টাইগার টনাকা প্রায় মাটিতে মাথা ঠেকায় আর কি? আমাকে মাপ কর বন্ডো-সান। তুমি যথার্থই বলছ। তেমন শিক্ষিত রুচিবান বহু আমেরিকান এখনো এদেশে বসতি করছে–যারা অত্যন্ত মূল্যবান নাগরিক। আমাকে সংশোধন করে দিয়ে ঠিকই করেছ কেননা আমারও তো ওই ধরনের বন্ধু আছে। আমি আসলে বেসামাল হয়ে পড়েছিলাম। টাইগার আবার বলতে শুরু করল–এ বছর জানুয়ারিতে এমন একজন লোক আসে তার ক্ষ্যাপামি প্রায় শয়তানির পর্যায়ে যায়। লোকটা এক দুর্দান্ত দানব। শুনে তুমি হয়ত হাসবে বন্ডো সান, কিন্তু লোকটা মানুষের আকারে প্রকাণ্ড শয়তান।
জীবনে আমি বহু খারাপ লোক দেখেছি, টাইগার, সাধারণত তাদের মাথায় ছিট থাকে। এ ক্ষেত্রেও কি কিছু আছে?
একবারেই না। আমাদের লোকের মনের গতি-প্রকৃতি সে এমনভাবে ধরে ফেলেছে তাতে মনে হয় লোকটা ভীষণ প্রতিভাবান। আমাদের মস্ত মস্ত পণ্ডিত এবং মনীষীদের মতে, লোকটি হচ্ছে বিজ্ঞানের গবেষক এবং এমন এক জিনিসের সগ্রাহক পৃথিবীতে যার জুড়ি মেলা ভার।
কি সংগ্রহ করে?
সংগ্রহ করে মৃত্যু।
.
মৃত্যু সংগ্রহ
বন্ড এই কথায় খুব হাসল। তারপর বলল, তাহলে তুমি কি বলতে চাও, লোকটা মানুষ খুন করে?
টাইগার বলে, না বভো-সান। ব্যাপারটা অত সহজ নয়। লোকটা মানুষকে ভজায়, বলতে পার ফুসলায়, যাতে মানুষ নিজেকে নিজে হত্যা করে।
এ বছর জানুয়ারি মাসে ডঃ গুনট্রাম শ্যাটারহ্যান্ড নামে এক ভদ্রলোক এদেশে আসনে। বৈধভাবেই এসেছিলেন। তিনি। তাঁর সাথে আসেন ফ্রাউ এমীশাটারহ্যান্ড। তাঁদের সুইস পাসপোর্ট ছিল। নিজেকে ডঃ গুন্ট্রাম হরটিকালচারিস্ট এবং বটানিস্ট বলে পরিচয় দেন। বিশেষ ধরনের উদ্ভিদে তাঁর পারদর্শিতা। তাঁর সাথে যে পরিচয় পত্র ছিল তার ভাষা যেন কেমন অস্পষ্ট। এখানে এসেই ভদ্রলোক কৃষিমন্ত্রক-এর সাথে যোগাযোগ করে ফেলেন। তারাও একেবারে বিস্ময়ে আনন্দে গদগদ হয়ে ওঠে কেননা ডঃ গুনট্রাম এদেশে দশ লক্ষ পাউন্ড খরচ করে এক সাংঘাতিক বাগান বা পার্ক বানাতে প্রস্তুত, তাতে নাকি সারা পৃথিবী থেকে সগ্রহ করে আনা অমূল্য সব লতাপাতা গুল্ম থাকবে। নিজের খরচে তিনি ওইসব গাছপালা সম্পূর্ণ বড় বড় অবস্থায় অন্যদেশ থেকে আনাবেন। এমন চমৎকার প্রস্তাব সরকার তো উৎসাহের সাথে লুফে নিল, বিনিময়ে এমন ভাল মানুষ ডাক্তারকে তারা দিল এ দেশে দশ বছর বসবাস করার অনুমতি। ইতিমধ্যে ইমিগ্রেসন কর্তৃপক্ষ ডাক্তারের বিষয়ে খোঁজ খবর করে। এটি করে আমাদের দপ্তরের মাধ্যমে। সুইজারল্যান্ডে আমাদের তো কোন লোক নেই, তাই বিষয়টি আমি আমার সি. আই. এ. বন্ধুদের পাঠাই। তারাও যথা সময়ে সব ঠিক আছে বলে আমাদের জানায়। আসলে লোকটা জন্মসূত্রে সুইডিশ এবং সুইজারল্যান্ডে তাকে কেউ বড় একটা চেনে না। সেখানে শুধু তার একটা থাকার বন্দোবস্ত আছে। তাও লুসান-এর এক ফ্ল্যাট বাড়িতে, দুটো ঘর। একেবারে প্রথম সারির অ্যাকাউন্ট। সেটার জন্য কয়েকবার লক্ষপতি হওয়া দরকার। টাকাই যেহেতু সুইজারল্যান্ডে একটা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন সেহেতু ছাড়পত্রে কোথাও এতটুকু ফাঁকি বা গলতি ছিল না! তাতে অবশ্য বটানিস্ট হিসাবে লোকটার স্থান কি বা যোগ্যতা কি এ খবর মেলেনি। এক অদ্ভুত লোক যার অনেক টাকা–সে যদি তার এক নির্দোষ খেয়াল চরিতার্থ করতে চায় এবং তাতে যদি জাপানের কিছু উপকার হয় তো দোষ কি?
শুনে তো ঠিকই মনে হচ্ছে। ডাক্তার তো সারা দেশ খুব কায়দা করে ঘুরল-টুরল। তারপর আমাদের দক্ষিণ দ্বীপ কায়ুশু-তে আধা পোড়া এক ক্যাসল তার খুব মনে ধরল। ক্যাসলটা উপকূল থেকে দূরে, একেবারে এক কোণে। প্রায় ফাকুওকার কাছাকাছি। ফাকুওকা হচ্ছে দ্বীপের মধ্যে প্রধান। পুরাকালে তুনিমো প্রণালীর মুখোমুখি পর-পর অনেকগুলো দুর্গ-প্রাসাদ, ফাকুওকা তার মধ্যে একটি। এই সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে রাশিয়ান নৌবহর একদা পরাজিত হয়েছিল। ক্যাসূলগুলো আদতে তৈরি হয়েছিল কোরিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে। ডাক্তার যেটা বেছেছে সেটা এক বিশাল প্রাসাদ। চারপাশ প্রকাণ্ড পাঁচিল দিয়ে ঘেরা, ডাক্তারের নতুন উদ্যোগে এমন একটি গোপন নির্জন জায়গারই দরকার ছিল। মিস্ত্রি এবং ডেকরেটারদের একটা বাহিনীই বলতে পার, সেখানে গিয়ে কাজ শুরু করল। ইতিমধ্যে ডাক্তার যে সব গাছপালার অর্ডার দিয়েছিল, সেগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে পৌঁছতে লাগল। কৃষিমন্ত্রকের ঢালাও হুকুম, থাকাতে কাস্টমস-ও চোখ বুজে ছাড়পত্র দিল। ডাক্তারের ওই জায়গায় পছন্দ করার আরো একটা কারণ ছিল। সমস্ত জমিটাই পাঁচশ একরের ওপর এবং ভীষণ আগ্নেয় প্রবণ। তলায় তলায় বহু উষ্ণ প্রস্রবন আর আগ্নেয়গিরি রন্ধ্র। ডাক্তার এবং তার স্ত্রী অতি চটপট গিয়ে গৃহে প্রবেশ করল। তারপর আশেপাশের লোকালয় থেকে সংগ্রহ করতে লাগল নতুন সব লোক যারা জমিতে কাজ এবং উদ্যোগ দেখা শোনা করবে। বলতে বলতে টাইগারের মুখ কেমন যেন পাংশু হয়ে এল। ডাক্তার তার লোক জোগাড় করছে বিশেষ করে এবং অদ্ভুতভাবে ব্ল্যাক ড্রাগন সোসাইটির প্রাক্তন সদস্যদের ভেতর থেকে। বল, সেটা কি বস্তু ছিল? টাইগার ভুল ঠিক করে দেয়, যুদ্ধের আগে এই সোসাইটিকে সরকারীভাবে বাতিল করে দেওয়া হয়। কিন্তু যখন এর দিনকাল ছিল তখন এটা ছিল জাপানের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গুপ্ত সংস্থা। একশ বছর আগে মেইজী রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর বহু বেকার সামুরাইকে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা ফেলে দেয়। সেই বেকার সামুরাইদের জঞ্জাল থেকে তৈরি হয় এই গুপ্ত সংস্থা। কোন ক্যাবিনেট মন্ত্রীও ব্ল্যাক ড্রাগনের সাহায্য নিত। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যদিও এখনো আর তত আশ্চর্য ঠেকে না আমার কাছে, ডাক্তার এমন এক জায়গা বাছল, আর সুবিধা অসুবিধার কথা ভাবল না এবং যে জায়গাটা একদা ব্ল্যাক ড্রাগনদের ছিল প্রধান আড্ডাস্থল, চরমপন্থীরা সবসময় যে জায়গা গরম করে রাখত! ব্ল্যাক ড্রাগনের প্রাক্তন পাণ্ডা তোয়ামা মিত্মরু ছিল ওই ফাকুওকার লোক। চরমপন্থী সম্প্রদায় কোনদিনই সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, যার জন্য বড়ভা-সান, ইংল্যান্ডে তুমি সম্প্রতি দেখেছ ব্ল্যাকশার্টওয়ালারা আবার ফিরে আসছে। যাই হোক্ ডাক্তার শাটারহ্যান্ডের লোক জোগাড় করতে অসুবিধে হয়নি। মোট কথা বোঝা গেল ডাক্তার সরাসরি টোকিওর অত্যন্ত নেক নজরে। পুলিশের কর্তা মাথা হেঁট করে ফিরে আসে। তার ওই দুঃস্থ-দরিদ্র এলাকায় অত টাকার খেলা দেখে সে বেচারা ও বেশ খানিকটা গলে গিয়েছিল।
