বন্ড সেই লোকটির একটি ছবি দেখতে চাইল।
ছবিটা দূর থেকে টেলিফোটো-লেন্স দিয়ে ভোলা। বিশাল চেহারার একটা লোক। মধ্যযুগীয় বর্মে দেহ ঢাকা, খোঁচা খোঁচা ডানার মত দেখতে শিরস্ত্রাণ। বন্ড ছবিটার বিশেষ বিশেষ জায়গা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। চওড়া পাতের এক সামুরাই, তলোয়ার তার কোমরে ঝুলছে। সুপারিনটেন্ডেন্ট তার ফাইল থেকে একটা বড় ছবি বের করল। বোধহয় ডাক্তার শ্যাটার হ্যাঁন্ডের পাসপোর্ট ছবি সেটা। বন্ডকে দিল। মেয়েমানুষটির ছবিও পাওয়া গেল। কুৎসিত মুখ, বোকা বোকা চোখ।
ছবি দুটো হাতে নিয়ে বন্ডের সারা শরীর সিটিয়ে গেল। নিজের মনেই সে বলে উঠল-অনন্ট স্ট্যাম্রো ব্লোফেলড। ইরমা বাট। এরা তাহলে এখানে এসে গা ঢাকা দিয়ে আছে। আর ভাগ্যের এমনই লম্বা, শক্ত বঁড়শি যে, বেছে বেছে তাকেই গেঁথে নিয়ে এল এদের কাছে! জাপানের এই এক প্রান্তে সে যে এল সমুদ্রের ধার ধরে ট্যাকসিতে–তা এরা কি আগেই গন্ধে গন্ধে টের পেয়েছে নাকি যে সে আসছে? যে গুপ্তচরটা ধরল সে কি বন্ডের নাম পেয়ে গেছে? বোধহয় না।
টাইগারের ক্ষমতা, মান মর্যাদা নিশ্চয়ই তাকে রক্ষা করে আসছে। বন্ড ছবি থেকে মুখ তুলে তাকাল। কঠিন শীতলতা তার মুখে। জাপান বা টাইগারের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। বন্ড খুব স্বাভাবিক ভাবেই জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা টাইগার সুপারিনটেন্ডেন্ট কি খবর নিতে পারেন ওঁর গোয়েন্দারা সেই ব্ল্যাক ড্রাগন এজেন্টের বিষয়ে কিছু জানতে পারল কি না? এছাড়া লোকটা আমার বর্ণনা দিয়ে কিংবা এখানে আসার উদ্দেশ্য সম্বন্ধে টেলিফোন করে কিছু জানিয়েছে। কি না?
টাইগার সুপারিনটেন্ডেন্টকে কথাটা জানাল। সুপারিনটেন্ডেন্ট রিসিভার তুলল। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর রিসিভার নামিয়ে রাখল। টাইগার বন্ডের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল তারপর বলল, লোকটির বিরুদ্ধে পুলিশ রেকর্ড আছে। ডায়েরীর প্রথম পাতায় ও তার কাজটার কথা লিখে রেখেছে। কাজটা হচ্ছে শুধু আমাকে শেষ পর্যন্ত অনুসরণ করা এবং সেই অনুযায়ী ওর কর্তাকে জানান। কিন্তু কি ব্যাপার? লোকগুলোকে তুমি কি আগেই চিনতে?
বন্ড হাসল। সে মনে মনে ভেবে নিয়েছিল এ কথা সে কাউকে জানাবে না। ডাক্তার শ্যাটারহ্যান্ড-এর আসল পরিচয় ফাঁস করে দেওয়ার মানে গোটা ব্যাপারটাকে একেবারে সরকারি করে ফেলা। তা কখনই হবে না। সে বলল, আরে না, না। এই লোকটার মুখ দেখে হঠাৎ আমার মনে হল এর সাথে আমার খুব অশুভ যোগাযোগ আছে কোথাও। সফরে শেষ পর্যন্ত সফল হই বা না হই, আমার দৃঢ় বিশ্বাস এর সাথে আমার যা হোক একটা এসপার ওসপার হবেই। খেলায় ড্র হবে না। কিন্তু তোমাকে এবং সুপারিনটেন্ডেন্ট সাহেবকে আমি একটু ব্যস্ত করব। আমার কিন্তু কিছু প্রশ্ন আছে যাত্রা শুরু করার আগে একটু পরিষ্কার করে নিতে চাই।
টাইগার তার সোনা-বাঁধানো হাসি হেসে বলল, নিশ্চয়ই বন্ধু, তুমি যে তোমার নানারকম অসুবিধা সত্ত্বেও আগে থেকে সতর্ক হতে চাইছ, এ দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি।
.
কিসী সুজু কি
বাকি সকালটা জেমস্ বন্ড যেন অটোমেশন-এর মত কাটিয়ে দিল। প্রত্যেকটি জরুরী জিনিস ঠিক ঠিক মত গুছিয়ে নিল। কিন্তু তার মন আগাগোড়া আচ্ছন্ন করে ছিল সেই লোকটা, সেই ব্লোফেন্ড। যে নাকি স্পেকটার-এর প্রতিষ্ঠাতা। যার উদ্দেশ্য ছিল বিপক্ষ এক ইনটেলিজেন্স তৈরি করা এবং সন্ত্রাস, প্রতিহিংসা, জোর করে আদায় করা, এই সব তার কাজ ছিল।
ন্যাটো গোষ্ঠীভুক্ত সব দেশের পুলিশ তাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সেই লোক, যে নাকি ন মাস আগে ট্রেসীকে খুন করে ছিল। ট্রেসী তার স্ত্রী, তার এক বেলার স্ত্রী। আর এই ন মাসে ওই বুদ্ধিমান শয়তানটা এক নতুন। উপায় ঠাউরেছে। টাইগারের কথা অনুযায়ী ও নাকি এখন মৃত্যু সংগ্রহ করে ফেরে। এই যে এখানে মস্ত উদ্ভিদবিদ সুইশা ডাক্তার শ্যাটারহ্যান্ড সেজে বসে আছে, এটা ওর বহু বছর ধরে বহু ভাওতার একটা, বোধ হয় ব্যাপারটা খুব সোজা। এই করে ও ভেবেছে লোকচক্ষু থেকে একদিন ও সম্পূর্ণ সরে যাবে। আর জাপানই তো গা ঢাকা দিয়ে থাকবার প্রকৃষ্ট জায়গা। ব্লোফেল্ড যে প্রতিভাবান পাগল তাতে সন্দেহ নেই। এই যে দানবীয় কাণ্ডকারখানা, তা সবই ব্লোফেল্ড-এর নিজস্ব বিশাল উপায়ে–যে উপায় অবলম্বনে করেছিল ক্যালিগুলা, নিরো হিটলার এবং আরো যারা মুনষ্য জাতের প্রকাণ্ড শক্ত।
আজ আবার সেই দুই শ পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু ডেভিড যে গোলিয়াথকে মারতে উদ্যত হয়েছে তা নিছক কর্তব্যের তাড়নায় নয়, রক্তে প্রতিশোধের স্পৃহা জেগেছে বলে। কিন্তু সাথে তার কোন অস্ত্রশস্ত্রই থাকছে না। খালি হাত পকেটে দু ইঞ্চি একটা ছুরি, আর একটা লোহার পাতলা শেকল। অবশ্য এই সামান্য অস্ত্র নিয়ে আগেও সে কাজ করেছে, আকস্মিকভাবে কি হয়ে যায় তারই ওপর সব নির্ভর করছে। বন্ড তার সাজ-সরঞ্জামের সাথে একজোড়া সাঁতার কাটার ডানা নিল, পাতলা, সহজপাচ্য মাংস নিল খানিকটা, বেনজের-ড্রাইন আর প্লাসটিকের ফ্লাসক-এ পানি নিল, এবারে সে পুরোপুরি প্রস্তুত।
বড় রাস্তাটা ওরা মোটরে গেল, পুলিশ লঞ্চ জেটিতে অপেক্ষা করছিল। লঞ্চ ছুটল টোয়েন্টি নট বেগে, সুন্দর উপসাগর বেয়ে ওরা গিয়ে পড়ল গেনফাই সাগরে। টাইগার স্যান্ডউইচ এবং দু জনের জন্য এক ফ্লাসক করে সাকে বার করল। খেতে খেতে ওরা পেরিয়ে চলল সবুজ সমুদ্র উপকূল, বালি ঘেরা সমুদ্রের পাড়ে।
