঙল হে’লা কামিলের। অনেকক্ষণ আগে সকাল হয়েছে, তবু চারদিকে রয়ে গেছে আবছা অন্ধকার। ফাইবার বোর্ড আর প্লাস্টিক শিটের গায়ে বরফ জমায় লেডি ফ্ল্যামবোরোর দিনের আলো তেমন প্রবেশ করতে পারছে না। ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন। ভিআইপি স্যুইটে রয়েছেন তিনি, পাশের বিছানায় প্রেসিডেন্ট নাদাভ হাসান ও প্রেসিডেন্ট দো লরেঞ্জোকে অস্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন, একটা চাদরের তলায় জড়াজড়ি করে শুয়ে আছেন তাঁরা। তাঁদের নিঃশ্বাস বাষ্পের মতো উঠে আসছে মাথার ওপর, তারপর দেয়ালে জমাট বাঁধছে।
শুধু ঠাণ্ডা তবু সহ্য করা যায়, কিন্তু অতিরিক্ত আর্দ্রতার সাথে হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। বেঁচে থাকা আরও দুষ্কর হয়ে উঠেছে পাল্টা ডেল এসটে ছাড়ার পর থেকে পেটে কিছু না পড়ায়। প্যাসেঞ্জার বা ক্রুদের কিছুই খেতে দেয়নি হাইজ্যাকাররা। আর সুলেমান আজিজের নিষ্ঠুরতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে সবাই। শরীর ও মন প্রতি মুহূর্তে দুর্বল হয়ে পড়ছে, সময় কাটছে দুঃস্বপ্নের ভেতর, অজানা ভয়ে সবাই কাহিল।
প্রথম দিকে বাথরুমে পানি ছিল, তা-ই খেয়েছে সবাই। তারপর পাইপের ভেতর পানি বরফ হয়ে গেছে। খিদের সাথে অসহ্য হয়ে উঠেছে পিপাসা।
ঘুম সবারই ভেঙেছে, তবে নড়াচড়া করার বা কথা বলার শক্তি নেই কারও। দেন-দরবার করে কোনো লাভ হয়নি, অতিরিক্ত চাদর দিতে রাজি হয়নি সুলেমান আজিজ। কেবিন আর স্যুইটগুলো গরম রাখার জন্য হিটিং সিস্টেম চালু করার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছে সে। বাধা দিয়ে বা জোর খাঁটিয়ে কোনো লাভ নেই জেনে, ক্যাপটেন কলিন্স বিনা প্রতিবাদে পরিস্থিতি মেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ক্রুদের। তার সিদ্ধান্তই ঠিক, এখনকার একমাত্র কর্তব্য হলো কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে থাকা।
সিনেটর পিটকে রুমে ঢুকতে দেখে একটা ভ্র সামান্য উঁচু করলেন হে’লা কামিল।
নীল ডোরাকাটা শার্টের ওপর অ্যাশ কালারের বিজনেস স্যুট পরেছেন তিনি। হে’লা কামিলকে অভয় দিয়ে হাসলেন বটে, তবে হাসিটা প্রায় সাথে সাথে ম্লান হয়ে গেল! পাঁচ দিনের ধকলে তার ছিমছাম, চোখা চেহারা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। কেমন বুঝছেন, মিস কামিল?
এক কাপ গরম চা পেলে ডান হাতটা খোয়াতে রাজি আছি, ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে উৎসাহ দেখানোর চেষ্টা করলেন হে’লা কামিল।
কমপিটিশন হলে আমি জিতব, হাতের সাথে আমি একটা পা হারাতেও রাজি, কৌতুক করলেন সিনেটর পিট।
বিছানায় উঠে বসলেন দো লরেঞ্জো, পা দুটো ডেকে নামালেন। আমি কখনও ভাবিনি।
আমিও না, বললেন হে’লা কামিল।
পাশ ফিরে শুলেন নাদাভ হাসান, মৃদু গোঙালেন, তারপর বালিশ থেকে মাথা তুলে তাকালেন ওদের দিকে।
পিঠটা বুঝি আবার ভোগাচ্ছে আপনাকে? জিজ্ঞেস করলেন দো লরেঞ্জো, চেহারায় উদ্বেগ ফুটে উঠল।
দেশে কী ঘটছে ভাবতে গেলে শুধু মাথা ঘোরে, ব্যথা টের পাই না, জবাব দিলেন মিসরীয় প্রেসিডেন্ট। দো লরেঞ্জোর দিকে তাকালেন তিনি, মৃদু হাসলেন। আপনার সাথে অন্য কোনো পরিস্থিতিতে পরিচয় হলে ভালো হতো।
শুনেছি আমেরিকানরা বলে, পলিটিক্স মেকস স্ট্রেঞ্জ বেড়ফেলোজ। আমরা যেন আক্ষরিক দৃষ্টান্ত।
এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেলে অবশ্যই আপনি আমার অতিথি হবেন মিসরে।
মাথা ঝাঁকালেন দো লরেঞ্জো! আমন্ত্রণ আমার তরফ থেকেও রইল।
দুর্লভ সম্মান হিসেবে নিলাম আমন্ত্রণটা।
তারপর হঠাৎ করে হে’লা কামিল জানালেন, ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে।
মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে সমর্থন করলেন সিনেটর পিট। এইমাত্র নোঙর ফেলা হয়েছে। আমরা দাঁড়িয়ে পড়েছি।
তার মানে মাটির কাছাকাছি কোথাও রয়েছি আমরা।
পোর্ট উইন্ডো খোলা না থাকায় কী করে বলি।
ওরা আমাদেরকে অন্ধ করে রেখেছে, নাদাভ হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করলেন।
আপনাদের একজন যদি দরজা পাহারা দেন, দো লরেঞ্জোকে বললেন সিনেটর পিট, জানালা ভাঙার একটা চেষ্টা করতে পারি আমি। গার্ডদের না জানিয়ে যদি কাঁচ ভাঙতে পারি, ফাইবার বোর্ডে একটা গর্ত করা সম্ভব। ভাগ্য ভালো হলে দেখতে পাব কোথায় আমরা রয়েছি।
ঠিক আছে, বললেন হে’লা কামিল, আমি দরজায় কান পাতব।
কিন্তু মেক্সিকান প্রেসিডেন্ট উৎসাহ দেখালেন না। এমনিতেই জমে যাচ্ছি, ফাইবার বোর্ড ফুটো করলে ঠাণ্ডা আরও বাড়বে।
