জনাকীর্ণ মেন স্টেশন দিয়ে টাইগার এগিয়ে চলেছে। পেছনে বন্ড। সে সত্যিই এখন নতুন লোক। বন্ডের মুখ আর হাতে হালকা বাদামী ছোপ, তার কাল চুলে চপচপে তেল, চুল ছোট করে ছাঁটা, বড়জোর কপালের মাঝ বরাবর পৌঁছবে, ভুরুর কোণ কামানো, যাতে ওপরের দিকে ঠেলে তুলতে সুবিধে হয়েছে। আর পাঁচটা যাত্রীর মতই তার পোশাক পরনে। কাঁধে ঝোলানো জাপানি এয়ার লাইনস-এর একটা ব্যাগ–বহু ব্যবহারের ছাপ তাতে। ব্যাগের ভেতর একটা জামা প্যান্ট মোজা, মিনসেই সিগারেট আর কিছু টুকরো কাগজ। আর আছে প্রায় দু-ইঞ্চি ফলা যুক্ত এক পকেট নাইফ। যাত্রীদের ভীড়, ধাক্কাধাক্কি তবু বন্ড ঠিক মিশে যেতে পেরেছিল সেই জনতার মধ্যে। হামামে তার ছদ্মবেশ সারা হলে মারিকো তাকে পোশাক পরাতে পরাতে বলেছিল, এই যে জাপানি ভদ্রলোক! তারপর তার অনুমোদনের সাক্ষ্যস্বরূপ এক দীর্ঘ চুমু। সেই সময় টাইগারের টোকা পড়ে পার্টিশানে।
টাইগার বলেছিল কোন এক সময় ডিকো তোমার বড় কর্তাকে জানিয়ে দেবে যে তুমি আমার সাথে টোকিওর বাইরে গেছ। সেই ম্যাজিক প্রতিষ্ঠানে। সেখানে কয়েকদিন থাকবে। ডিকো সব কথা বিশ্বাস করেছে, আমার নিজের দপ্তর শুধু জানে যে আমি কয়েকদিন থাকব না। গেছি ফাকুওকা। তুমি যে আমার সাথে যাচ্ছ একথা তারা জানে না। আমরা এখন ট্রেনে করে যাব গামাগোরি, দক্ষিণ উপকূলে। সেখান থেকে সন্ধ্যে নাগাদ আতসুমি এবং আইস বে হয়ে মাছের আড্ডা তোবা। ওখানেই রাত কাটাব। তোমাকে জাপানি রীতিনীতি, লোকাঁচার–এসব আমার শিখিয়ে দেওয়া দরকার যাতে সময় এলে ভুলটা একটু কম হয়।
বন্ডকে সাথে নিয়ে টাইগার ট্রেনে চাপল। টাইগার তাকে কিছু আদব কায়দা শিখিয়ে দিল। তারপর বলল, এখন চল আমরা ডাইনিং কার এ গিয়ে কিছু পান আহার করি।
চপস্টিক নিয়ে বন্ড যুদ্ধ করতে লাগল। সাথে রূপালি অক্টোপাস এবং একথালা ভাত। খেতে খেতে দেখতে লাগল দূরের উপকূল ফলার মত ভেসে আছে, মাঝে মাঝে সোনালি ধানক্ষেত ঝলমল করে উঠছে। সে যখন ভাবনায় ডুবে গিয়েছিল, হঠাৎ পেছন থেকে এক ধাক্কা। দেখল তার মানিব্যাগটা নেই। টাইগার শুনে খুব অবাক হল, জাপানে এ ধরনের ঘটনা ভাবাই যায় না।
গামাগোরিতে ওরা ট্রেনে থেমে নেমে গেল। সমুদ্রের ধারে ভারী ছিমছাম সুন্দর গাঁ। মাঝখানে একটা দ্বীপ জেগে আছে। টাইগার বলল, ওখানে নাকি এক নামকরা মন্দির আছে। সমুদ্রের তীর ধরে ঘণ্টা খানেকের রাস্তা, কিন্তু ভারি চমৎকার।
ওদের জন্য সবাই অপেক্ষা করছিল। যেতে যথেষ্ট খাতির করল তারা। ভারি সুশ্রী সুন্দর মুখখানা, সুন্দর চায়ের কাপ, কাগজে জড়ানো সুন্দর মিষ্টি, খোলা পার্টিশনের সামনে গিয়ে বসল বন্ড, সামনেই একখানি বাগান–তারপরই উঠেছে সমুদ্রের চওড়া দেওয়াল।
বন্ড পানির ওপারে তাকাল। মরনিং কোট আর বাওনার হ্যাট পরা একটি লোকের প্রকাণ্ড এক স্ট্যাচু। টাইগার বলেছিল ওটা মিঃ মিকিমোতো-র স্ট্যাছ। ঝুটো মুক্তা শিল্পের তিনি প্রতিষ্ঠাতা।
বন্ড ভাবছিল, একি প্যাঁচে পড়লাম আমি? জাহান্নামে যাক টাইগার আর তার যত বদু পরিকল্পনা। বিছানারসাথেএকটা মুকাতা। টাইগার এসে তাকে হুকুম করল সেটা পরে নিতে। টাইগার সাকের অর্ডার দিল।
সাকে এল। অতি মিষ্টি দেখতে এক পরিচারিকা হাঁটু গেড়ে বসে ওদের দুজনকে ঢেলে দিল। টাইগার কি যেন ভাবছিল। গামলা গামলা সাকে সে আনতে বলেছে। বন্ড নিজেরটা এক ঢোকে শেষ করে ফেলল। টাইগার বলল, বন্ডো-সানো, তোমার গ্লাস তোল। নইলে মেয়েটি তো সাকে চলিবে না।
বেশ, তুমি আমাকে কামী-কাজের কথা জিজ্ঞেস করছিলে। টাইগার বসে দুলতে লাগল, ওর কালো, লোলুপ চোখ হয়ে উঠল তন্ময়। বন্ডের দিকে সে তাকাল না। বলতে লাগল, প্রায় বিশ বছর আগের কথা, আমাদের দেশের অবস্থা তখন খারাপ। বার্লিনে এবং রোমে আমি তখন দেশের হয়ে ইনটেলিজেন্স-এর কাজ করি। যুদ্ধ সীমান্ত থেকে আমি দূরে রয়েছি। প্রত্যেক রাতে রেডিও শুনি, কেবলই খারাপ খবর। মার্কিন বাহিনী একটু একটু করে কিন্তু সুনিশ্চিতভাবে এগোচ্ছে। এইটুকু বুঝেছিলাম আমাদের দেশের খুব বিপদ, যে করে হোক আমাকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। এক দুরন্ত আবিষ্কারের কাহিনী। এই স্বর্গীয় ঝড় ত্রয়োদশ শতকে কুবলাই খানের নৌ-বাহিনী ধ্বংস করে, আক্রমণের হাত থেকে আমার দেশকে রক্ষা করেছিল। মনে মনে নিজেকে বললাম, মরতে হয় তো এই রাস্তা কোন পদক নয় কিন্তু সুষ্ঠু সম্পূর্ণ মৃত্যু, নইলে আত্মহত্যাও করা যায়–তবে সব কিছুই শত্রুপক্ষের বহু কিছুর বিনিময়ে। আমার তো মনে হল, ব্যক্তিগত লড়াইয়ের এমন গৌরবজনক উপায় আর কখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আমার বয়স তখন চল্লিশের কাছাকাছি। জীবনে আমি অনেক কিছু দেখে নিয়েছি। আমার মনে হল, কম বয়সী কারুর জায়গায় আমি যেতে পারি, কৌশলটা খুব সহজ। প্লেনকে পাইলট করা যে কেউ শিখে নিতে পারে। যুদ্ধ বিমানেরসাথেযে সব রক্ষী বিমান থাকে, তাদের ভিড়িয়ে দিতে হয় লড়াইয়ে। দিয়ে তখন তুমি তাক করবে বড় বড় জাহাজ, বিশেষ করে এয়ার ক্র্যাফট কেরিয়ারের ওপর।
জাহাজ হলে তুমি তাকে তলায় রেখে ফ্লাইট ডেক উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করবে। আর, কেরিয়ারের লিফটই হচ্ছে। আসল, সেটা দেবে উড়িয়ে। ব্রিজ কিংবা পানির লাইনের দিকে নজর দেবার মোটে দরকার নেই, ওসব জায়গায় জোর শসস্ত্র পাহারা ওই ফ্লাইট ডেকের সহজভেদ্য কলকব্জাই আগে সাবাড় করবে। বুঝলে?
