.
৪৮.
দুনিয়ার সর্বদক্ষিণের সবচেয়ে বড় শহরের উপরে ঝরছে হালকা তুষার। পানামা খাল তৈরি হবার আগে বন্দর হিসেবে নাম ছিল পাল্টা অ্যারেনাসের, পরে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। শহরের লোকজন এত দিন ভেড়া পেলে রুজি-রোজগার করেছে, ইদানীং কাছাকাছি তেলখনি আবিষ্কার হওয়ায় আবার জমে উঠছে শহর।
জেটির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে কর্নেল মরটন হোলিস আর জন ডিলিঞ্জার, সাউন্ডারে চড়ার জন্য অস্থির হয়ে আছে তারা। ফ্রিজিং পয়েন্টের কয়েক ডিগ্রি নিচে নেমে গেছে তাপমাত্রা, হালকা তুষারপাত শুরু হয়েছে, কর্কশ ঠাণ্ডা কামড় বসাচ্ছে নিরাবরণ মুখে, আর্কটিকে উটের মতো লাগছে নিজেদের। চিলি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় নিজেদের পরিচয় গোপন করেছে তারা, ব্যাটল ড্রেসের বদলে পরেছে ইমিগ্রেশন অফিসারদের ইউনিফর্ম।
সময়মতোই, তখনই অন্ধকার ছিল আকাশ, কাছাকাছি একটা সামরিক এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করেছে ওদের প্লেন। তুষারপাত শুরু হওয়ায় ভালোই হয়েছে, প্লেন থেকে ওদেরকে কেউ নামতে দেখেনি। চিলির মিলিটারি কমান্ডের সৌজন্য সি-১৪০ ও অ্যাসল্ট এয়ারক্রাফট ঠাই পেয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে একটা হ্যাঁঙ্গারের ভেতর। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে একটা অয়্যার হাউসে ঢোকে ওরা, দূর থেকে দেখতে পায় নোঙর ফেলছে রিসার্চ শিপ সাউন্ডার। সাউন্ডারের ব্রিজ উইং-এ বেরিয়ে এল এক যুবক, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, পরনে স্কি জ্যাকেট। মুখের সামনে চোঙ তৈরি করল হাত দিয়ে। জিজ্ঞেস করল, সিনর লোপেজ?।
জি, মাথা ঝাঁকাল কর্নেল মরটন হোলিস।
আপনার বন্ধুটি কে? স্প্যানিশ ভাষায় জিজ্ঞেস করল যুবক।
একই ভাষায় উত্তর দিল কর্নেল, আমার বন্ধু সিনর জোন্স।
বিড়বিড় করে জন ডিলিঞ্জার বলল, এমনকি চীনা রেস্তোরাঁয়ও এর চেয়ে ভালো স্প্যানিশ শুনেছি আমি।
প্লিজ, উঠে আসুন জাহাজে, বলল যুবক। মেইন ডেকে ওঠার পর ডান দিকে একটা মই পাবেন, ওটা বেয়ে ব্রিজে চলে আসুন।
ধন্যবাদ।
মই বেয়ে ওঠার সময় কৌতূহলের মাত্রা বেড়ে গেল কর্নেলের। যুবকের কথা শুনে তাকে আমেরিকান বলে মনে হয়নি। পরিচয় আন্দাজ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলো সে। আসলে এখনও অন্ধকারে রাখা হয়েছে তাকে। পাল্টা অ্যারেনাসে পৌঁছাবার এক ঘণ্টা আগে জেনারেল ডজের কাছ থেকে কোড় করা জরুরি একটা মেসেজ পেয়েছে সে, নুমার সার্ভে শিপ সাউন্ডার নোঙর ফেললে তাতে চড়তে হবে তাকে। ব্যস, এইটুকু। আর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। পরবর্তী নির্দেশও পায়নি সে। ভার্জিনিয়া ব্রিফিং থেকে তার শুধু জানা আছে রিসার্চ শিপ আর তার ক্রুরা কীভাবে যেন একটা অসম্ভবকে সম্ভব করেছে-লেডি ফ্ল্যামবোরোকে জেনারেল ব্রাভো বলে চালাবার চেষ্টা করেছিল, সেটা তারা ধরে ফেলে। আর কিছু জানা নেই কর্নেলের। তাকে এখন জানতে হবে পান্টা অ্যারেনাসে এস.ও.এফ. দল যখন পৌঁছাল, একই সময়ে হঠাৎ করে সাউন্ডার-ও পৌঁছাল কেন? অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে না কর্নেল, কাজেই তার মেজাজও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই।
যুবককে ব্রিজ উইংয়েই পাওয়া গেল। তার ঘন সবুজ, ওপাল পাথরের মতো চোখ দুটো খুঁটিয়ে দেখল কর্নেল মরটন হোলিস।
তার কালো চুলে তুষারের সাদা কণা জমেছে। পাঁচ সেকেন্ড অফিসার দু’জনকে দেখল সে, তারপর কোট পকেট থেকে হাত বের করে বাড়িয়ে ধরল। কর্নেল মরটন হোলিস, মেজর ডিলিঞ্জার, আমি ডার্ক পিট।
দেখা যাচ্ছে, আমরা আপনার সম্পর্কে কিছু জানি না, কিন্তু আপনি আমাদের সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন, মি. পিট।
বৈষম্যটা দূর করা হবে, কথা দেয়ার সুরে বলল পিট, মুখটা হাসি হাসি। আসুন, ক্যাপটেনের কেবিনে যাওয়া যাক।
কৃতজ্ঞচিত্তে তুষার আর হিম ঠাণ্ডা পেছনে ফেলে পিটকে অনুসরণ করল অফিসাররা, এক ডেক নিচে নেমে স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্টের কেবিনে ঢুকল পিট। ভেতরে ঢুকে সবার সাথে হ্যান্ডশেক করল অফিসাররা, খুশিমনে ধূমায়িত কফির কাপে চুমুক দিল।
বসুন আপনারা, ওদেরকে চেয়ার দেখাল স্কিপার।
মেজর ডিলিঞ্জার বসল, তবে মাথা নাড়ল কর্নেল মরটন হোলিস।
ধন্যবাদ, বলল সে। আমি বরং দাঁড়িয়ে থাকতেই পছন্দ করব। এক এক করে নুমার চারজন লোকের দিকে তাকাল সে। সরাসরি জিজ্ঞেস করলে যদি কিছু মনে না করেন, কী ঘটছে বলবেন আমাকে?
বুঝতেই পারছেন, ব্যাপারটা লেডি ফ্ল্যামবোরোকে নিয়ে, জবাব দিল পিট।
আলোচনার আছেটা কী? জানা কথা আতঙ্কবাদীটা ওটাকে ডুবিয়ে দিয়েছে।
দৃঢ় আশ্বাস দিয়ে বলল পিট, এখনও ওটা পানির ওপর দিব্যি ভাসছে।
আমাকে উল্টোটা জানানো হয়েছে, কঠিন সুরে বলল কর্নেল মরটন হোলিস। লেটেস্ট স্যাটেলাইট ফটোতে জাহাজটা নেই।
আমার কথার ওপর ভরসা রাখুন।
আপনি আমাকে প্রমাণ দেখান।
আপনি এখানে হুকুম চালাবেন না। নাকি চালাবেন?
দল নিয়ে এখানে আমি এসেছি মানুষের প্রাণ বাঁচানোর জন্য, কর্কশ সুরে বলল কর্নেল। কেউ, এমনকি আমার ঊর্ধ্বতন অফিসাররাও, আমাকে বলেননি যে লেডি ফ্ল্যামবোরোর আরোহীদের এখনও বাঁচানো যেতে পারে।
আপনাকে বুঝতে হবে, কর্নেল, হঠাৎ চাবুকের মতো শব্দ করল পিটের কণ্ঠস্বর, প্রতিপক্ষরা সাধারণ গান-হ্যাপি আতঙ্কবাদী নয়। অত্যন্ত বুদ্ধিমান এক লোক ওদেরকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দুনিয়ার সেরা সিকিউরিটি মেধাগুলোকে বোকা বানিয়ে চলেছে সে।
