এই গোপনীয় খবরের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। বন্ড বলেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমাকে তুমি যে মহানুভবতা দেখিয়ে তা আমার দেশ জানতে পারলে তোমার প্রতি যথেষ্ট কৃতজ্ঞ থাকবে।
বন্ডো-সান, তুমি যে যন্ত্রটা আমাদের কাছে ধার করতে চাইছ, তা পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে এবং তার দরকার পড়বে অনেক। তোমার নিশ্চয়ই খাঁটি ব্যবসাদার–এই ম্যাজিক ৪৪-এর পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার যে তোমরা করবে তার পরিবর্তে আমাদের কি দেবার আছে তোমার? চীনে আমাদের এক অত্যন্ত জরুরী জাল বিস্তার করা আছে। যার নাম র-রুট। এর যাবতীয় ফলাফল সবই তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
টাইগারের বিশাল মুখ বিষণ্ণতার ছায়া বিস্তার করল। কিন্তু ওর চোখের তলায় কি যেন এক দুষ্টুমি খেলা করতে লাগল। আমি দুঃখিত বন্ডো-সান, শুনে তোমার খারাপ লাগবে কিন্তু তোমাদের ওই র-রুট-এর ব্যাপার সব আমাদের জানা। যখন থেকে ওটা হয়েছে প্রায় তখন থেকেই আমাদের সংগঠন সব পাত্তা করে ফেলেছে। যদি চাও, ফাইলগুলো আমি দেখাতে পারি। আমরা তার নতুন এক নাম দিয়েছি রুট অরেঞ্জ। খবরগুলো যে প্রয়োজনীয় এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
বন্ড খুব শান্তভাবে বলল, আমাদের আরো অনেক জিনিসপত্র আছে। তোমার যন্ত্রটার মূল্য যে সত্যি অনেক তা যখন বুঝিয়ে দিলে তখন তুমি নিজেই একটা দর দাও না। ব্যক্তিগতভাবে আমি যেটা করতে পারি এবং তুমি আমার কাছে যা চাইবে তার মোদ্দা কথাটা আমি আমার বড় কর্তাকে জানাতে পারি।
মনে হল টাইগার টনাকা কি যেন চিন্তা করছে। তারপর এসব আলোচনা বন্ধ করে দিয়ে বন্ডকে নিয়ে যায় গেইশা রেস্তোরাঁয়। বন্ডও দ্বিধা ও সংশয় নিয়ে গেল তার সঙ্গে। ওকে খবর করতে হবে মেলবোর্নে এবং লন্ডনে।
গেইশা-পার্টি চলে যাবার পর যে ঘরে বন্ড বসেছিল, একটু আগে সে ঘরে বসে টাইগার হাসতে হাসতে মৃত্যুর হুমৃকি দেখিয়েছে বন্ডকে সেই ঘরের দেওয়ালে বাঘের মাথা যেন তাদের দাঁত মুখ খিঁচিয়ে তেড়ে এল, মেঝে ফুটো করে উঠে এল বাঘের গর্জন। ছাইদানিটাও বাঘের থাবায় তৈরি।
টাইগার একটা চেয়ার নিয়ে এস একেবারে বন্ডের মুখোমুখি বসল। সেপ্টেম্বরের শেষ তবুও গরম যায়নি। প্রায় মাঝ-রাত। টাইগার নরম গলায় কথা বলতে লাগল। তাহলে বন্ডো-সান, তুমি যখন এক কথার মানুষ নিজের দেশের ব্যাপার বাদ দিয়ে অর্থাৎ তখন তোমাকে আমি একটা দারুণ গল্প বলব। এ গল্পের সাথে তোমার দেশের মঙ্গলামঙ্গলের কোন সম্পর্ক নেই। গল্পটা এই রকম। চেয়ার থেকে উঠে টাইগার ততামি -তে গিয়ে বসল পদ্মাসন হয়ে। তারপর বলতে লাগল– একশ বছর আগে মেইজী আমলের গোড়া থেকে জাপানের আধুনিকীকরণ ও পাশ্চাত্যকরণ শুরু হয়। তিনিই এ ব্যাপারে অগ্রণী হন। তখন থেকেই বিদেশীরা মাঝে মাঝে এদেশে এসেছে এবং থেকে গেছে। বেশির ভাগ আসত অবশ্য যত ক্ষ্যাপা আর কিছু বিদ্বান, পণ্ডিত। এক লাফকেডিও হার্ন এসেছিল– য়ুরোপে জন্ম কিন্তু আমেরিকান, যে হয়েছিল শেষে জাপানি নাগরিক। হঠাৎ স্কট লোক সংস্কৃতি; লোকাঁচার নিয়ে অদ্ভুতভাবে মাথা ঘামাতে শুরু করে তাহলে যা হয় আর কি! জাপানে যে সব পশ্চিমা এসে থেকে গিয়েছিল সারা জীবন, তাদের বেলাতেও ঠিক তাই হয়েছিল। কখনো কখনো যেমন এই যুদ্ধের সময় লোকে তাদের স্পাই বলে ভেবেছে, হয়ত অন্তরীন থাকতে হয়েছে, দুর্ভোগ ভুগতে হয়েছে কিছু কিছু। এ অবস্থায় স্কটল্যান্ডের জাপানিকেও হয়ত তাই ভুগতে হত। অকুপেশন-এর সময় থেকে তেমনি বহুলোক এখানে এসে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের মধ্যে বেশির ভাগই আমেরিকান। বিশেষ করে প্রাচ্য জীবন ধারা আমেরিকানদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। কেননা আমেরিকান সংস্কৃতির আবেদন তাদের কাছে ফুরিয়েছে, তারা তা থেকে পালাতে চায়। মানুষ হিসাবে যারা অতি নিম্নস্তরের, যারা কেবল দেদার খেয়ে এবং হাতে ঝকঝকে খেলনা পেয়ে খুশি থাকে, যারা সহজে প্রায়ই অসৎ পথে টাকা কামায়–এক তারাই এখনো এ সংস্কৃতিতে পরমার্থ জ্ঞান করে। কিন্তু বন্ড বলল। তোমাদের দেশে কি সেই ধাচের জীবন যাত্রাকেই বেশি উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে না?
টাইগার টনাকার মুখে আঁধার ঘনিয়ে এল। এখনকার মত তাই হচ্ছে বটে। বিরক্তির সঙ্গেই কথাগুলো বলল। আমাদের এখন যা গেলানো হচ্ছে তাকে বলা যেতে পারে কোকাকোলা সংস্কৃতি। কিন্তু এসব প্রচণ্ড মিথ্যে। যুদ্ধের হারার আসল কারণকে চাপা দেবার জন্য এই মিথ্যে, জঘন্য এই জীবনযাত্রা। আমেরিকান বাসিন্দারা যত সামান্যই হোক, তবু আমাদের প্রতি তারা সহানুভূতিশীল। আমাদের সারল্য ওদের ভাল লাগে। ওরা অবোধ শিশুর মত বিশ্বাস করে ওদের সেই দুর্দান্ত ওয়েস্ট-এর গল্প এবং আরো সব পৌরাণিক কাহিনীতে। শিক্ষা-দীক্ষা বলতে ওদের কিছু নেই। জেনেছে টেলিভিশনের শিক্ষা থেকে।
এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, টাইগার। আমার বহু আমেরিকান বন্ধু আছে, তাদের সাথে মেলে না তুমি যা বলছ। আমার মনে হয় তুমি গুলিয়ে ফেলেছ সেই সব নিচু ধরনের জি, আইদের সাথে যারা নাকি দু পুরুষে আমেরিকান হয়েছে। যারা আসলে ছিল হয়ত আইরিশ, জার্মান, চেক কিংবা পোল। নিজেদের আদি দেশে যাদের ধান। ক্ষেত কিংবা কয়লাখাদে কাজ করার কথা তার বদলে তারা আজকের এক বিজিত দেশে এক বিশাল পতাকার তলায় সদম্ভে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাতে তাদের খরচ করার মত অনেক টাকা। তারা হয়ত কখন কোন জাপানি মেয়ে বিয়ে করে এখানেই থেকে যায়। তাদের আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ে খুব তাড়াতাড়ি। আমাদের টমিরা জার্মানীতে ওই একই কাণ্ড করেছে। তবে তারা আর এই লাফকেডিও হার্ন-রা একেবারেই আলাদা।
