বন্ড লক্ষ্য করল কিছু টাকা এ-হাত ও-হাত হল। টাইগার আর সেই লোকটির মধ্যে বেশ হৃদতাপূর্ণ কথাবার্তা এবং শেষবারের মত মাথা নোওয়ানুয়িও হল।
তারপর ওরা দুজনে উঠল গিয়ে গাড়িতে। গাড়ি চলল গ্রামের ভেতরে। সেখানে এক রেস্তোরাঁয় ওদের অভ্যর্থনা করে নিয়ে গিয়ে বসাল। টাইগার অর্ডার দিল। পশ্চিমী কায়দায় ওরা চেয়ারে টেবিলে বসল। যথারীতি গালে টোল খাওয়া এক মেয়ে এসে সাকে দিয়ে গেল। তারপর এল স্টীক তার সাথে রসা রসা আরও ছোটখাটো জিনিস, মাংসটাকে কোনরকমে কাঁটা দিয়ে কায়দা করা গেল এবং বাস্তবিকই সেটা বন্ডের সবরকম অভিজ্ঞতার বাইরে। অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে মাংস খেতে খেতে টাইগার বন্ডের সাথে কথা বলতে শুরু করল। আমাদের সারভিসের এক অতি গোপন শিক্ষাকেন্দ্রে তোমাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এই পাহাড়ের এক সুরক্ষিত দুর্গে। তার নাম হচ্ছে সেন্ট্রাল মাউন্টেনিয়ারিং স্কুল। সেখানে আমার এজেন্টরা জাপানের সবচেয়ে ভয়ংকর এক কলাকৌশল রপ্ত করে। এই কৌশলকে বলে বুনিডো বা যোদ্ধার নানাবিধ উপায়। এখন তারা নিনজা -র কৌশল শিখছে। আমার তো মনে হয় তুমি আগ্রহী হবে এবং নিজের থেকে কিছু শিখবে এখানে। আমার প্রধান এলাকা হচ্ছে চীন, কোরিয়া এবং প্রাচ্য রাশিয়া। এ-সব জায়গায় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সহ ধরা পড়া মানেই হচ্ছে মেনে নেওয়া যে, তুমি অপরাধী। আমার লোকেরা অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াই খুন করবে এটা ধরে নেওয়া যায়।
বন্ড জানাল যে বিনা অস্ত্রে লড়াই করার একরকম কম্যান্ডো ট্রেনিং স্কুল তাদেরও আছে। সদর দপ্তরের সাথে যুক্ত।
রাস্তায় ধুলো উড়ছে। গাড়িতে উঠে বন্ডের কেমন যেন মনে হল, পেছনের কাঁচ দিয়ে তাকিয়ে দেখল, বহু দূরে মোটর সাইকেলে চেপে কে যেন আসছে। একটা ছোট রাস্তা দিয়ে যখন ওরা ঢুকল তখন বন্ড লক্ষ্য করল মোটর সাইকেলটা আসছে। দুর্গটি পাহাড়ের চূড়ার মাঝামাঝি; এক সময় জায়গাটা ছিল গিরিখাদ। টাইগার তার পাস দেখাতে সাদা পোশাক পরা রক্ষীদের মধ্যে ভীষণ ফিসফাস মাথা নোওয়ানুয়ির ধূম পড়ে গেল, সেই প্রকাণ্ড দুর্গের একেবারে ওপরের তলা থেকে ঘণ্টা বাজল। গাড়িটা গিয়ে থামতে চারদিকের দরজা দিয়ে খাটো জামা এবং জিমন্যাসটিক জুতা পরা সব তরুণেরা তেড়ে এল। এসে তারা তিনজন বয়স্ক লোকের পেছনে সারি বেঁধে দাঁড়াল। টাইগার রাজার মত গাড়ি থেকে নামতে প্রায় আভূমি নত হল ওরা, টাইগার এবং বন্ডও মাথা নোয়াল। তারপর টাইগার হঠাৎ জাপানি ভাষায় তুবড়ি ছোটাতে লাগল। একেবারে শেষে হাইটনাকা-সান বলার পর সেই দলপতিরা জনা বিশ বাইশ ছাত্রদের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ওদের মধ্যে দুজন দল থেকে আলাদা হয়ে দুর্গের মধ্যে ঢুকে গেল। টাইগার বন্ডকে বুঝিয়ে দিল, ওরা এখন পোশাক ভাড়াবে তারপর পাহাড়ের যে পথে আমরা এসেছি সেখানে যাবে। কেউ যদি পিছু নিয়ে থাকে তাহলে ওরা তাকে পাকড়ে নিয়ে আসবে আমাদের কাছে।
এবার আমরা দেখব দুর্গ আক্রান্ত হলে কি হবে, তার মহড়া। বন্ড টাইগারের পিছু পিছু সেই গড়মাইয়ের ওপর বাধানো পথে গিয়ে দাঁড়াল। অনেকক্ষণ ধরে ইনস্ট্রাকটারের সাথে টাইগারের উত্তেজিত কথাবার্তা চলল। মিনিট পনের পরে ওপরের র্যামপার্ট থেকে একটা হুইল-এর শব্দ আসতে দশজন লোক জঙ্গল থেকে গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে এল বা দিক পানে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাদের কালো কি জিনিসে যেন ঢাকা–চোখে কালো পট্টি বাধা। গড়মাইয়ের পানির ধারে তারা ছুটে গেল। কালো প্রকাণ্ড পাঁচিলের নিচে গিয়ে তারা পৌঁছাল। তাদের কালো পোশাকের পকেট থেকে লম্বা একগাছা দড়ি আর লোহার ছোট আঁকশি বার করল। তারপর দৌড়ে প্রায় মাকড়শার মত দ্রুত দেওয়াল বেয়ে উপরে উঠতে লাগল তারা।
টাইগার বন্ড-এর দিকে ঘুরে বলল, কিছুদিনের মধ্যে তুমিও এই ধরনের কিছু করবে হয়ত। টাইগার বন্ডকে বলল, চল আমরা এবার ওদিকে যাই। আক্রমণকারীরা পাঁচিল টপকেছে এবার ওরা প্রতিপক্ষের ওপর বোজ্ঞসু প্রয়োগ করবে।
উঠানে ফিরে এসে ওরা দেখল, দু জন দু জন করে লোক নামছে, হাত কয়েক লম্বা আসাসোটা নিয়ে ভীষণ লড়াই করছে। বন বন করে ঘোরাচ্ছে, কৌশলে পাশ কাটাচ্ছে, আসাসোটাকে বর্শার মত পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিচ্ছে– আরো কত রকম জটিল কাণ্ড করছে। তলপেটে যেভাবে মারছে, বিধিয়ে দিচ্ছে তাতে সেই লোক কি করে অবিচল খাড়া থাকে তাই দেখে বন্ড অবাক হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আক্রমণকারীদের আস্তে আস্তে ওদের প্রতিপক্ষে কজা করে ফেলেছিল। এই সময় হুইসল-এর এক তীক্ষ্ণ শব্দ ভেসে এল। খেলা শেষ হল। টাইগার খুব সংক্ষেপে কিন্তু জোরাল এক বক্তৃতা করল। বন্ডকে পরে সে ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে দিল, ওটা তাদের এই খেলার আন্তরিকতার জন্য অভিনন্দনজ্ঞাপন।
এরপর বন্ডকে নিয়ে যাওয়া হল দুর্গের ভেতরে চা-টা খাওয়াবার জন্য আর নিনজা অস্ত্রশস্ত্রের প্রদর্শনশালা দেখাতে। তাতে ছিল খোঁচা খোঁচা ইস্পাতের চাকা–দেখতে একটা রূপার ডলারের মত। ওটা আঙুল ঘুরিয়ে ছুঁড়ে দিতে হয়। নানারকমের হাতের পাঞ্জা, দস্তানা-দস্তানার চেটোতে ভীষণ ধারাল, একটু আঁকশির মত কাটা বসানো। এর সাহায্যে দেওয়াল কিংবা শীলিং-এ হেঁটে বেড়ানো যায়। তাছাড়া এই ধরনের আরো সব সেকালে অস্ত্র–যা একই সাথে আক্রমণ এবং প্রতিরোধ করার জন্য তৈরি। বন্ড মুখে ঠিক-ঠিক সায় দিয়ে গেল এবং বিস্ময় প্রকাশও করল। যদিও সে তখন মনে মনে ভাবছিল রুশরা এই জাতীয় জিনিস কি দারুণ আবিষ্কার করেছে। জার্মানদের বিরুদ্ধে সেগুলো তারা অত্যন্ত সাফল্যের সাথে ব্যবহারও করেছিল। ওদের এক রকম সায়োনাইড গ্যাস পিস্তল আছে যাতে এতটুকু সূত্র না রেখে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে দেওয়া চলে যে, আক্রান্ত ব্যক্তি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছে।
