ডিকো হেন্ডারসন যেন গা ছেড়ে দিল। ওই প্রাচীন হারামজাদাটা তো জানে আমি ওর সম্বন্ধে কি ভাবি না ভাবি। ওকে বলে দিও যেন আমার পেছনে লাগতে না আসে।
বন্ড হেসে ওঠে। এক ঘন্টার কাছাকাছি লেগে গিয়েছিল বন্ডের একমাত্র স্যুটকেস কাস্টমস থেকে উদ্ধার করতে। হাঁপাতে হাঁপাতে সেন্ট্রাল হল-এ যখন পৌঁছায় তখন সেখানে প্রবল ধাক্কাধাক্কি, তোণ্ডুতি। তরুণ জাপানিদের এক উত্তেজিত জনতা কাগজের নিশান উড়িয়ে আন্তর্জাতিক লন্ড্রী কনভেনশন করছে। প্লেনে এতখানি পথ এসে বন্ড ক্লান্ত হয়েছিল।
হঠাৎ বন্ড দেখল এক বিশাল চেহারার লোক ছাই-ছাই রঙের তালগোল পাকানো স্যুট পরা–ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। দেখা পেয়ে খুশি হলাম। আমি হেন্ডারসন। প্লেনে আর তো কোন ইংরেজ ছিল না। তাই ঠিক ধরেছিলাম তুমি হচ্ছ বন্ড। এই যে ব্যাগটা আমার হাতে দাও। যত শিগগির এই বদ্ধ উন্মাদাগার ছেড়ে বেরোনো যায় ততই মঙ্গল।
হেন্ডারসনকে দেখতে মধ্যযুগের লড়ায়ে প্রতিযোগীর মত। তার চোখ দুটো দেখতে নীলচে পাথরের মত। বন্ডের স্যুটকেস দিয়ে ধাক্কা দিতে দিতে সে ভীড় ঠেলে বের হচ্ছিল। এই বিশাল দৈত্যকার লোকটিকে জনতা সরে গিয়ে জায়গা করে দিচ্ছিল, কেউ আপত্তি করছিল না। বন্ডও সেই সুযোগে তার পিছু পিছু গিয়ে ওঠে কায়দার এক টায়াপেট সালুনে। গাড়িটা দাঁড়িয়েছিল এমন এক জায়গায় সেখানে পার্ক করার কথা নয়। শোফার বেরিয়ে এসে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করল। তারপর বন্ডের সাথে সাথে গিয়ে বসল পেছনের আসনে। তোমাকে আগে তোমার হোটেলে নিয়ে যাচ্ছি। ওকুরা-হালে হয়েছে। ইউরোপীয় হোটেলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নতুন। সেদিন রয়্যাল ওরিয়েন্টাল-এ এক আমেরিকান খুন হয়েছে। আমরা তোমাকে অত শিগগির খোয়াতে চাই না। গিয়ে আমরা একটু গুরুত্বপূর্ণ ড্রিংকে বসব।
গাড়িটা বেগে ছুটছিল শহরতলী দিয়ে। বন্ড সেদিকে হাত দেখিয়ে বলেছিল, দেখে তো মনে হচ্ছে না, পৃথিবীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় শহর এই টোকিও। আর আমরা ডান দিক ধরেই বা যাচ্ছি কেন? হেন্ডারসনের গলায় রাগ ফুটে বের হচ্ছিল। টোকিও হচ্ছে অতি হতচ্ছাড়া জায়গা, হয় খুব গরম নয় খুব ঠাণ্ডা আর নয়তো দেদার বৃষ্টি, আর প্রায় রোজই ভূমিকম্প হয়। কিন্তু এসব নিয়ে মাথা ঘামিও না। এগুলো তোমাকে খানিকটা মাতাল করবে। টাইফুন হচ্ছে। আরো খারাপ। টাইফুন একবার হতে শুরু করলে, কিছু না একটা শক্ত পোক্ত বার দেখে তাতে ঢুকে বসে বেহেড মাতাল হয়ে যাবে। তবে প্রথম দশটা বছর খুব খারাপ যাবে। পরে আর এত খারাপ লাগবে না। তবে এদের বুলি রপ্ত করতে হবে। চটপট এদের কতকগুলি প্রাথমিক নিয়মকানুন অভ্যেস করে ফেলতে হবে।
হেন্ডারসন ড্রাইভারকে জাপানিতে কি সব বলে গেল তারপর হেসে উঠে বলল, আমাদের পেছনে ফেউ জুটেছে। এ সব একেবারে টাইগার মার্কা পুরোনো খেলা। আমি ওকে বলেছি, তুমি ওকুরায় যাচ্ছ। যদি দেখ, আজ রাতে ওর কোন লোক কিংবা কোন মেয়েছেলে তোমার বিছানায় তোমার ঘাড়ের কাছে হঠাৎ ফেস-ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলছে, তাহলে জেনো তোমার ভাগ্য ভাল। তাদের সাথে মিষ্টি করে কথা বলো, তারা মাথা হেঁট করে চুপি চুপি বেরিয়ে যাবে।
পরের দিনটা কাটে নতুন জায়গা দেখে আর কিছু কার্ড ছাপানোর হাঙ্গামায়। বন্ড যে অস্ট্রেলীয় দূতাবাশে সাংস্কৃতিক দপ্তরের সেকেন্ড সেক্রেটারি হয়েছে, কার্ড সেই মর্মে। ওরা জানে এটা হচ্ছে আমাদের গোয়েন্দা শাখা–হেন্ডারসন বলেছিল। ওরা এটাও জানে যে, আমি হচ্ছি তার মাথা আর তুমি সাময়িকভাবে আমার সহকারী হয়ে এসেছ।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা ওরা গিয়েছিল হেন্ডারসনের প্রিয় বার মেলোডীতে আরো গুরুত্বপূর্ণ পাঠানুষ্ঠানে। বন্ড বুঝেছে ওটাই ওর প্রধান আড্ডার জায়গা।
হেন্ডারসন এক খাবার টেবিলের তলা থেকে তারটা উপড়ে আনল; ঝুলিয়ে রেখে দিল সেটা। হেন্ডারসন ক্ষিপ্ত। ডিকো অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করল চারদিকে। যাক্ জেমস্ এখন কাজের কথায় আসা যাক। তুমি কাল সকালে এগারটায় টাইগারের সাথে দেখা করছ। আমি ঠিক করে ফেলেছি। আমিই তোমাকে তুলে নিয়ে সেখানে যাব।
নিখিল এশীয় লোক সংঘ। সেটা কি বস্তু এখন তোমাকে বলব না। বললে সব আগ্রহ মাটি হয়ে যাবে। তুমি এখানে কেন এসেছ তা আমি অবশ্য জানি না। মেলবোর্ন থেকে অত্যন্ত গোপনীয় তার এসে পৌঁছেছে। সেগুলোর পাঠোদ্ধার করতে হবে তোমাকে নিজে। আর আমার অ্যামব্যাসাডার জিম হেন্ডারসন খুবই ভাল মানুষ, এসব ব্যাপারে পরিষ্কার থাকতে চান। তবে আমার কানে এসেছে যে, তুমি নাকি টাইগারের কাছ থেকে অনেক কিছু বার করতে চাও, তাও নাকি মি.আই.এ.-র অজ্ঞাতসারে। কি ঠিক তো?
টাইগার আসলে খুব গভীর পানির মাছ। যারা বৃহৎ শক্তিশালী, তাদের কাছে দশ বছর হচ্ছে তারার মিটমিট করে দীপ্তি পাওয়ার মত। সুতরাং টাইগার এবং তার ওপরওয়ালারা জিনিসটাকে দুদিক থেকে বিচার করবে। সংসদ বা আইন সভা যাই বল–তারাই হল ওর ওপরওয়ালা, আর শেষে আছেন সম্রাট। তারা দেখবে জিনিসটা তাদের এখনই দরকার কি না, আজকেই, নাকি পরে কাজে লাগবে; দীর্ঘ মেয়াদী বিনিয়োগের ব্যাপার এটা। তোমার জায়গায় আমি হলে ওই প্রস্তাবই ফেঁদে বসতাম–ওই দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাব।
