টাইগার ভাবতে লাগল লোকগুলি নিশ্চয়ই টোকিও থেকে আমার পিছু নিয়েছে পাকাপাকিভাবে ডায়েরীর পাতাগুলো উল্টে দেখল, তারা যেখানে যেখানে থেমেছে সবই লেখা আছে তাতে। বন্ডকে একজন বিদেশী বলেই লেখা আছে। আগে থেকে সাবধান না হয়েই এই অবস্থা। ফাকুওকা পৌঁছে আমি টোকিওতে কথা বলব।
ফাকুওকা-র বড় রাস্তার ধারেই সি.আই.ডি.-র স্থানীয় শাখা। কেমন যেন রাশভারি ধরনের বাড়ি। ধরনটা জার্মানি থেকে নেওয়া। যুদ্ধের আগে এবং যুদ্ধ চলাকালে বাড়িটা ছিল জাপানি গেস্টাপো বাহিনী কেমপিতি আই-এর সদর দপ্তর। টাইগারকে সাড়ম্বরে অভ্যর্থনা করা হল। সুপারিনটেন্ডেন্ট অ্যাভোকে বন্ডের মনে হল আর পাঁচটা বেতন করা চাকুরের মত। তবু তার মধ্যে কোথায় যেন একটা মিলিটারি ছাপ দিল আর রিমলেস চশমার আড়ালে চোখের দৃষ্টি বেশ কঠিন ও সচকিত। বন্ড বসে সিগারেট ফুঁকে চলল, ওদিকে নানারকমের কথাবার্তা চলতে থাকল। বিমান থেকে তোলা মৃত্যু পুরী এবং তার আশপাশের জায়গায় একটা ডিজাইন ফাইন থেকে বার করে এনে টেবিলে পাতা হল। টাইগার বন্ডকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা সহকারে এগিয়ে আসতে বলল। সেটা যে অ্যান্ডোর নজর এড়ালো না, তাও বন্ড লক্ষ্য করল ও বুঝতে পারছিল। টাইগারের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করার মত বহু কিছু ও তার ওপর চাপিয়ে দিয়েছে এবং টাইগার খুব খাটো হয়ে গেছে সেই ব্ল্যাকড্রাগন এজেন্টের কাণ্ড কারখানার জন্য।
টাইগার বলল, বভো-সান, একটু এসে এই ছবিটা পরখ করে দেখ তো! সুপারিনটেন্ডেন্ট বলছেন, ডাঙা জমি দিয়ে এখন যাওয়া মুশকিল। যারা আত্মহত্যা করতে যায় তারা স্থানীয় চাষীদের পয়সা কড়ি খাইয়ে জলা জায়গা দিয়ে ভেতরে ঢোকে। টাইগার আঙুল দিয়ে দেখাল সমস্ত জায়গাটা ঘিরে যে পাঁচিল আছে সেটা আবার মধ্যে মধ্যে ভাঙা। যতবার সুপারিনটেন্ডেন্ট একটা করে পাহারা বসান, চাষীরা আর একটা নতুন জায়গা বার করে। দুর্গের রক্ষীরাই সেটা বালে দেয়। সুপারিনটেন্ডেন্ট চাকরিতে ইস্তফা চান।
খুব স্বাভাবিক বন্ড বলল, তারপরই বোধহয় সেই গৌরবজনক ফাণ্ড বিষের ধাক্কা। আচ্ছা দেখি এটা কি ব্যাপার। প্রথমে দেখেই বন্ডের বুক শুকিয়ে গেল।
পাথুরে তটরেখা ধরে সেই শৈলান্তরীপ যেন সমুদ্রের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। চড়া, প্রকাণ্ড পাথর খাঁজে খাঁজে নেমে গেছে নিচ পর্যন্ত। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে জমাট নিশ্চিদ্র দেওয়াল তৈরি করেছে। দেওয়ালের ওপর থেকে পার্কটা দশ ফুট নিচে। মাঝখানে চওড়া এক লেক এবং ছোট্ট এক দ্বীপ। দুৰ্গটা এক বিশাল পাঁচতলা বাড়ি, জাপানি বৈশিষ্ট্য তৈরি। গোটা অট্টালিকায় কালো রঙ, মুখে মুখে সোনালি রঙ করা। সব মিলিয়ে বাড়িটাকে ড্রাকুলা ধাঁচের বানিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। বন্ড এক মস্ত ম্যাগনিফাইং গ্লাস তুলে নেয় এবং ইঞ্চি ইঞ্চি করে গোটা জায়গাটার ওপর চোখ বুলায়। তারপর বলে ওঠে এই ভয়ঙ্কর জায়গায় আমি ঢুকবো কি করে?
সুপারিনটেন্ডেন্ট বললেন যে, তার কাছে সাঁতারের সমস্তরকম সাজ-সরঞ্জাম আছে। তিনি আরো বললেন যে, ওখানে কুরে নামে এক আমা-দ্বীপ আছে। সমুদ্র থেকে আধমাইল হবে। জাপানের বিভিন্ন জায়গায় এই দ্বীপ আছে। আমার বিশ্বাস সব সমেত গোটা পঞ্চাশেক হবে। এই আমাজাতের মেয়েরা সমুদ্রে শামুক কুড়ায়। খুব সুস্বাদু খেতে। ওরা কখনো কখনো ঝিনুক কুড়াতেও পানিতে নামে–যে ঝিনুকে মুক্ত থাকে। ওরা নামে সম্পূর্ণ উলঙ্গ হয়ে। ওদের মধ্যে কেউ কেউ অসাধারণ সুন্দরী। ওরা নিজেরাই থাকে। বাইরের লোকের দ্বীপে যাওয়া ওরা একেবারে পছন্দ করে না। নিজেদের আদিম কৃষ্টি এবং রীতিনীতিই ওরা মেনে চলে।
এ সব কথা শুনে বন্ডের খুব অদ্ভুত লাগছে। সে ভাবল, কিভাবে সে কুরো দ্বীপে গিয়ে উঠবে? দিনের পর দিন হয়ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। যতদিন না আবহাওয়া অনুকূল হয়।
সুপারিনটেন্ডেন্ট-এর সাথে আলোচনার পর টাইগার বন্ডকে বলল, সুপারিনটেন্ডেন্ট-এর কথায় মনে হচ্ছে কুরোর কোন এক পরিবারের সাথে এর দূর সম্পর্কের আত্মীয়তা রয়েছে। ভারি বিচিত্র পরিবার। বাবা, মা আর এক মেয়ে। মেয়ের নাম কিসী সুজু কি। যখন তার ১৭ বছর বয়স তখন মেয়েটি জাপানে খুব জনিপ্রয় হয়ে ওঠে। হলিউড মেয়েটাকে চেয়েছিল একটা ফিল্ম-এর জন্য। মেয়েটা অবশ্য ছবিটা করেছিল তবে হলিউডের একেবারে ভাল লাগেনি। ও উন্মুখ হয়ে উঠেছিল ওর এই আমা জীবনে ফিরতে। হয়ত প্রচুর ভাগ্য ফিরিয়ে ফেলতে পারত মেয়েটা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফিরে আসে এই নির্জন দ্বীপে। কিসীর এখন বয়স তেইশ। সুপারিনটেন্ডেন্ট বলেছেন, এই পরিবারটির সাথে তোমার থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। তাছাড়া দ্বীপের লোকেরা সব শিটো ধর্মাবলম্বী। সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেব শিনটো পুরোহিতের সাথে কথা বলবেন। বেশ। তাহলে আমি এই দ্বীপে রইলাম। তারপর এক রাত্তিরে আমি সঁতরে গেলাম দেওয়াল পর্যন্ত। তারপর আমি বেয়ে উঠব কি করে?
তোমার কাছে ওইসব নিজা সাজ-সরঞ্জাম থাকবে। তুমি তো দেখেছ কি করে করতে হয়। তুমি মাটিতে গা ঢাকা দিয়ে থাকবে তারপর সুযোগের অপেক্ষা করবে। সুযোগ পেলেই লোকটাকে খতম করে ফেলবে। কেমন করে করবে সেটা তোমার ওপর নির্ভর করছে। নিজা চেন তোমার কোমরেই জড়ানো থাকবে। তুমি সঁতরে কুরো দ্বীপে উঠে। আসবে। পুলিশ লঞ্চ সেখান থেকে তোমাকে তুলে নেবে। রাতে তুমি একটা কালো পোশাক পরবে আর দিনে। উপযোগী কোন একটা ভড়কি! তোমার চোখকে বাঁচাতে থাকবে সাঁতার কাটার চশমা।
