পারিবারিক সম্পর্ক নিঃসন্দেহে প্রমাণ করা গেছে? সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন জুলিয়াস শিলার। কোনো সন্দেহ নেই?
আমাদের অপারেটররা তাদের জেনেটিক কোড সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখেছে।
এই প্রথম শুনলাম, প্রেসিডেন্টের বলার সুরে অসন্তোষ প্রকাশ পেল। আমাকে আরও আগে জানানো হয়নি কেন?
চুড়ান্ত প্রমাণ সাজানোর কাজ চলছে, ল্যাংলি থেকে সরাসরি আপনার কাছে পাঠানো হবে। দুঃখিত, প্রেসিডেন্ট, নিশ্চিদ্র প্রমাণ ছাড়া আপনাকে জানাতে চায়নি আমরা।
নিকোলাস এবারে জিজ্ঞেস করলেন, ওদের জেনেটিক কোড জোগাড় হলো কীভাবে?
দু’জনেই আত্মপ্রচার পছন্দ করে, ব্যাখ্যা করলেন মারটিন ব্রোগান। আমাদের জালিয়তিবিষয়ক বিভাগ আখমত ইয়াজিদের কাছে পবিত্র কোরআনের একটা কপি পাঠায়, আর টপিটজিনের কাছে পাঠায় আযটেক পোশাক পরা তারই একটা ফটো, সেই সাথে দু’জনকে অনুরোধ করা হয়, তারা যেন সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা লিখে ওগুলো ফেরত দেয়। ওগুলো পাঠানো হয় ওদের পরিচিত বিদেশি ভক্তদের নামে, যাদের হস্তাক্ষর আখমত ইয়াজিদ ও টপিটজিন চেনে। দু’জনেই ওরা টোপ গেলে। প্রার্থনা লিখে ডাকযোগে ফেরত পাঠায় ওগুলো। নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছানোর আগে মাঝপথ থেকে ওগুলো আমরা সংগ্রহ করি।
দীর্ঘ কাহিনী, স্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখলেন সিআইএ প্রধান। ফেরত আসা পবিত্র কোরআন থেকে কয়েক জোড়া হাতের ছাপ পাওয়া যায়। বছর কয়েক আগে কায়রোয় একবার গ্রেফতার হয়েছিল আখমত ইয়াজিদ, মিসরীয় পুলিশ বিভাগের কাছ থেকে তার হাতের ছাপ আগেই জোগাড় করেছে সিআইএ সেটার সাথে মিলে গেল কোরআনে পাওয়া একটা ছাপ। ফিঙ্গারপ্রিন্ট অয়েল থেকে তার ডিএনএ টেস্ট করে ল্যাব কর্মীরা।
টপিটজিনের আঙুলের ছাপ মেলানো অত সহজ হয়নি। মেক্সিকোয় কখনও গ্রেফতার হয়নি সে। তবে ফেরত আসা ফটোয় পাওয়া অনেকগুলো প্রিন্টের মধ্যে থেকে একটার সাথে মিলে যায় ইয়াজিদের কোড। এরপর ইন্টারপোল-এর প্যারিস, হেডকোয়ার্টারে বসে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল রেকর্ড ঘটিতে গিয়ে সিআইএ অপারেটররা চমকপ্রদ একটা তথ্য পেয়ে যায়। ভোজবাজির মতো বেরিয়ে আসে অবিশ্বাস্য একটা পারিবারিক কাহিনী।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এই পারিবারিক সংগঠন অপরাধ জগতে মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। একশো মিলিয়ন ডলার পুঁজি নিয়ে চুটিয়ে অবৈধ ব্যবসা ফেঁদে বসে মা বাবা, তিন ভাই আর এক বোন। মা-বাবা নীতিনির্ধারণ করে, ভাই-বোনেরা অপারেশনের দায়িত্বে থাকে। চাচা-মামা, খালা-খালু, চাচাতো-খালাতো ভাইবোন, বরক্ত সূত্রে বা বিবাহ সূত্রে বা বিবাহ সূত্রে নিকটাত্মীয়রা অপরাধ সাম্রাজ্যের এক একজন মন্ত্রী। ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছাড়া সংগঠনে বাইরের কেউ না থাকায় আন্তর্জাতিক ইনভেন্টিগেটরদের পক্ষে তদন্ত চালানো অসম্ভব হয়ে ওঠে।
ওদের নাম? নিচু গলায় জিজ্ঞেস করলেন প্রেসিডেন্ট।
ক্যাপেসটার, বললেন মার্টিন ব্রোগান। মা জোসেফিন ক্যাপেসটার, বাবা রোলান্ড ক্যাপেসটার। বড় ছেলেও নাম রবার্ট ক্যাপেসটার, যাকে আমরা টপিটজিন বলে জানি। মেজো ছেলে পল।
অর্থাৎ, আখমত ইয়াজিদ?
হ্যাঁ।
সিআইএ আর কি জানে, শুনতে বোধহয় ভালোই লাগবে আমাদের, বললেন প্রেসিডেন্ট।
কাহিনীর দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরুতেই মারটিন ব্রোগান স্বীকার করলেন, সব তথ্য এখনও তার জানা নেই। কার্ল আর ম্যারি, অর্থাৎ ছোট ভাই আর বোন কোথায় আছে বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের নাম-ঠিকানা জানা সম্ভব হয়নি। হাতের কাছে ফাইল নেই, যতটুকু মনে করতে পারলেন, বলে গেলেন তিনি।
ক্যাপেসটাররা অপরাপধপ্রবণ একটা পরিবার, তাদের এই ঐতিহ্য আশি বছরের পুরনো। ক্যাপেসটারে বাবা ফ্রান্স ত্যাগ করে ক্যারিবিয়ার অঞ্চলে চলে যায়, সেখানে চোরাচালান ব্যবসা শুরু করে সে-পণ্য সংকটের যুগে আমেরিকায় মদ সরবরাহ করত, চুরি করা জিনিস পাচার করত বিভিন্ন দেশে। প্রথমে সে পোর্ট অভ স্পেন থেকে ব্যবসা করত, পরে কাছাকাছি একটা দ্বীপ কিনে সেটাকে হেডকোয়ার্টার বানায়। বাবা মারা যাবার পর রোলান্ড ক্যাপেসটার, স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করে দ্বীপটায়। কারও কারও ধারণা, অপরাধ সাম্রাজ্যের ব্রেন হলো তার স্ত্রী, জোসেফিন ক্যাপেসটার। স্বামীর সাথে এসেই, শ্বশুর যা করেনি বা করতে পারেনি, তাই করল সে, ড্রাগ ব্যবসা ধরল। নিজেদের দ্বীপে প্রথম তারা কলার চাষ করল। ভালোই লাভ হতো তাতে। এরপর তারা দুটো করে ফসল তোলার ব্যবস্থা করল-একটা কলা, অপরটি মারিজুয়ানা। কলাগাছের তলায় মারিজুয়ানার চাষ হত, যাতে কেউ দেখতে না পায়। দ্বীপে তারা একটা বিশুব্ধকরণ ল্যাবরেটরিও বসায়।
আমি কি পরিষ্কার একটা ছবি দিতে পারছি? জিজ্ঞেস করলেন মারটিন ব্রোগান।
মাথা ঝাঁকালেন প্রেসিডেন্ট। বলে যাও, মার্টিন।
নিজেদের জায়গায় মারিজুয়ানা চাষ করল, বিশুদ্ধ করল, তারপর পাচার করল, বললেন মার্টিন ব্রোগান। প্রতিটি কাজে অংশগ্রহণ করল ক্যাপেসটার পরিবারের লোকজন, বাইরের কাউকে ভাড়া করা হলো না। আশ্চয়ই বলতে হবে, ইউরোপ আর পূবের দেশগুলোতে মারিজুয়ানা বিক্রি করল তারা, আমেরিকায় নয়।
ড্রাগস এখনও কি তাদের প্রধান ব্যবসা? ডেইল নিকোলাস জানতে চাইলেন।
না। মাথা নাড়লেন মারটিন ব্রোগান। নিজেস্ব সূত্র থেকে এই পরিবার খবর পায়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কয়েকটা সিকিউরিটি ফোর্স একসাথে তাদের দ্বীপে হানা দেবে। তাড়াহুড়ো করে মারিজুয়ানার খেত পুড়িয়ে ফেলল তারা, রাখল শুধু কলা বাগানটা, তারপর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এমন সব করপোরেশন পাইকারি হারে কিনে ফেলল। ব্যবসা-বুদ্ধিতে কারও চেয়ে কম যায় না, প্রতিটি করপোরেশন সঙ্কট কাটিয়ে উঠল, ক্যাপেসটার পরিবারের সঞ্চয় দাঁড়াল বারোশো মিলিয়ন ডলার। বলাই বাহুল্য, ব্যবসা পরিচালনায় নিজেদের কৌশল খাটায় তারা।
