টাইগার যেন একেবারে হারিয়ে গেল। বন্ড নিজেও তো বহুবার এই দুরন্ত স্মৃতির অরণ্যে ঘুরে ফিরেছে। সে নিজের গ্লাস তুলে ধরল। হাঁটু গেড়ে বসে থাকা মেয়েটি মাথা নোয়াল এবং ঢেলে দিল সাকে।
ইস্তফা দিলাম আমি কেসপিই তাই-তে। জাপানে ফিরে ঢুকলাম কামী কাজের ট্রেনিং স্কোয়াড্রন-এ। সেই সময় আমাদের এয়ার ক্র্যাফট ফুরিয়ে আসছিল, তাই কাঠের তৈরি ছোট্ট একরকম প্লেন যার নাম বাকু তাই আমরা বেশি করে ব্যবহার করতে লাগলাম। এটা চালানো খুবই কঠিন, হাজার পাউন্ডের বিধ্বংসী জিনিস তাতে রাখা যেত। এর কোন ইঞ্জিন ছিল না। ফাইটার বহুবার-এর পেটের ভেতর থেকে বেরোত। পাইলটের কাছে দিক নিয়ন্ত্রণের একটি মাত্র ব্যবস্থা থাকত। বিমান আক্রমণ যখন ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ে তখন তা দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি ভয়ঙ্কর। সেই সব তরুণের গায়ে ধবধবে সাদা শার্ট, মাথায় জড়ানো সেকেলে সাদা স্কার্ফ, এরপর ইঞ্জিনের গর্জন; স্পাইদের কাছ থেকে খবর পাওয়া কিংবা রেডিওতে ধরা-পড়া কোন সুদূর লক্ষ্যের পানে প্রথম ভোরের আলোয় অথবা দিনান্তের শেষ আলোয় যাত্রা করা।
তুমি জান বিমান যুদ্ধের ইতিহাসে কামী কাজে এমন এক বাহিনী যাদের সম্বন্ধে খুব কম দাবি করা হয়েছে। যা সত্যি তার চেয়ে অনেক কম! তোমার ভাগ্য ভাল তুমি অভিমানে বেরবার আলো আত্মসমর্পণ হয়ে গিয়েছিল।
হয়ত কিন্তু তবু বন্ডো-সান, মনে মনে আজও আমি এই স্বপ্ন পালন করে চলি যে, আমি আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়ছি অ্যান্টি এয়ার ক্র্যাফটে। যেখানে থেকে অবিশ্রান্ত অগ্নিবর্ষ গোলা ছুটছে, দেখতে পাচ্ছি ভয়ার্ত ক্ষুদে ক্ষুদে সব। চেহারা আশ্রয়ের সন্ধানে ফ্লাইট ডেক থেকে ছুটে পালাচ্ছে জানাচ্ছে একশ কি তার বেশি শক্রকে তোমাকে মারতে হবে, ধ্বংস করতে হবে দশ লক্ষ মূল্যের যুদ্ধাস্ত্রকে। সব করতে হবে তোমার নিজের বুদ্ধি বল। এই সমস্ত ব্যাপারটা যার মাথা থেকে বেরিয়ে ছিল, সেই অ্যাডমিরাল ওমেশি আত্মহত্যা করেছিলেন অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে। যখন তুমি। আত্মহত্যা করতে তখন তোমার দু জন প্রাণের বন্ধুকে সাথে থাকতে বলবে। যদি তুমি নিজে না পার তাহলে তারাই তোমাকে যাতে খতম করে দিতে পারে।
সারাদিন ধরে তিনি বসে রইলেন, বসে বসে কেবলি নিজের ভিতরের কথা ভেবে চললেন। ভাবতে ভাবতে শেষে মারা গেলেন।
সম্রাটের কাছে ক্ষমা-ভিক্ষার এক অতি আন্তরিক প্রযত্ন! টাইগার হাত ছুঁড়ল হাওয়ায়।
যাক গে, আমি তোমার রাতে খাওয়াটা মাটি করতে চাই না। দেখতে পাচ্ছি আমাদের কিছু কিছু আচার-ব্যবহার তোমাদের কোমল পাশ্চাত্য রুচিকে আঘাত করছে। ওই যে গলদা চিংড়ি আসছে। ওদের সামনে প্লেটে সাজিয়ে রাখা হল মস্ত মস্ত গলদা। বন্ড হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল মাছটা কাঁচা। সে ভয় পেয়ে গেল।
টাইগার বলল, খেয়ে নাও। এটা জাপানের অতিশয় সুখাদ্য। আশা করি তুমি শিগগিরই জাপানি জীবন যাত্রার। সাথে পরিচিত হয়ে উঠবে।
.
উচ্চ শিক্ষা
সারি সারি প্রকাণ্ড সব গাছ ক্রিপটো মেরিয়ার, তারই ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল টাইগার আর বন্ড। ওরা দাঁড়িয়ে দেখছিল তীর্থযাত্রীরা কিভাবে সূর্য দেবীর প্রার্থনা করছে। শিনটো ধর্মের সবচেয়ে বড় মন্দির।
বন্ড ভীড়ের মধ্যে সকলের সাথে মন্দিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। সে মাথা নোয়াল, জালের ভেতর দিয়ে একটা মুদ্রা ছুঁড়ে দিল। টাইগার বলল, চল গাড়িতে ফিরি, এখান থেকে আমরা আর এক অনুষ্ঠানে যাব। তাতে তুমি অংশ নেবে।
শিনটো মন্দিরে ঢোকবার মুখে মস্ত তোরণ। ছেলেমেয়েদের ভীড়, মেয়েদের গায়ে ঘন নীল পোশাক, পায়ে কালো সূতির মোজা। টাইগার সেই ভীড়ের মধ্যে দিয়ে পথ করে এগিয়ে চলল। টাইগার বন্ডকে বলল, আজ তোমাকে কেউ আর বিদেশী বলে চিনতে পারছে না। তোমার চেহারার উন্নতি তো হয়েছেই কিন্তু তোমার আদব কায়দারও যথেষ্ট। উন্নতি হয়েছে। বেশ একটা আত্মনির্ভরতার ভাব এসেছে। যতটা বোকা বোকা তুমি ভাব তা একেবারেই নয়।
পাহাড়ের ওপারে পুরানো রাজধানী কায়াতো। যাবার পথে ছোট্ট এক গ্রাম ওয়াডাকিন। টাইগার আগেই ড্রাইভারকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল সুতরাং তাদের কেরাঞ্চী গাড়ি গলির ভেতর গোলা ঘরের মত দেখতে এক লম্বা গোছের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল।
গরু আর গোবরের উৎকট গন্ধ। যে নাকি প্রধান রাখাল সে এগিয়ে এসে ওদের অভ্যর্থনা করল। স্কটল্যান্ড এবং টাইরল-এর রাখালদের মত এরও আপেলের মত গাল আর বুদ্ধিদীপ্ত অথচ সদয় দৃষ্টি। টাইগারের সাথে তার বহুক্ষণ ধরে কথাবার্তা হল।
রাখাল লোকটি বিয়ার-এর বোতলের একটা পেটি বার করল টেনে; তার থেকে একটা বোতল খুলে সে বন্ডের হাতে দিল। বন্ড কোন রকমে মুখ খোলার আগে টাইগার হুকুম করল, গরুটাকে খেতে দাও।
বন্ড বোতলটা নিয়ে খুব সাহস করে গরুটার কাছে গেল। বন্ড বোতলটা খুলে গরুর মুখে ঢেলে দিল। গরুটা খসখসে জিব দিয়ে বন্ডের হাত চেটে দিল প্রকাশ করল বহু কৃতজ্ঞতা।
বন্ড টাইগারের সমস্ত রকম খাম খেয়ালে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। টাইগার তাকে যত রকমের পরীক্ষা করুক, একেবারে কামী-কাজে -র ধাচে খেলা দেখাতে সে বদ্ধপরিকর।
টাইগারের অনুরোধে বন্ড এবার একটা বোতল থেকে কাঁচা জিন মুখ ভর্তি করে নিয়ে গরুর গায়ে কুলকুচি করে দিল। তারপর আচ্ছা করে গরুটাকে দলাইমলাই করতে লাগল আর গরুটা আরামে যেন গলে যেতে লাগল।
