বন্ড বুঝতে পারছিল ডিকোর নেশা হচ্ছে। তারা দু জনেই আট ফ্লাস্ক সাকে পার করেছে। কিন্তু ডিকো তারও আগে ওকুরায় সানটোরি হুইস্কি দিয়ে বউনি করেছে। ও তখন দাঁড়িয়েছিল বন্ডের জন্য। বন্ড মেলবোর্নে একটা নির্দোষ টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছিল। বন্ড-এর পৌঁছানো সংবাদ জানবে মেরী গুডনাইট, আর জানবে তার স্থানীয় ঠিকানা। বন্ড খুঁচিয়ে কথা বার করতে চেষ্টা করল। বল তো কি ধরনের লোক এই টনাকা? ও কি তোমার বন্ধু, না শত্রু?
ডিকো জবাব দিল–আমাদের কিছু কিছু জিনিস আছে এক। সংসারের অন্যতম আনন্দ হচ্ছে মদ আর মেয়েমানুষ। আমরা দুজনেই তাতে আনন্দ খুঁজি। টাইগারের মুশকিল হচ্ছে ও খালি বিয়ে করতে চায়। আমি ওকে সামলে রেখেছি। সুতরাং আমার বিষয়ে ওর একটা শ্রদ্ধা জন্মেছে। কারোর প্রতি তোমার যদি শ্রদ্ধা থাকে তাহলে যতক্ষণ না তুমি তার উপযুক্ত হয়ে উঠতে পারছ ততক্ষণ তোমার শান্তি নেই। আমার প্রতি টাইগারের এখন জোর শ্রদ্ধা। খুব শক্ত তার ভারমুক্ত হওয়া। সেই শ্রদ্ধার একটু-আধটু ছিটিয়েছে নানারকম গোপন খবরের টোপ দিয়ে। তুমি এখন যা চাইবে ও তাই-ই এখন আগ বাড়িয়ে করতে যাবে কেননা তাতে শ্রদ্ধাটা আমার ঘাড়েই চাপানো হবে শেষ পর্যন্ত।
ডিকো হেন্ডারসন উঠে দাঁড়াল। চল, এখন কিছু খাবার দাবারের চেষ্টা করা যাক্। এরপর আমরা যাব পরিপূর্ণ আনন্দ ভবনে। এ সবের পর আমি তোমাকে একদম খাঁটি কথাটা বলব, আমার সত্যিকারের মতামত। ওরা বার ছেড়ে বেরিয়ে চলল।
.
ম্যাজিক
পরের দিন সকাল দশটার সময় ডিকো হেন্ডারসন বন্ডকে নিতে এল। এখন ওর চোখ দুটো জবা ফুলের মত লাল হয়ে আছে। ও সোজা গেল ব্যাম্বু বার-এ; গিয়ে একটা ডাবল ব্রান্ডি আর জিঞ্জার-এল-এর হুকুম করল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পানীয়টুকু গলায় ঢেলে কিছুক্ষণ পর ডিকো উঠে দাঁড়াল। বলল, এস দোস্তৃ। আমরা যাই। টাইগারকে আর অপেক্ষা করাতে চাই না।
টোকিওর গ্রীষ্মকালের এক দিন। ধুলোয় ভর্তি বাতাস। ইয়কোহামার পথে গাড়ি চলল আধঘণ্টা ধরে। তারপর একটা মেটে মেটে রঙের বাড়ির সামনে গিয়ে গাড়িটা দাঁড়াল। বাড়ির গায়ে বড় বড় হরফে লেখা নিখিল এশীয় লোক সংঘ। বৃন্ড ডিকোকে অনুসরণ করে চুলল। প্রথমে একটা হলুঘর; সেখানে বই আর পোস্টকার্ড বিক্রি হচ্ছে। জায়গাটা যেন জাদুঘর। সংযোগ বিভাগ লেখা আর একটা দরজা দিয়ে ডিকো ঢুকল, তারপর লম্বা দালান চলে গেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক লেখা আর একটা দরজা এবং তারপর আর একটা টানা দালান। তবে এবার ঘরের দরজাগুলো বন্ধ। সেগুলি পেরিয়ে প্রকাণ্ড হল ঘরের মত দেখতে এক লাইব্রেরি। তাতে আরো অনেকে টেবিলে মাথা ঝুঁকিয়ে বসে রয়েছে। ডিকো খুব আস্তে আস্তে বলল, এইখানে টাইগারের বাইরের কর্মচারিরা রয়েছে কিছু কিছু। এরা মোটামুটি শ্রেণীবদ্ধ কাজে নিযুক্ত। তারপরেই একটা ঘর সহজে নজরে পড়ে না এমন একটা ছোট দরজা। ডিকো দরজা দিয়ে ঢুকল। একটা পুরোপুরি খালি ঘর। ডিকো একটা বাস্ক দেখিয়ে বলল, টেপ রেকর্ডার। খুব চালাকি শুনে মনে হবে যেন সত্যি। খানিক দূরে এক শূন্য মেঝে দেখিয়ে বলল, এটাকে জাপানি বলে পাপিয়া মেঝে। প্রাচীনকালের অবশিষ্ট। আরো বাইরের লোক এলে এই মেঝে সাবধান করে দিত। এখনো তাই করে। তুমি এর ওপর দিয়ে হেঁটে যাবে অথব কেউ শুনতে পাবে না–এমন কথা ভাবাও যায় না।
ওরা হেঁটে যেতেই কৌশলে বসানো পাটাতন থেকে অদ্ভুত একটা আওয়াজ হতে থাকল। মুখোমুখি ছোট্ট এক দরজা তাতে স্পষ্ট হল। সেটা হঠাৎ শব্দ করে খুলে ওদের জরিপ করতে লাগল প্রকাণ্ড এক চোখ। দরজা খুলল, একটা চৌকো বেটে লোককে দেখা গেল সাদা পোশাকে লোকটিকে ডিকো কি যেন বলল, শুধু একটা কথাই বোঝা গেল টনাকা সান। ডিকো বন্ডের দিকে তাকাল। এখন থেকে তোমাকে নিজে নিজে সব করতে হবে টাইগারই তোমাকে পৌঁছে দেবে হোটেলে। পরে আমাদের দেখা হবে।
বন্ড ভেতরে ঢুকল, ওদিকে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। কতকগুলো সারি সারি বোতাম। লোকটা একটা বোতাম টিপল। বন্ড বুঝতে পারল ওরা নিচে নামছে। কিছুক্ষণ নামার পর রক্ষীটি দরজাটা খুলে দিল। বন্ড বাইরে পা দিয়েই দেখল সে দাঁড়িয়ে আছে এক পাতাল রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে। সেখান থেকে একটা লোক রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে চলল। দু পাশে সরু সরু অনেক অফিস ঘর। বন্ডকে প্রথমটাতে নিয়ে গিয়ে ঢোকাল। পুরুষ সেক্রেটারি টাইপ রাইটার ছেড়ে উঠল। মাথা নুইয়ে মাঝখানের দরজা দিয়ে ঢুকে গেল। বন্ড ভেতরে ঢুকতে ওর পেছনের দরজাটা আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। সে এগিয়ে এসে বন্ডকে সুপ্রভাত জানাল। বলল, আপনার সাথে দেখা হওয়াতে খুশি হলাম, বসুন। আমার অফিস কেমন দেখছেন? খুব নিরিবিলি লোকজনের উপদ্রব নেই আর বেশ ঠাণ্ডা। বন্ড একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। সে বলল, খুবই ভাল লাগল আমার এই অফিস। চমৎকার বুদ্ধি খেলিয়ে বার করেছেন। লোকটার কথা বার্তায় বন্ড বুঝল, এ লোক সিক্রেট সারভিস-এর প্রকাশিত তথ্য-টথ্য সবই জানবে। নিয়নের এক ফালি আলোয় টাইগারের দাঁত ঝকঝক করে উঠল। এ তল্লাটে তো গত দশ বছর ধরে আপনাদের ক্রিয়াকলাপ সব বন্ধ। তাতে যাই হোক আপনাদের অনেক টাকা বেচেছে।
হ্যাঁ। সি. আই. এ. আমাদের হয়ে কাজ করে। আমরা এখানে ওদের ভরসাতেই আছি।
