অথচ কেউ একজন তার সব চালাকি বুঝে ফেলতে পারছে, প্রশংসাই করল কিন্তু তীব্র ব্যঙ্গের সুরে।
আমাদেরকে সহায়তা করেছে ভাগ্য। সাগরের ওই অংশে সার্ভে করছিল সাউন্ডার, তা না হলে জেনারেল ব্রাভোকে খুঁজে পেতে এক মাস লেগে যেত। সময়টা কমিয়ে এনেছি আমরা, তার পরও এক কি দেড় দিন এগিয়ে আছে লেডি ফ্ল্যামবোরো।
নরম না হয়ে উপায় দেখল না কর্নেল। তার সামনে দাঁড়ানো লোকটা এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তেও রাজি নয়। জাহাজটা কোথায়? সরাসরি জানতে চাইল সে।
আমরা জানি না, জবাব দিল রুডি।
আনুমানিক পজিশনও জানা নেই?
শুধু একটা যুক্তিসংগত ধারণা দিতে পারি, বলল জিওর্দিনো।
কিসের ওর ভিত্তি করে?
পিটের দিকে তাকাল জিওর্দিনো, মৃদু হেসে বলটা নিজের নিয়ন্ত্রণে নিল পিট। ইনটুইশন।
কর্নেলের আশা পঁড়িয়ে যেতে শুরু করল। আপনারা কি জাদু দণ্ড ব্যবহার করছেন, নাকি ক্রিসটাল বল?
সত্যি কথা বলতে কি, আমার পছন্দ চায়ের পাতা, উত্তর দিল পিট, মনে মনে বলল, টিট ফর ট্যাট।
শীতল, দীর্ঘ নিস্তব্ধতা নেমে এল কেবিনের ভেতরে। কর্নেলের উপলব্ধিতে কোনো ভুল নেই, চোটপাট দেখিয়ে এখানে সুবিধা করা যাবে না। কফি শেষ করে খালি কাপটা বারবার হাত বদল করল সে। অবশেষে সে-ই নিস্তব্ধতা ভাঙল,
ঠিক আছে। মানলাম, আমি একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছি। আসলে সিভিলিয়ানদের সাথে মেলামেশা করে অভ্যস্ত নই।
ব্যঙ্গ বা তাচ্ছিল্যের কোনো ভাব নয়, পিটের চেহারায় শুধু নির্মল কৌতুক। শুনে যদি স্বস্তি বোধ করেন, তাহলে বলি, এয়ারফোর্সের একজন মেজর আমি।
ভ্রু কুঁচকে পিটের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করল কর্নেল। জানতে পারি, মুমার মতো একটা প্রতিষ্ঠানের জাহাজে কী করছেন আপনি?
সে অনেক কথা, বলল পিট। সব শোনার ধৈর্য হবে না আপনার।
মেজর ডিলিঞ্জার ধরতে পারল ওর পরিচয়। বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে মাথা জ্যাম না থাকলে কর্নেল হোলিসও আগেই বুঝতেন।
আপনি কি সিনেটর পিটের কেউ হন?
সিনেটর আমার বাবা।
ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পড়ল কর্নেল মরটন হোলিস।
ঠিক আছে, মি. পিট। এবারে বলুন, কী খুঁজে পেয়েছেন আপনি?
মেজর ডিলিঞ্জার সময় নষ্ট না করে প্রসঙ্গটা ফিরিয়ে আনল, শেষ রিপোর্টে দেখা গেছে, লেডি ফ্ল্যামবোরো অ্যান্টার্কটিকার দিকে যাচ্ছে। আপনি বলছেন, জাহাজটা এখনও পানির ওপর আছে। নতুন ফটোগুলোয় ভাসমান বরফের মধ্যে নিশ্চয়ই ওটাকে দেখা যাবে।
ফটোগুলো যদি এসআর-নাইনটি ক্যাসপার থেকে তোলা হয়, দেখা যাবে না, বলল পিট।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল কর্নেল মরটন হোলিস। কী বলছেন আপনি, মি. পিট। এক লাখ কিলোমিটার দূর থেকে এসআর নাইনটি ত্রিমাত্রিক ইমেজ এত পরিষ্কার ধরতে পরে যে একটা ফুটবলের সেলাই পর্যন্ত আলাদাভাবে চিনতে পারবেন আপনি।
কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যদি বলটাকে পাথরের মতো দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়?
কী বলছেন বুঝতে পারছি না।
দেখালে বুঝবেন, বলল পিট। আমার সাথে ডেকে চলুন, সব আয়োজন করে রেখেছে ক্রুরা।
.
জাহাজের পেছন দিকে খোলা ডেক বড় ও স্বচ্ছ একটা সাদা প্লাস্টিক দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে, প্রতিটি প্রান্ত শক্তভাবে আটকানো, ফলে জোরাল বাতাসেও সেটা ফুলে উঠছে না। একটা ফায়ার হোস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে দু’জন ক্রু, তাদের পাশে রয়েছ স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট।
জেনারেল ব্রাভোর চারদিকে তল্লাশি চালাতে গিয়ে প্লাস্টিকের টুকরোটা পাওয়া গেছে, ব্যাখ্যা করল পিট। দুটো জাহাজ মিলিত হবার সময় সম্ভবত দুর্ঘটনাবশত টুকরোটা পানিতে পড়ে যায়। ওটার আশপাশে অনেকগুলো খালি ব্যারেল ছিল, ব্যারেলগুলোয় ছিল রং, প্রমোদতরী লেডি ফ্ল্যামবোরোকে জেনারেল ব্রাভোর চেহারা দেয়ার জন্য ওই রং ব্যবহার করে ক্রুরা। প্রমাণটাকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেয়া যায় না। পিটের ধারণার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। তবে এসব থেকে বেরিয়ে আসে রূপ বদলের আকেটা সম্ভাবনা। সর্বশেষ স্যাটেলাইট ফটোতে কিছু দেখা যায়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট সবগুলো চোখ একটা জাহাজকে খুঁজছিল। অথচ লেডি ফ্ল্যামবোরোকে এখন আর কোনো জাহাজের মতো দেখাচ্ছে না। সন্ত্রাসবাদীদের নেতা নির্ঘাত একজন শিল্পরসিক ও সমঝদার আদমি। ভাস্কর ক্রিস্টোন শিল্পকর্ম অবশ্যই তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। ক্রিস্টো, প্লাস্টিক দিয়ে ভাস্কর্য তৈরিতে যিনি সিদ্ধহস্ত, ঈর্ষণীয় খ্যাতিও অর্জন করেছেন। আউটডোর স্কাল্পচার-এর তিনি একজন বিশেষজ্ঞ। হাইজ্যাকাররা তাঁর পদ্ধতি অনুকরণ করে গোটা জাহাজটাকে প্লাস্টিক দিয়ে মুড়ে ফেলেছে।
প্রমোদতরী বিশাল কোনো জাহাজ নয়। ওটার খোলের কাঠামো খুঁটি ও মাচার সাহায্যে প্রয়োজন মতো বদলে নেয়া সম্ভব। ওটার খোলের কাঠামো খুঁটি, প্রতিটিতে নম্বর দিয়ে নিলে, গোটা জাহাজ মুড়ে ফেলা তেমন কঠিন কোনো কাজ নয়, খুব বেশি হলে ঘণ্টা দশেক লাগবে। কাজটা তারা করছিল ল্যান্ডস্যাট যখন মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। ক্রুদের ব্যস্ত তৎপরতার বিস্তারিত বিবরণ ফটোতে ধরা পড়েনি, পড়ার কথাও নয়। বারো ঘণ্টা পর সিস্যাটের তোলা ফটোতে জাহাজটা সম্পূর্ণ গায়েব হয়ে যায়, জাহাজের কোনো আকৃতিই ধরা পড়েনি। ব্যাখ্যা শেষে জিজ্ঞেস করল পিট, আমি খুব তাড়াতাড়ি বলছি?
না- ধীরে ধীরে বলল কর্নের মরটন হোলিস। তবে কিছুই তেমন বোধগম্য হচ্ছে না।
