বন্ড মনে মনে অভিসম্পাত করল। আগের রাতের এগ বেনেডিক্ট-এর স্মৃতি তার মনে মধুর হয়ে আছে। কিন্তু এটা কি ধরনের ধ্বংসের ভয়ংকরতা হবে, সেটা জানতে চাইল।
ফাগু হচ্ছে একরকম জাপানি ট্যাপা মাছ। যখন পানিতে থাকে তখন দেখতে লাগে বাদামী পাচার মত। কিন্তু ধরা পড়লে শির দাঁড়া ফুলিয়ে গোল বলের মত পাকিয়ে ফেলে। কখনো-কখনো আমরা ওপরটা শুকিয়ে নিয়ে ভেতর বাতি বসাই। লণ্ঠন হিসেবে ব্যবহার করি। এর মাংস সামো কুস্তিগীরদের প্রধান খাদ্য। এই মাছ খুনী ও আত্মহত্যাকারীদের কাছেও খুব প্রিয়। এর যকৃত এবং বিশেষ কোন শিরায় বিষ থাকে যাতে সাথে সাথে মৃত্যু ঘটে।
ফাগু মাছে ভয়ের কারণ থাকে বলেই প্রত্যেক ফাগু-রেস্তোরাঁয় বিশেষ ওয়াকিবহাল লোক থাকে। সরকারের কাছে তাকে রেজিস্ট্রি করতে হয়।
হোটেলে টাইগারের ঘর নেওয়া ছিল। ফিরে খুব আরাম করে গোসল করল ওরা। নীল টালি ঘেরা ছোট্ট সুইমিং পুল। পানি বেশ গরম, পানিতে গন্ধকের গন্ধ। তারপর পরিপূর্ণ নিশ্চিন্ত হয়ে ওরা যে পথ সমুদ্রের দিকে গেছে সেই দিকে চলল।
রেস্তোরাঁর দরজার মাথার ওপর মস্ত এক ট্যাপা মাছ চিহ্ন হিসেবে টাঙানো। ভেতরে পশ্চিমী ধাচের চেয়ার টেবিল। দেখে বন্ড যেন স্বস্তি পেল। সুন্দর সাদা এক চিনে মাটির প্লেট, প্রায় সাইকেলের চাকার মত প্রকাণ্ড, খুব সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আসা হল। পাপড়ির পর পাপড়ি বসিয়ে মস্ত ফুলের মত সাজানো পাতলা পাতলা টুকরোয় সাদা স্বচ্ছ মাছ। বন্ড টাইগারের দেখাদেখি নিজের চপস্টিক বাগিয়ে বসল। মাছটার কোন স্বাদ নেই। কিন্তু মুখে ভারি ভাল লাগে।
বন্ড ঠেস দিয়ে বসে একটা সিগারেট ধরাল। তাহলে টাইগার আমার শিক্ষা বোধহয়, প্রায় শেষ। টাইগার ওর দিকে তাকাল। তুমি ভালই করেছ বন্ডো-সান। সৌভাগ্যের বিষয় আমার ধৈর্য অনেক এবং স্বীকার করতে আপত্তি নেই, তোমার সঙ্গ-সাহচর্য আমাকে প্রভূত আনন্দ দিয়েছে। খানিকটা মজাও পেয়েছি বটে।
ওরা উঠে যেই খেতে যাবে, সেই সময় একটা লোক বন্ডকে যেন ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল। চৌকো, মোটাসোটা ধরনের লোক, মুখে সাদা মাসুকো । মাথায় এক কুৎসিত চামড়ার টুপি। এ সেই ট্রেনের লোকটা!
বন্ড মনে মনে ভাবল, লোকটা যদি শেষ মুখে ফাকুওকাতে-ও আবার উদয় হয় তাহলে ওকে আমি পাকড়াব। আর যদি না হয় তাহলে ঘটনা-কে অগত্যা কৌতুককর কাকতালীয় বিভাগে সাথে দিতে হবে।
.
দ্বিতীয় পর্ব
পৌঁছে যাবার পর অশুভ যোগাযোগ
ওদের জন্য ফাকুওকা এলাকার পুলিশ প্রধানের গাড়ি এল ঠিক ভোর ছটায়। সামনের আসনে দু জন অধস্তন পুলিশ অফিসার বসে। সমুদ্রের ধার ধরে যে রাস্তা উত্তরমুখো গিয়েছে সেই রাস্তা দিয়ে ওদের গাড়ি বেশ বেগে ছুটে চলল। কিছুক্ষণ পরে বন্ড বলল, টাইগার, কেউ আমাদের পিছু নিয়েছে। যে লোকটি আমার মানিব্যাগ চুরি করেছিল তাকে কাল রাতে আমি ফাগু রেস্তোরাঁয় দেখেছি। সেই লোকটি এখন মাইল খানেক তফাতে মোটর সাইকেলে করে আমাদের ধাওয়া করেছে। টাইগার একবার পিছন দিকে তাকিয়ে ড্রাইভারকে দ্রুত কি সব নির্দেশ দিল। ড্রাইভারের পাশে বসা পুলিশ অফিসারটি কোমর থেকে এম-১৪ অটোমেটিকটা বের করল।
ওরা বাঁ দিকে বাঁকের মুখে এল। রাস্তাটা গিয়ে শেষ হয়েছে ঝোপে-ঝাড়ে। রাস্তার বাইরে আড়াল করে গাড়িটাকে দাঁড় করানো হল। তারপর ওরা শুনতে লাগল কান পেতে একটা মোটর সাইকেলের আওয়াজ মিলিয়ে গেল। ড্রাইভারটি গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে রাস্তায় পড়ল তারপর পিছু পিছু চলল। টাইগার বন্ডকে বলল, আমি বলেছি গাড়ির সাইরেন বাজিয়ে লোকটাকে আগে একবার হুশিয়ার করে দিতে, তাতে যদি না থামে তবে যেন ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেয়।
আঁকা বাঁকা রাস্তার ওরা প্রায় আশি মাইল বেগে ছুটছিল। একটু পরেই সামনে মোটর সাইকেলটাকে দেখা গেল। লোকটি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে তার সাদা মুখোশটা ঝসে উঠল। আস্তে আস্তে ব্রেক চেপে থামিয়ে দিল গাড়িটা। ডান হাতটা ঢুকাল তার জ্যাকেটের ভেতর। বন্ডের এক হাত তখন দরজার হাতলে। ও বলল, দেখ টাইগার, লোকটার কাছে বন্দুক রয়েছে। ওরা লোকটার পাশে এসে দাঁড়াতেই বন্ড দরজার খুলে সটান লোকটার ওপর লাফিয়ে পড়ল, তার গাড়ি-টাড়ি সবশুদ্ধ নিয়ে গড়িয়ে পড়ল। ড্রাইভারের পাশে বসা পুলিশ অফিসারটিও লাফ মারল শূন্যে। তারপর ওদের দুটো শরীর ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে করতে গড়িয়ে খানায় গিয়ে পড়ল। প্রায় সাথে সঙ্গেই পুলিশ অফিসারটি উঠে দাঁড়াল। তার হাতে একখানা রক্তমাখা ছুরি। ছুঁড়ে ফেলে দেয় সেটা দিয়ে লোকটার শার্ট আর কোট ছিঁড়ে ফালা ফালা করে। লোকটির মুখোশটি খুলে পড়ে যায়। বন্ড তার মুখে মৃত্যুর বীভৎস ছায়া দেখতে পেল। দেখা গেল একটা কালো উলকি লোকটির হাতে আঁকা রয়েছে। টাইগার বলল, ও লোকটা ব্ল্যাক-ড্রাগন।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ অফিসার দুজনকে টাইগার কি সব আদেশ দিল। তারা লোকটার জামাকাপড় খুঁজে কতকগুলো সাধারণ ব্যবহার্য জিনিস বার করল। তার মধ্যে ছিল বন্ডের সেই মানিব্যাগ। পুরোপুরি পাঁচ হাজার ইয়েন তখনো ভরা। আর একটা সস্তার ডায়েরী। সব তারা টাইগারের হাতে তুলে দিল। তারপর মৃতদেহটাকে খানা থেকে তুলে টেনে হিঁচড়ে গাড়ির পিছনে নিয়ে তুলল। তারপর সকলে গিয়ে গাড়িতে উঠল।
