টাইগার একটু থামল। কপালের ওপর রাখল মুঠোটা। চোখ বন্ধ করে কি যেন ভেবে নিল। তারপর বলল, বন্ডো সান, এবার তোমাকে পেয়েছি, আর তোমার নিস্তার নেই। এবারের খেলার ফল হল এক-এক।
শেষ খেলা! দুই প্রতিপক্ষ দুজনের দিকে তাকাল। বন্ডের মুখে আলতো হাসি, হাসিতে যেন একটু ঠাট্টার ভাব। টাইগারের কালো গভীর চোখের তলায় এক টুকরো লালচে আলো যেন ধক্ করে ওঠে। বন্ড সরাসরি জিতল দু দানেই। প্রথমে টাইগারের কাঁচি তার পাথর দিয়ে ভোঁতা করে তারপর টাইগারের পাথরকে নিজের কাগজে মুড়ে ফেলে। টাইগার মাথা হেঁট করল। বন্ড ততোধিক হেঁট করল নিজের মাথা। সে ব্যাপারটাকে হালকা করার চেষ্টা করল।
সব উত্তেজনার অবসান হতে গেইশা মেয়েটিও হাততালি দিল এবং মাদাম তখন কাঁপা পাতাকে নির্দেশ দিল– বন্ডকে আরেক দফা চুমু দিতে। কাঁপা পাতা দিল। জাপানি মেয়েদের চামড়া কি নরম! বন্ড যখন বাকি রাত সম্বন্ধে জল্পনা-কল্পনা করছে সেই সময় টাইগার বলে উঠল, বন্ডো-সান, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। তুমি কি আমার সাথে আমার বাড়িতে আজ রাত কাটাবে?
বন্ডের তখন ডিকোর কথা মনে পড়ে গেল, কোন জাপানি গৃহস্থ বাড়ির ভেতরে খাওয়ার নিমন্ত্রণ পাওয়ার মানে। ধরে নিতে হবে–এক অশেষ কৃপার লক্ষণ। বন্ড রাজি হয়ে যায়।
ঘণ্টাখানেক পরে ওদের দুজনের মাঝখানে ড্রিংকের ট্রে। দূর দিগন্তে ইয়োকোথোমার আলোগুলো এক অদ্ভুত গাঢ় গোলাপী আভা ছড়াচ্ছে। সামনে খোলা, ছড়ানো পাটিশান চলে গেছে বাগানের দিকে। সেই পাটিশান ভেদ করে মৃদু গন্ধ ভাসছে সমুদ্রের এবং বন্দরের। টাইগারের বাড়ি চমৎকার করে ডিজাইন করা। ঘরে ঢুকে টাইগার বন্ডকে বলল, তোমার সাথে এখন আমি যা আলোচনা করব তা অত্যন্ত গোপনীয় তবে তোমাকে কসম খেতে হবে–তুমি একথা কাউকে বলবে না। যদি তুমি তোমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ কর তাহলে তোমাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমার আর কোন উপায় থাকবে না।
.
যবনিকা কম্পমান?
বাৎসরিক পূর্তি উপলক্ষে ঠিক এক মাস আগে মঠ বন্ধ হবহব করছে, কর্মচারিদেরও ছুটি, তখন সব রঙটঙ করা হবে, ছাদ মেরামত হবে। M জানালার ধারে বসে সেন্ট জেমস স্ট্রীটের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছুটি তিনি বড় একটা নিতে চান না। নিলেও বিশিষ্ট অতিথিদের আপ্যায়ন করতেই তিনি ছুটিটা ব্যবহার করেন। তারও ছুটি। সামনে দুটো সপ্তাহ তিনি ট্রাউট মাছ ধরে কাটাবেন আর বাকি দু সপ্তাহ টেবিলে বসে কফি স্যান্ডউইচ খেয়েই কেটে যাবে।
পোরটারফিল্ড সিগার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। নিচু হয়ে সে মস্ত কেসটা M-এর অতিথিদের সামনে মেলে ধরল। স্যার জেমস্ মেলেনি সপ্রশ্ন ভুরু তুললেন। হাভানা দেখছি এখনো আসছে। একটু ইতস্তত করল তার হাত। তারপর বেছে নিলেন একটা রোমিও-ই-জুলিয়েটা; চিমটি কেটে তুলে নিলেন সেটা, M-এর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করলেন, কোস্ত্রোকে এর বদলে ইউনিভার্সাল এক্সপোর্ট কি পাঠাচ্ছে নীল বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ?
M এ-কথার কোন মজা পাননি। পোরটারফিল্ড সেটা লক্ষ্য করল। সে তাড়াতাড়িতে বলে উঠল, কিন্তু তাড়াতাড়ি নয়, স্যার জেমস্। ব্যাপার হচ্ছে, আজকাল ভাল জ্যামাইকাম সিগার প্রায় হাভানার মত হয়ে উঠেছে। ওরা বোধহয় এতদিনে বাইরের পাতাটা ঠিক-ঠিক বের করতে পেরেছে। কেসের কাঁচের ঢাকা বন্ধ করে সে আস্তে আস্তে সেখান থেকে সরে যায়। স্যার জেমস্ ব্রান্ডিতে একবার চুমুক দিয়ে হেলান দিয়ে বসলেন। তারপর M-এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে বন্ধু এখন বল, তোমার সমস্যাটা কি?
স্যার জেমস মোলোনি ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় নিউরোলজিস্ট। অধুনা অতি বিখ্যাত তত্ত্ব মাম মাইকো সম্যান্টিক সাইড-এফেক্টস্ অব অর গ্যানিক ইনফিরিয়োরিটির জন্য তিনি আগের বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাছাড়া তিনি স্নায়ু বিশেষজ্ঞ। দরকার হলে সিক্রেট সার্ভিস তাকে আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে ডাকে। M পাশ ফিরে সেন্ট জেমস্-এর ট্রাফিক দেখতে লাগলেন। তিনি স্যার জেমস্-এর চোখে চোখ রাখলেন। তার চাহনি ঠাণ্ডা। ওষ্ঠ 007। ওর সন্ধে আমি ক্রমেই উদৃবিগ্ন হয়ে পড়েছি। তুমি তো পড়েছ আমার দুটো রিপোর্টে ওর কথা, নতুন কিছু ঘটেছে না। সেই একই রকম। আস্তে আস্তে ওর দফা রফা হয়ে যাচ্ছে। অফিসে দেরি। কাজে ফাঁকি। তাও কাজে ভুল। দেদার মদ্যপান করছে আর দেদার টাকা ওড়াচ্ছে। নতুন জুয়া খেলার ক্লাবে সব মিলিয়ে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে যে, আমার এক সেরা লোক আমারই বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওর যা রেকর্ড তাতে এই পরিণতি একেবারে ভাবাই যায় না।
স্যার ডেনেস্ মোলোনি দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘাড় নাড়লেন। কিছুমাত্র অসম্ভব নয়, লোকটা দারুণ একটা আঘাত পেয়েছে তার জন্য এই সব হচ্ছে।
তোমার এই যে এজেন্ট লোকটি যথেষ্ট শক্ত ও সাহসী। ওর বয়সে তুমিও হয়ত তাই ছিলে। লোকটা বিয়ে-থা কিছু করেনি। পাকাঁপোক্ত মেয়েবাজ। তারপর হঠাৎ ও পড়ল প্রেমে। এসব শক্ত লোকেরও কি দারুণ দুর্বল জায়গা থাকে তা দেখলে অবাক হতে হয়। সুতরাং মেয়েটিও বিয়ে করে আর বিয়ে করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই একটা দারুণ শয়তান তাকে গুলি করে মারে। কি যেন নাম তার? ব্লোফে। তোমার মেডিক্যাল অফিসার ভাবল, ওর মাথায় বুঝি আঘাত লেগেছে; তাই দিল আমার কাছে পাঠিয়ে। কিন্তু ওর কিছুই হয়নি। পেয়েছিল প্রচণ্ড শ। আমার । কাছে ও বলেছে, যা ওর যত শক্তি, উৎসাহ সব চলে গেছে। এমনকি জীবনে ওর আগ্রহ ফুরিয়েছে। এটা সাইকোনিউরিসের একটা ধরন। এ রোগ হঠাৎ একদিন দেখা দেয়। ওর ভালবাসার পাত্রীকে হারিয়েছে, তার মৃত্যুর জন্য ও দায়ী করেছে নিজেকে, যন্ত্রণা আরো সেই কারণে। আমার মনে হয় আমি আমার রিপোর্টে বলেছি, ওর কাজ কাজের যাবতীয় দৌড়াদৌড়ি ছুটোছুটি, বিপদ-আপদ ওকে এই অবস্থা থেকে টেনে তুলতে সাহায্য করবে। আমার বিশ্বাস মানুষকে চেষ্টা করে শেখানো উচিত যে, জীবনে দুর্বিপাকের কোন সীমা সংখ্যা নেই। এক এক সময় মনে হবে দুঃখ অপার, অনন্ত–তাকে বরদাস্ত করা যাচ্ছে না।
