আমার ছেলে- ডার্ক, ছোট্ট করে বললেন সিনেটর পিট।
চেয়ার ছেড়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ালেন হে’লা কামিল, খোঁড়াতে খোঁড়াতে খোলা জানালার সামনে চলে এলেন। সামনে ফাইবার বোর্ডের আড়াল থাকায় বাইরের দুনিয়ার কিছুই দেখতে পেলেন না। আপনি নিশ্চয়ই ওকে নিয়ে খুব গর্বিত। আমিও জানি, সে ভারি সাহসী ও বুদ্ধিমান যুবক। কিন্তু মানুষ তো। তার পক্ষে আতঙ্কবাদীদের চাতুরি আঁচ করা সম্ভব নয়। হঠাৎ থেকে বোর্ডের একটা খুদে ফুটোর ভেতর তাকালেন তিনি। ওদিকে খানিকটা সাগর দেখা গেল। আরে, ব্যাপার কী, বলুন তো? বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন। জাহাজের পাশ দিয়ে ওগুলো কী ভেসে যাচ্ছে?
কাউচ ছেড়ে উঠে এলেন সিনেটর। হে’লা কামিলের পাশে দাঁড়িয়ে ফুটোর ভেতর দিয়ে তাকালেন। নীল সাগরের পানিতে সাদা জিনিসগুলো দেখতে পেলেও তিনিও প্রথমে চিনতে পারলেন না। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। তাই তো বলি! এত ঠাণ্ডা লাগার কারণটা বোঝা গেল। ওগুলোর বরফ। নির্ঘাত আমরা দক্ষিণ মেরুর দিকে যাচ্ছি।
সিনেটরের গায়ে ঢলে পড়লেন হে’লা কামিল, তার বুকে মুখ গুজলেন। আর কোনো আশা নেই আমাদের, হাল ছেড়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বললেন তিনি। ওখানে আমাদের খোঁজ করার কথা ভাববে না কেউ।
.
৪৪.
কারও ধারণা ছিল না সাউন্ডার এত দ্রুত ছুটতে পারে। ইঞ্জিনের শব্দের সাথে তাল রেখে রিসার্চ শিপের ডেক কাঁপতে শুরু করল, ঢেউগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার মুহূর্তে ঝাঁকি খেল গোটা খোল। জাহাজটার চারশো হর্স পাওয়ার ডিজেল ইঞ্জিন খুব বেশি হলে চৌদ্দ নট গতিসীমায় পৌঁছাতে পারে, তবে স্কিপার ফ্রাঙ্ক স্টুয়ার্ট আর তার ক্রুরা কীভাবে কে জানে ওটার কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছে সতেরো নট।
লেডি ফ্ল্যামবোরার পেছনে একা শুধু সাউন্ডার লেগে আছে, মাঝখানের দূরত্ব কমিয়ে আনার সম্ভাবনা প্রায় নেই বলনেই চলে। আর্জেন্টিনা নেভির যুদ্ধজাহাজ আর ফকল্যান্ডে নোঙর করা ব্রিটিশ ন্যাভাল ইউনিটগুলো পলায়নরত লেডি ফ্ল্যামবোরোকে সামনে থেকে বাধা দিতে পারত, কিন্তু তাদেরকে সতর্ক করা হয়নি।
লেডি ফ্ল্যামবোয়োকে নয়, সাগরের তলায় জেনারেল ব্রাভোকে পাওয়া গেছে, এই খবর কোড করা মেসেজের মাধ্যমে পিটের কাছ থেকে যথাসময়েই পেয়েছেন অ্যাডমিরাল স্যানডেকার। হোয়াইট হাউসে জরুরি বৈঠক হয়েছে, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ ও ইন্টেলিজেন্স চিফরা প্রেসিডেন্টকে জোরাল পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় ইউএস স্পেশাল অপারেশনস ফোর্স না পৌঁছানো পর্যন্ত এই আবিষ্কার সম্পর্কে চুপ থাকতে হবে।
কাজেই, রিসার্চ শিপ সাউন্ডার একাই ধাওয়া করছে লেডি ফ্ল্যামবোরোকে। ওদের মধ্যে উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা নেই। নাবিক, বিজ্ঞানী আর ক্রুরা প্রচণ্ড উত্তেজনায় ছটফট করছে। সবাই ব্যাপারটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে, যেভাবেই হোক, নাগাল পেতে হবে লেডি ফ্ল্যামবোলোর।
জাহাজের ডাইনিং রুমে রয়েছে পিট আর জিওর্দিনো। ওদের সামনে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের একটা ম্যাপ মেলে দিয়েছে রুডি গান। ম্যাপের কিনারায় কয়েকটা কফি কাপ বসানো, পিনের কাজ করছে ওগুলো।
তোমার বিশ্বাস দক্ষিণে যাচ্ছে ওরা? পিটকে জিজ্ঞেস করল রুডি।
ইউ আকৃতির একটা বাঁক নিয়ে যদি উত্তরে যেত, সার্চ গ্রিডের মধ্যে ফিরে আসত লেডি ফ্ল্যামবোরো, বলল পিট। আমরা জানি, তা আসেনি। আর পশ্চিমে ঘুরে গিয়ে আর্জেন্টিনা উপকূলের দিকে যাওয়া সম্ভব নয়।
খোলা সাগরের দিকে যেতে পারে।
তাহলে, তিন দিন এগিয়ে থাকায়, ইতিমধ্যে ওরা আফ্রিকার পথে অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে গেছে, বলল জিওর্দিনো।
ওদিকে ওরা যাবে না, কারণ তাহলে খুব বেশি ঝুঁকি নিতে হয়, বলল পিট। নাটকের পরিচালক যেই হোক, তার খুলির ভেতর হলুদ পদার্থের কোনো কমতি নেই। পূর্ব দিকে ঘুরে সাগর পাড়ি দিলে শুধু সার্চ প্লেনের নয়, অন্যান্য জাহাজেরও চোখে পড়ে যাবার ভয় আছে। উঁহু, সন্দেহ এড়াবার একমাত্র উপায় তার, জেনারেল ব্রাভোর পথে থাকা।
কিন্তু জাহাজ পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে দেখলে সান পাবলোর বন্দর কর্তৃপক্ষ খবরটা ছড়িয়ে দেবে না?
লোকটাকে ছোট করে দেখোনা। বাজি ধরতে পারি, সান পাবলোর বন্দর মাস্টারকে জানানো হয়েছে ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পৌঁছাতে দেরি হবে জেনারেল ব্রাভোর।
আমি বিশ্বাস করি, বলল রুডি। অনায়াসে আরও আটচলিত্মশ ঘণ্টা হাতে পেতে পারে সে।
বেশ, মেনে নেয়ার সুরে বলল জিওর্দিনো। বাকি থাকল কী? কোথায় যেতে পারে সে? ওদিকে জনবসতিহীন হাজারখানেক দ্বীপ আছে, কোথায় তাকে খুঁজব আমরা?
অথবা…, শব্দটা উচ্চারণ করার পর কয়েক মুহূর্ত বিরতি নিল রুডি, তারপর বলল, অথবা অ্যান্টার্কটিকের দিতে যেতে পারে সে। তার হয়তো ধারণা ওখানে কেউ তাকে খুঁজবে না।
এমন হতে পারে, এরই মধ্যে কোনো পরিত্যক্ত খাড়িতে ঢুকে নোঙর ফেলেছে লেডি ফ্ল্যামবোরো, বলল পিট।
আমরা তার চালাকি ধরে ফেলেছি, বলল জিওর্দিনো। পরের বার পাশ কাটানোর সময় ল্যান্ডস্যাট ক্যামেরা চালু থাকবে-লেডি ফ্ল্যামবোয়রীর ওরফে জেনারেল ব্রাভো ধরা পড়তে বাধ্য।
পিটের মন্তব্য শোনার আশায় ঘাড় ফেরাল রুডি গান, কিন্তু সিলিংয়ের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল পিট। এই মুহূর্তে সাউন্ডারে নেই ও, চলে গেছে লেডি ফ্ল্যামবোরোর ব্রিজে, আতঙ্কবাদী লিভারের মাথার ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছে। কাজটা সহজ নয়। ভিআইপি প্যাসেঞ্জারসহ একটা প্রমোদতরীকে হাইজ্যাক করার তিন দিন পরও যে লোক সবার চোখকে ফাঁকি দিতে পারছে, তাকে পিট নিজের যোগ্য প্রতিযোগী বলে মেনে নিল। শত্রু হলেও, লোকটার প্রতি শ্রদ্ধা জাগল মনে। মৃদুকণ্ঠে মন্তব্য করল পিট,
