কাগজ কাঁচির খেলা
গেইশার নাম কাঁপা পাতা। সে বন্ডের ডান গালে আলগোছে একটা চুমু খেল।
বন্ড বলে উঠল, এ তো লোক ঠকানো চুমু! কথা ছিল, জিতলে সে সত্যিকারের একটা চুমু উপহার পাবে। বহু খিলখিল হাসি আর চেঁচামেচি শোনা গেল। মাদামের নাম ধূসর মুক্তা। তিনি পালিশ-করা দাঁত বের করে বন্ডের কথার তরজমা করে দিলেন। কাঁপা পাতা তার নিটোল সুন্দর হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। সে আঙুলের ফাঁক দিয়ে বন্ডের মুখ পরীক্ষা করতে লাগল। তারপর পুরো ঠোঁট জুড়ে বন্ডকে একটা চুমু উপহার দিল। বন্ডের মনে পড়ে, এরা তাকে। এক বালিশ-গেইশা দেবে কথা দিয়েছিল। ও গেইশা আমন্ত্রণের প্রাচীন শিল্প রীতি জানাবে না, মুখে মুখে মজার গল্প, কবিতা রচনা করে, গান গেয়ে কিংবা এঁকে তার অতিথির মন ভোলাতে পারবে না। কিন্তু সেই সুরুচি-বালারা যা পারবে না, এ হয়ত তা পারবে। বর্বর বিদেশীর হীন রুচিতে তার তবু কিছু অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু সুললিত ভাষায় একত্রিশ মাত্রার টনাকার মানে বন্ডের মাথায় কিছুই ঢুকবে না। কাম ও লাস্যের এই অবাধ প্রদর্শনী প্রচুর। হাততালি সহকারে অভিনন্দিত হলেও খুব শিগগিরই মাত্রা বজায় রেখে মিলিয়ে গেল। বন্ডের মুখোমুখি কালো মুকাতা পরে বসে ছিল শক্ত সমর্থ একটা লোক। বন্ডো-সান, জাপানি সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান টাইগার টনাকা বলল, আমি এবার তোমাকে এই ছেলে খেলায় চ্যালেঞ্জ করব এবং আগে থেকেই প্রতিজ্ঞা করছি যে, এ খেলায় তুমি জিতবে না। এই মুখ বন্ডের খুব ভাল করেই জানা হয়ে গেছে। তার মুখের হাসি দেখে বন্ডের মনে হল এ ঠিক হাসি নয়। একটা মুখোশ মুখোশের ভেতরে সোনালি একটা ফুটো।
বন্ড হেসে উঠে বলল, ঠিক আছে, টাইগার। কিন্তু তার আগে আরো থাকে। আমাকে যদি দেখাতে হয় যে, প্রাচ্যের যাবতীয় কৌশলের চেয়ে পাশ্চাত্যের জ্ঞানবুদ্ধি অনেক বড় তাহলে কিন্তু আমার আর একটা ডাবল মাটিনি লাগবে।
কিছুক্ষণ ধরে হাসাহাসি, কথাবার্তার পর বন্ড বুঝল–ঠাট্টা-তামাশা তাকে নিয়েই হচ্ছে। সে অসভ্য পশ্চিমা, খাওয়া দাওয়ার বহরও তার ভয়ংকর! মাদাম কি যেন বলতে, কাঁপা পাতা কুর্নিশ করে তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। টাইগারের মুখটা ধূর্ত-ধূর্ত দেখাতে লাগল। টাইগার টনাকা ঘাড় ঘোরায় ধূসর মুক্তার দিকে। ধূসর মুক্তা জাপানিতে কি যেন বলে উঠল খনুখন করে। টাইগার তার তরজমা করল, বন্ডো-সান, এই মেয়েছেলেটি যথেষ্ট বুদ্ধি ধরে। এ বলছে, বড়ো-সান -এর সাথে বিয়ে হয়ে গেছে। এ সম্মানিত বিবাহিত জীবন যাপন করছে। তাই তার ফুটন-এ আর কারোর জায়গা নেই।
ঘণ্টা দুয়েক ধরে চলছিল গেইশা পার্টি। নানারকম বিনয় করতে গিয়ে প্রচুর হাসতে হচ্ছিল বন্ডকে। টাইগার টনাকা যে তাকে দেখে একরকম নিষ্ঠুর মজা পাচ্ছে তাও সে বুঝতে পারছিল। ডিকো হেন্ডারসন তাকে বলেছিল এবং সাবধান করে দিয়েছিল যে, সমস্ত ব্যাপারটা যেন বন্ড ভালভাবে নেয় তাহলে বন্ড যে কাজে এসেছে তার সুবিধাই হবে।
বন্ড হাসে, হাততালি দেয়,–যেন তার খুব ভাল লেগেছে। তারপর টাইগারের সাথে কাগজ কাঁচির খেলায় মেতে ওঠে। খেলাটা হল কাঁচি কাগজ কাটবে, কাগজ মুড়বে পাথর, পাথর ভেতা করবে কাঁচি। পাকানো মুখো হচ্ছে পাথর, দুটো আঙুল হচ্ছে কাচি এবং হাতের চেটো হল কাগজ। প্রথমে পাকানো মুঠো শূন্যে ছুঁড়তে হবে দুজনকেই দু বার। তিনবারের বার হাত নামিয়ে মুঠো খুললে বোঝা যাবে তার হাতে কি! অপর পক্ষের হাতে কি আছে সেটা আন্দাজে বলতে হবে, এবং যে বলছে তার হাতে যদি একই জিনিস থাকে তাহলেই সে প্রতিপক্ষকে হারাতে পারবে। তিনজনে। কিংবা তার চেয়ে বেশি লোক মিলে এই খেলা চলে–আসলে খেলাটা ধাঁধার খেলা।
টাইগার টনাকা মুঠো পাকিয়ে বসল বন্ডের উল্টো দিকে। ঘরে পরিপূর্ণ নীরবতা। টাইগারের প্রতিজ্ঞা–বন্ডকে সে হারাবেই। টাইগার জাপানের শক্তিশালী লোকদের মধ্যে অন্যতম। দুজন মেয়েছেলের সামনে তুচ্ছ এক বিদেশীর কাছে হেরে যাওয়া এই লোকের পক্ষে ভীষণ একটা ব্যাপার। এই দুই স্ত্রীলোকই হয়ত পরাজয়ের এই খবর ফাঁস করে দেবে। ডিকো হেডারসন বুঝিয়ে দিয়েছে, এখানকার আচার-অনুষ্ঠানকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে মেনে চলতে। তা সেগুলো যতই প্রাচীনপন্থী এবং অকিঞ্চিৎকর ঠেকুক না কেন! কিন্তু কোনটা কি যে ব্যাপার বন্ড এখনো অথৈ পানিতে।
টাইগার বন্ডের চোখের দিকে চেয়ে তার মতলব আঁচ করার চেষ্টা করছে। বন্ড স্থির করেছিল, সে কোন মতলবের ধার দিয়েই যাবে না। কোনরকম ভজ দেবে না, মুঠো পাকিয়ে দু বার হাওয়ায় ছোড়বার পর তখন-তখনই তার যা মনে হবে, সে সেই চিহ্নই বেছে নেবে।
আস্তে আস্তে টেবিল থেকে মুঠো দুটো ওঠে। তারপর দ্রুত, একসঙ্গে হাওয়ায় হাতুড়ির মত আছড়ে পড়ে। শেষে সামনে প্রসারিত হয়। টাইগার তার মুঠো গোল করে পাকিয়েই রেখেছিল তার মানে সে বেছেছে পাথর। ওদিকে বন্ড তার হাতের চেটো মেলে ধরে। সুতরাং কাগজে মুড়ে ফেলল পাথরকে। বন্ড এক পয়েন্ট এগিয়ে রইল। তারপর ফের একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি। সেই দানেও টাইগারের হাতে পাথর। বন্ড সামনের আঙুল দুটো বাড়িয়ে কাঁচির মত করেছিল। কাচি গেল ভোতা হয়ে টাইগারের পাথরে। দু জনেরই এক এক।
