আত্মহত্যা করলে সম্মানের চেয়ে অসম্মানই বেশি হয়। এটা একটা দারুণ কাপুরুষতা। বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারার অক্ষমতা। সম্মান আমাদের কাছে জীবনের চেয়ে বড়। গর্বের বস্তু, শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য। বন্ড-এর মতে এই আত্মহত্যা করা ব্যাপারটা জাপানে এক ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটাও এক ধরনের হিংসাশ্রয়ী মনোভাব যা জাপানের ইতিহাসকে আগাগোড়া আচ্ছন্ন করে আছে। টাইগার বলল, জাপানিতে জিমাৎসু কথাটির আক্ষরিক অর্থই হল আত্মহত্যা। যদিও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে এ এক ভয়ংকর রাস্তা কিন্তু তোমাদের দেশে যেমন এই নিয়ে হৈ চৈ। পড়ে যায় আমাদের তা হয় না। টাইগার গর্বের সাথে বলে ওঠে, প্রত্যেক বছর পঁচিশ হাজার জাপানি আত্মহত্যা করে। বুরোক্র্যাটরা কেবল এতে লজ্জা পায়। আর আত্মহত্যা দেখতে যত বাহারী হবে লোকের বাহবাও পাবে তত।
টাইগার, তুমি হচ্ছ রক্ত পিপাসু মাগী হারামজাদা। কিন্তু তোমার এত বক্তিমের মানে কি? এ সবের সাথে তোমার বন্ধু শাটারহ্যান্ড আর তার সেই বাগানের-ই বা কি সম্পর্ক
আছে, বন্ডো-সান। বুঝতে পারছ না ডাক্তারের সেই বিষোদ্যান সমস্ত জাপানে কি আদর্শ জায়গা হয়ে উঠেছে। আত্মহত্যা করার! অবশ্য সবটাই যেন ডাক্তারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হচ্ছে। ওখানে ব্যবস্থা সবই আছে। আমাদের বিখ্যাত রোমান্স একসপ্রেসে চড়ে কাটোয়া যাওয়া, নৌকা যোগে সমুদ্র ভ্রমণ আর সেই সাথে জাপানের ইতিহাস দর্শন। তারপর গা ছমছমে প্রাসাদের পাঁচিল; পাঁচিলের ওপারে সেই রহস্যময় মৃত্যুপুরী। পারলে পাঁচিল টপকাবে, নয়ত খাবার-দাবারের কোন গাড়ির সাথে ফাটা করে ভেতরে চালান যাবে। তারপর সুন্দর বাগানের মধ্যে দিয়ে একাকী দোহে হাতে হাত রেখে শেষ পরিণামী হাঁটা। জাপানিরা পাচিংকো খেলতে খুব ভালবাসে। সে এক রকমের প্রচণ্ড জুয়া খেলা। সেটা বলে দেবে কোন্ বলে তোমার কোন নম্বরটি পড়েছে! কেমন মৃত্যু হবে, সহজ না যন্ত্রণার? যদি তুমি তাড়াতাড়ি শেষ হতে চাও তো হাতের কাছে রয়েছে টগবগে আগ্নেয়গিরি রন্ধ্র। যে কোনটারই উত্তাপ হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। জায়গাটা হচ্ছে মৃত্যুর এক বিভাগীয় বিপনি। ভাল মানুষ ডাক্তার অবশ্য এতে দারুণ বিরক্ত। সে কড়া নোটিশ দিয়েছে–মড়ার খুলি টাঙিয়ে লোককে সাবধান করে দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো উল্টে বিজ্ঞাপনের কাজ করে। নিজে খরচা করে প্রকাণ্ড এক বেলুন পর্যন্ত উড়িয়ে রেখেছে ক্যাসল-এর ছাদ থেকে। তাতে লেখা থাকে অনধিকার প্রবেশ করলে শাস্তি হবে। এত সাবধানতা সত্ত্বেও ডাক্তারের সেই আকাশের গায়ে ওড়া বেলুন যেন লোককে হাতছানি দিয়ে ডাকে। বন্ড জানতে চাইল লোকটাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন?
টাইগার জানাল, লোকটাকে গ্রেফতার করব কোন্ সুবাদে? এক সম্মানিত বিদেশীর দশ লক্ষ পাউন্ডের এই উদ্যোগ, তার আবাসকে জ্বালিয়ে দেব? দায়ী যদি কাউকে করতে হয় তো জাপানের মানুষকে করতে হবে। হয়ত এটা বলা যায় যে ডাক্তার আরো জোরদার পাহারার ব্যবস্থা করতে পারে। তোমাকে আগেই বলেছি যে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচশোর ওপর। আর এই নিয়ে প্রচুর প্রচারও চলেছে। লোকে আরো ঝুঁকবে ঐ মৃত্যুপুরীর দিকে। যেমন করে তোক এসব বন্ধ করতেই হবে।
তদন্ত কমিশন গেছে ওখানে। ডাক্তার কমিশনকে জানিয়েছে সবরকম সহায়তা করতে সে প্রস্তুত শুধু তার এই প্রচেষ্টাকে যেন বাতিল করা না হয়। কেননা এতেই তার প্রাণ। এছাড়া ডাক্তার আর একটা প্রস্তাব দিয়েছে, একটি গবেষণা কেন্দ্র সে খুলতে চায়–তার গাছপালা, গুল্ম থেকে যে বিষ তোলা হবে সেগুলোর নির্যাস সে বিনা পয়সায় কোন উপযুক্ত চিকিৎসা কেন্দ্রকে দান করে দেবে।
ভোর চারটে। সাকের শেষটুকু বন্ড ঢেলে নিল। এতক্ষণ তার ঝিম আসছিল। রাত কাবার হতে চলেছে তবু টাইগার যেন অবিচল। ওর ওই সামুরাই মুখ হয়ত আরো ভয়ংকর আরো ত্রুর রেখার আঁকা। সে খানিকটা উত্তেজিত।
জেমস বন্ডের মনে হচ্ছিল সে যেন এক স্বপ্নের মধ্যে বিচরণ করছে। ছোট্ট ঘর, কাগজ আর মোডার-এর পাতলা তক্তার পার্টিশান, রহস্যে ঢাকা এক বাগান। আসন্ন প্রভাতে রাঙা আকাশ। যে কথা বলতে টাইগার তাকে এখানে ডেকেছে আজ! কিন্তু কেন? বন্ড নিজেকে টেনে তুলল তার ঐ ঘুম ঘুম জড়তা থেকে। সে উঠতে গেল চেয়ার ছেড়ে। টাইগার বলল, বসো, বন্ডো-সান। তোমার দেশের প্রতি যদি কিছুমাত্র ভক্তিশ্রদ্ধা থাকে তাহলে তুমি কালই রওনা হয়। যাবে। টোকিও মেন-স্টেশন থেকে বারোটা কুড়ির মধ্যে তোমাকে যেতে হবে ফাকুওকা। হোটেলে আজ আর তুমি ফিরতে পারছ না। ডিকোর সঙ্গেও তুমি দেখা করতে পাবে না। এখন থেকে শুধু আমার হুকুম-ই তামিল করতে হবে।
বন্ড ধড়মড় করে উঠে বসল। যেন কেউ তাকে ডান্ডা মেরেছে। টাইগার আবার বলতে শুরু করল, বন্ডো-সান আমি তোমাকে সরাসরি বলছি। তুমি আঘাত পেয়ো না। কেননা আমার দুজনে বন্ধু। আমি বা আমার মত যারা জাপানের হর্তাকর্তা হয়ে আছে, বৃটিশদের সম্বন্ধে তাদের ধারণা ভাল নয়। তোমাদের সরকার যে শাসন সংক্রান্ত ব্যাপারে কত অক্ষম তা দিন দিন প্রমাণিত হয়েছে; দেশের সব কিছু তোমরা ক্রমে ক্রমে তুলে দিয়েছ ট্রেড ইউনিয়নের হাতে। তোমাদের নৈতিকতাকে আজ কোথায় নামিয়েছে। অথচ বৃটিশ জাতির নৈতিকতা একদিন সারা পৃথিবীর। প্রশংসা কুড়োতো। তার জায়গায় আমরা দেখি দলে দলে শূন্যগর্ভ লোক, যাদের কোন লক্ষ্যের ঠিক নেই। বন্ড হেসে উঠল। তারপর বলল, এ সব কথা লিখে তোমার টাইমস-এর পাঠিয়ে দেওয়া উচিত ছিল–জনৈক অশীতিপর এই নাম দিয়ে। তুমি একবার ইংল্যান্ডে এসে স্বচক্ষে সব দেখ। তাহলেই বুঝতে অবস্থা অত কিছু খারাপ নয়। সে আরো বলল, তোমরা নিজেরা হচ্ছ যুদ্ধবাজ; জবরদস্ত খুনে–একই সাথে তোমরা তোমাদের আমেরিকান প্রভুকে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছ আবার নিজেদের করে তুলছ এক একটি সামুরাই। তোমাদের ওই হাসির তলায় লুকিয়ে আছে আর এক হিংস্র মুখ। তোমরা লোককে বিচার কর কেবল তোমাদের জঙ্গলে ধারণা নিয়ে। বন্ধু তোমাকে বলি শোন! আমাদের রাজনীতিকরা হয়ত সব সুখের পায়রা হয়ে উঠেছে কিন্তু সে তো বোধহয় তোমাদেরও। সব রাজনীতিকরাই তাই। তবে ব্রিটিশ জনগণের কোন দোষ নেই যদিও তারা আজ সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে মোটে পঞ্চাশ মিলিয়নে।
